খেলাপী ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ ‘বরোয়ার’ সিলেকশনের দুর্বলতা

কিছুদিন আগে একটি পত্রিকায় খবর এসেছে যে শিপ ব্রেকিং খাতে বিশাল অংকের লোনের টাকা অনাদায়ী। শিপ ব্রেকিং ব্যবসায় যারা লোন গ্রহণ করেছে তারা লোন পরিশোধ করতে না পেরে অনেকেই বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন, অনেকে গা ঢাকা দিয়ে আছেন এবং দেশত্যাগের অপেক্ষায় আছেন। আমি আজ যে শুধু শিপ ব্রেকিং ব্যবসায়ীদের লোন সম্পর্কে আলোচনা করব তা নয়, সার্বিকভাবে আমাদের দেশে ব্যাংকগুলো যে সমস্ত খাতে, যে সমস্ত গ্রাহককে লোন দিয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে ঐ খাতটি যাচাই-বাছাই করা, ঐ খাত সম্পর্কে ব্যাংকের সুস্পষ্ট জ্ঞান অর্জন না করে এবং বরোয়ার সিলেকশন ঠিকমত না করেই লোন দিয়া থাকে। আমাদের দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহে লোন গ্রহীতাই আদর-আপ্যায়নের পাত্র কিন্তু যারা ব্যাংক ডিপোজিটর তাদের ব্যাংকে তেমন কোন আদর-আপ্যায়ন নাই। অথচ আমানতই হল ব্যাংকের রক্ত। যে রক্তের প্রবাহ না থাকলে ব্যাংকই দেউলিয়া হয়ে যায়। আমাদের দেশে ভাল ব্যবসায়ী, ভাল শিল্পপতি আছেন নইলে তো সব ব্যাংকই দেউলিয়া হয়ে যেত। কিন্তু কিছু ব্যবসায়ী আছেন যে ব্যাংকের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করে একটি বড় অংকের লোন নিয়ে প্রথমেই একটি দামী গাড়ি কেনেন। অর্থাত্ লোনের টাকা পেয়ে প্রথমেই বড়লোকী দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। লিভিং স্ট্যাটাস উঁচু করে ফেলেন। অনেকক্ষেত্রে অনেকে ব্যাংকের লোন নিয়ে বিরাট বাজেটে মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান, ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান করেন। এ সমস্ত লোন গ্রহীতা পরবর্তীতে ব্যবসায় পুঁজি ঘাটতির কারণে ব্যাংকের টাকা সুদে-আসলে পরিশোধ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। এমনকি লেন-দেন করে লোনটিকে পারফর্মি লোন হিসাবে রাখতেও ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ঋণ খেলাপি হয়ে যান। ব্যাংক তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে বন্ধকী জমি বিক্রি করে পুরো টাকা আদায় করতে পারে না। কেননা জমির দাম যেখানে আছে ১০০ টাকা সেটাকে অনেকক্ষেত্রে ২০০ টাকা এমনকি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ১০০ টাকার জমি ১০০০ টাকাও দেখিয়ে লোন নেয়া হয়। এছাড়া বড় অংকের শিল্প লোনের বেলায় সহজামানত অর্থাত্ জমিজমা বন্ধক বড় বিষয় নয়। ঋণ গ্রহীতা একজন ভাল শিল্পপতি কিনা তাই বিবেচ্য বিষয়। আমি একজন ব্যাংকার ছিলাম। আমার শাখায় একজন ব্যবসায়ীর কারেন্ট হিসাবে লেন-দেন ছিল। ঐ ব্যবসায়ী একজন শিল্পপতি। তার অন্য ব্যাংকে ১০০ কোটি টাকার মত শিল্প ঋণ ছিল। কিন্তু তার লেন-দেন দেখে আমার মনে হত তার এক কোটি টাকারও পুঁজি নেই। তিনি দামী গাড়িতে চলেন, বিলাসবহুল জীবন-যাপন করেন এবং বিশাল অংকের বাজেটে সেনাকুঞ্জে ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান করেন। কয়েক বছর পর আমি জানতে পারলাম যে ঐ শিল্পপতি ঋণ খেলাপী হয়েছেন। বর্তমানে তার কোন অফিসও নেই। ব্যাংক সর্বাত্মক চেষ্টা করছে ঐ টাকা আদায় করতে। কিন্তু ঐ টাকা আদায় হবে না। এটা এখন থেকে ১৫/১৬ বছর আগের ঘটনা। ১৯৮২-৮৩ সালের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। আমি তখন একটি ব্যাংকের শাখার ম্যানেজার। একজন লোন গ্রহীতা তার ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য তার লোন বৃদ্ধি করার জন্য আমাকে অনুরোধ করেন। আমি তার লেন-দেনে সন্তুষ্ট হয়ে তার লোনটি বৃদ্ধি করার জন্য প্রধান কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠাই এবং প্রধান কার্যালয় লোনটি বৃদ্ধি করে দেন। এর পর-পরই তার মেয়ের বিয়ে। আমাকেও বিয়ের অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেয়া হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে আমি যখন উপস্থিত হই, তখন ঐ ঋণ গ্রহীতা অর্থাত্ বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনকারী আমাকে দেখে বিব্রতবোধ করেন। যেখানে ভিআইপিরা বসেছেন আমি ওখানে গিয়েই বসি। ভদ্রলোকের তাতে টেনশন বেড়েই যাচ্ছে। কি জানি আমি যদি বলে ফেলি যে ব্যাংকের লোনের টাকা নিয়েই আপনি এই বিশাল আয়োজন করেছেন, তাহলে তো তার প্রেস্টিজ পাংচার হয়ে যাবে। আমি ঐ প্রসঙ্গ তুলব কেন? আমি একজন সম্মানিত লোককে অসম্মানিত করবো কেন? তবে আমি ভদ্রলোকের টেনশন দেখে একটি টেবিলে বসে একটু খাবার খেয়েই বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে খুব তাড়াতাড়ি বিদায় নেই। বিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হবার দু’একদিন পরে আমার ব্যাংকে তার লোন হিসাবে চেক আসে জুয়েলারী প্রতিষ্ঠানের, ডেকোরেটরের দোকানের মালিকের চেক আসে। আমার মনে নেই, তবে এটুকু মনে আছে বিয়ের ব্যাপারে যত কেনাকাটা আছে ঐ সমস্ত দোকানের চেক আসে পেমেন্টের জন্য। যা হোক, তারপর আমি তাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসি। এটা একটা মাত্র উদাহরণ। আমাদের দেশের ঋণ গ্রহীতারা ব্যবসার নামে লোন নিয়ে বিয়ে অনুষ্ঠান, দামী গাড়ি কেনা ও বিলাসবহুল জীবন-যাপন করে টাকা নষ্ট করে ব্যবসার পুঁজি নষ্ট করেন ও ঋণ খেলাপী হন। এদের সংখ্যা কম নয়। প্রকৃত ব্যবসায়ী যারা লোনের টাকার প্রকৃত ব্যবহারকারী তাদের সংখ্যা কম। হলমার্ক ঋণের নামে, ব্যবসার নামে ব্যাংক থেকে যে চার হাজার কোটি টাকা নিয়েছে এটা তো ডাকাতি বললেও কম বলা হবে, পুকুর চুরি বললেও কম বলা হবে। কি বলব কিছু বলতে পারলাম না। ভাষা নেই। এই টাকা ব্যাংক কিভাবে দেয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, ব্যাংকের অডিট কি করেছেন? টাকাটা তো আর একদিনে ডিসচার্জ হয়নি? বছরব্যাপী এই টাকা ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কি করেছে? অর্থ মন্ত্রণালয় কি করেছে? অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংকের যৌথ প্রচেষ্টায় এই টাকা আদায় করতে হবে। অপরদিকে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ব্যাংক লোনের উচ্চসুদের কারণে মার্জিনাল মুনাফাও অর্জন করতে পারছে না।  লেখক : সাবেক ছাত্র নেতা ও ব্যাংকার