পূর্ণদৈর্ঘ্য দেশপ্রেমের গল্পকার

মনসুর আলী। এই প্রজন্মের একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা। জন্ম বাংলাদেশে হলেও বেড়ে উঠেছেন ব্রিটেনে। বাংলাদেশের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিশ্বের দর্শকের কাছে তুলে ধরতে নির্মাণ করেছেন ‘৭১-এর সংগ্রাম’ শিরোনামের চলচ্চিত্র। মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র বলেই এই স্বাধীনতার মাসে বাংলাদেশে মুক্তি পাচ্ছে এটি। আগামী ২৮ মার্চ থেকে সারাদেশের সিনেমা হলগুলোতে মুক্তি পাবে ছবিটি। আর আগামী জুন মাসে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হবে লন্ডনে। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত এই আলোকিত তরুণকে নিয়ে আমাদের এবারের প্রজন্মের আইকন। তাকে নিয়ে লিখেছেন খালেদ আহমেদ প্রতিটি মানুষেরই একটি গোপন স্বপ্ন থাকে। স্বপ্নের সাথে সাধনা যোগ হলে রচিত হয় সাফল্যের গল্প। তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা মনসুর আলীও নিজের সেই স্বপ্ন ও সাধনার সেতু বেয়ে এখানে এসেছেন। ভাগ্য বরাবরই তার পক্ষে পাল তুলেছে। যেখানে যখন যে পরিবেশে ছিলেন, তিনি কমবেশি প্রশংসায় সিক্ত হয়েছেন। তার কাছে চলচ্চিত্র নির্মাণের নেপথ্যের গল্প জানতে চাইলে তিনি মৃদু হেসে মেলে ধরলেন স্মৃতিমাখা গল্পের ঝাঁপি, ‘আমার বেড়ে ওঠা ব্রিটিশ সংস্কৃতিতে। সেখানে বর্তমান প্রজন্মের সবাই খুব ভালো করে বাংলা বলতে পারে না। আমার মা-বাবা দুজনের বাড়ি সিলেট। আমার বাবা ১৯৫৩ সালে লন্ডনে পাড়ি জমান। জন্ম থেকে শুনেছি যে আমরা বাংলাদেশি। কয়েকবার দেশেও এসেছি, কিন্তু এতে তো দেশটাকে চেনা হয় না। মা-বাবার কথা শুনে, বই পড়ে দেশকে জানার চেষ্টা করি। যেখানে আমরাই ভালো করে জানি না সেখানে বিদেশের মানুষরা কীভাবে জানবে আমাদের কথা। সেই দেশের মানুষকে বাংলাদেশের যে গৌরবময় ইতিহাস আছে তা জানানোর খুব একটা উদ্যোগও চোখে পড়ে না। সেজন্যই আমার চলচ্চিত্রের বিষয় হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকে বেছে নেওয়া। সেইসঙ্গে সবচেয়ে বেশি নজর দিয়েছি আমার চলচ্চিত্রের ভাষা, চিত্রায়ণ যেন পাশ্চাত্যের ভাষায় হয়। যা সে দেশের মানুষের সামনে বাংলার এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের কথা তুলে ধরবে এবং যা তারা বুঝতে পারবে।’ এই প্রতিভাবান তরুণ পড়াশোনা করেছেন চলচ্চিত্রের ওপরে। ছোটবেলা থেকেই বিদেশের স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি আরবি শিখেছেন, বাংলা শিখেছেন। তিনি নির্মাণ করেছেন ‘মাইল এন্ড টু মক্কা’ ডকুমেন্টারি ফিল্ম; ‘চয়েসেস’, ‘লাস্ট নাইট’-এর মতো স্বনামধন্য শর্ট ফিল্ম। এসবের পাশাপাশি ভারতীয় ও হলিউডের সিনেমার টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিচ্ছেন নিয়মিত। এ ছাড়া এসব চলচ্চিত্র ও স্টারদের শোয়ের প্রমোশনের কাজও করছেন নিয়মিত। যেমন বলিউডের ‘তেজ’ সিনেমার টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়েছে তার প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া ইয়াশরাজ ফিল্মসের ‘দিল বোলে হারিপ্পা’-এর প্রচারণা, ‘শাহরুখ ও অ্যাকন’ লন্ডনে আয়োজিত কনসার্টের প্রচারণার কাজ করেছেন। এর পাশাপাশি লন্ডনের জনপ্রিয় শিল্পীদের মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করছেন নিয়মিতই। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘৭১-এর সংগ্রাম’-এর চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও প্রযোজনা করেছেন মনসুর আলী নিজেই। এটি তার প্রথম চলচ্চিত্র হলেও তার প্রস্তুতি কিন্তু ছিল বিশাল। মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র বলেই এই স্বাধীনতার মাসে বাংলাদেশে মুক্তি পাচ্ছে চলচ্চিত্রটি। আগামী ২৮ মার্চ থেকে সারাদেশের সিনেমা হলগুলোতে মুক্তি পাবে ছবিটি। আর আগামী জুন মাসে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হবে লন্ডনে। চলচ্চিত্রের গল্পে দেখা যাবে, একজন ব্রিটিশ বাংলাদেশি নাগরিক, যিনি ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে অবস্থান করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের ৪২ বছর পর প্রথম কোনো সাংবাদিকের সামনে নিজের সেই অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেছেন। এই ছবিতে ব্রিটিশ নাগরিকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ভারতের জননন্দিত অভিনেতা অনুপম খের এবং সাংবাদিকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় ইতালিয়ান নায়িকা আজিয়া আরজেনটো। এই ছবির শতকরা ৯০ ভাগ শুটিং হয়েছে বাংলাদেশের সিলেট ও ঢাকার বিভিন্ন লোকেশনে এবং বাকিটা লন্ডনে। এই চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে পরিচালক বলেন, ‘এই ছবি নিয়ে আমার প্রত্যাশা হলো—সবাই সিনেমা হলে গিয়ে ছবিটি দেখুক। কেননা এই ছবিতে নতুন কিছু ভাবনা যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত ও হলিউডের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এই ছবিতে অভিনয় করেছেন। যা সবার কাছে ভালো লাগবে আশা করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি ঈদের দিনেও এই ছবির শুটিং করেছি। আসলে সত্যি বলতে কি, আমি টাকার জন্য ফিল্মটি নির্মাণ করিনি। মাতৃভূমিকে ভালোবেসে এবং বাংলাদেশকে বিশ্বের দর্শকের সামনে তুলে ধরতে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছি।’ বাংলাদেশের মানুষের কাছে অপরিচিত এক নাম হলেও মনসুর আলী ইংল্যান্ডে এরইমধ্যে নিজের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান করে নিয়েছেন। ২০১৪ সালে ব্রিটেনের ‘হাউস অব পার্লামেন্ট’, ‘পাওয়ার অ্যান্ড ইন্সপিরেশন’ হিসেবে ১০০ জন তরুণ ব্যক্তিত্বের মধ্যে মনসুর আলীকেও নির্বাচন করা হয়। মনসুর আলী গত ৭ বছর ধরে সারাবিশ্বে নির্মিত শর্টফিল্মের ওপরে শ্রেষ্ঠ শর্টফিল্মকে ‘লাইমলাইট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড’ পুরস্কার দিয়ে আসছেন। পুরস্কার হিসেবে দিচ্ছেন ১০ হাজার পাউন্ড। এ ধরনের উদ্যোগের জন্য ব্রিটিশরাজ পরিবারের প্রিন্স চার্লস মনসুর আলীর সঙ্গে দেখা করে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। চলচ্চিত্র নিয়ে আগামী ভাবনা প্রসঙ্গে মনসুর আলী বললেন, ‘চলচ্চিত্র সাধারণ মানুষের কাছে খুব সহজে ইতিহাস বর্ণনা করতে পারে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যত চলচ্চিত্র আমরা দেখি তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডের লড়াই দেখতে পাই। কিন্তু সে যুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যদেরও অবদান ছিল। সে ইতিহাস আমরা পাই না। যারা পড়াশোনা করেন তারা জানতে পারেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে সেই ইতিহাস পৌঁছায় না। আমি মুক্তিযুদ্ধকে ইংল্যান্ড ও হলিউডের দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। সেজন্যই আমার এ চলচ্চিত্রে ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা অনুপম খেরকে নিয়েছি। হলিউডের ‘ট্রিপল এক্স’ চলচ্চিত্রটির জনপ্রিয় ইতালিয়ান নায়িকা আজিয়া আরজেনটো এবং বাংলাদেশের মডেল ও অভিনেত্রী রুহি ও শক্তিমান অভিনেতা আরমান পারভেজ মুরাদ, অনন্ত হীরাকে নিয়েছি। যাতে বাংলাদেশের দর্শকদের কাছেই শুধু নয়, ভারত ও হলিউডের দর্শকদের কাছেও পৌঁছাতে পারি।’ মনসুর আলী বাবা :হাজী মসরব আলী মা :সাহেরা খাতুন প্রথম স্কুল :স্যার জন ক্যাস স্কুল (লন্ডন) অবসর কাটে যেভাবে :সুইমিং করে ও গান শুনে সাফল্যের সংজ্ঞা :লক্ষ্য ঠিক রেখে পরিশ্রম করলে সফলতা আসবেই।