উপজেলা নির্বাচন :মানুষ জাগিয়া উঠিতেছে

চতুর্থ ধাপের উপজেলা নির্বাচন গতকাল শেষ হইয়াছে। এই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ সত্ত্বেও কয়েক স্থানে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে সহিংসতার খবর পাওয়া গিয়াছে। বিশেষ করিয়া মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় একজন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান নিহত হইয়াছেন। বিভিন্ন সংঘর্ষে আহত হইয়াছেন অনেকে। ইহাছাড়া শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কয়েকটি কেন্দ্র দখল, প্রভাব বিস্তার, পোলিং এজেন্টরদের মারধোর, অগ্নিসংযোগ, ব্যালট পেপার ও বক্স ছিনতাই, কোন কোন এলাকায় ভোট গ্রহণ স্থগিত ইত্যাদি ঘটনা ঘটিয়াছে। কয়েকজন প্রার্থী শেষমুহূর্তে ও নির্বাচন চলাকালীন অনিয়মের অভিযোগ তুলিয়া সরিয়া দাঁড়াইয়াছেন। সহিংসতা ও অনিয়মের প্রেক্ষিতে কোথাও কোথাও হরতাল আহ্বান করা হইয়াছে। দৃশ্যত প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা নির্বাচনের তুলনায় তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপের নির্বাচনে সহিংসতা বেশি হইয়াছে। সেনাবাহিনীকে প্রয়োজনীয় ম্যাজেস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়ার পরও আমাদের এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হইতে হইয়াছে। তবে সার্বিক বিশ্লেষণে এই নির্বাচনকে অগ্রহণযোগ্য বলিবার কোন অবকাশ নাই। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বয়স খুব বেশি নহে। পকিস্তান আমলের প্রায় পুরাটা সময় জুড়িয়া আমরা যাহা প্রত্যক্ষ করিয়াছি তাহার নাম স্বৈর ও সামরিকতন্ত্র। ১৯৭১ সালে গণতন্ত্রের মহান স্বপ্নকে ধারণ করিয়া এই দেশ স্বাধীন হইলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা উল্লেখযোগ্য সময় জুড়িয়া অগণতান্ত্রিক সরকারের অধীনেই শাসিত হইয়াছি। নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থানের পর আমরা গণতন্ত্র পাইলেও অগণতান্ত্রিক শক্তি কখনও বসিয়া থাকে নাই। সুযোগ পাইলেই কামড় দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছে। গণতান্ত্রিক শক্তি বিকশিত হইবার পূর্বেই ওয়ান ইলেভেনের ন্যায় একটি অগণতান্ত্রিক শক্তি আমাদের স্কন্ধে চাপিয়া বসে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু ও সহিংসমুক্ত হইবে তাহা আশা করা সহজ বটে, তবে বাস্তবে তাহার প্রতিফলন ঘটানো কঠিন। তদুপরি উপজেলা নির্বাচন একটি স্থানীয় সরকারের নির্বাচন। আশির দশকে হোসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে ইহার অগ্রযাত্রা শুরু হইলেও নিয়মিত এই নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয় নাই। এই পরিস্থিতিতে ২০০৯ সাল হইতে উপজেলা নির্বাচনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হইতেছে, ইহাই আমাদের নিকট বড় পাওয়া। নির্বাচনে সহিংসতার সংস্কৃতি হইতে সম্পূর্ণ মুক্তি পাইতে আমাদের আরও অপেক্ষা করিতে হইবে বৈকি। গণতান্ত্রিক মন-মানসিকতা ও ধ্যান-ধারণা যত বিকশিত হইবে, ততই শক্তিশালী ও পরিমার্জিত হইবে আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা। আমরা ইউরোপ-আমেরিকার ন্যায় উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের সহিত তুলনা করিয়া নিজেদেরকে ছোট করিতে চাহি না। কেননা গণতন্ত্রে অভ্যস্ত হইতে তাহাদের কয়েকশত বত্সর লাগিয়াছে। সেই তুলনায় আমরা আসলে এখনও নবীন গণতান্ত্রিক দেশ। আমাদের বরং নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের দিকে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। ভারত বর্তমানে পৃথিবীর বৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশ। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর হইতে সেখানে নিরবচ্ছিন্নভাবে গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রহিয়াছে। আমাদের মত মাঝপথে তাহারা পথ হারান নাই। সেইখানে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় উভয় নির্বাচনে এখনও সহিংসতার খবর পাওয়া যায়। নির্বাচনের আগে-পরেও দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়। তবে সেইখানকার নির্বাচন কমিশনের সার্থকতা এই যে, তাহারা শত প্রতিকূলতার মধ্যেও দমিয়া যান না। যে কোন প্রকারে হউক নির্বাচন সম্পন্ন করেন। আর কমিশনকে সহায়তা ও সমর্থন করে অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি। অর্থাত্ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করিতে হইলে সকলেরই সহায়তা দরকার। বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন বা স্থানীয় সরকারের যে কোন নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে শক্ত ভূমিকা গ্রহণ করিতে হইবে। দুই-একটি বা বিচ্ছিন্ন সহিংসতায় হতোদ্যম হইলে চলিবে না। বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচনকে তাহাদের উত্সব হিসাবে বিবেচনা করিয়া থাকেন। প্রকৃতিগতভাবে তাহারা নির্বাচনমুিখ ও গণতন্ত্র প্রিয়। তাহাদের এই ব্যাপারে সচেতনতা আরও বাড়িতেছে বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। যেমন কোন কোন ক্ষেত্রে তাহারা সাহসী ভূমিকা পালন করিতেছেন। নির্বাচনী আচরণ লংঘনের জন্য তাহারা তত্ক্ষণাত্ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করিতেছেন। আইন অমান্যকারীকে হাতেনাতে ধরিতেছেন। অর্থাত্ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান ও গণতন্ত্রের ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষ জাগিতে শুরু করিয়াছেন। এই জাগরণ আর কোনভাবেই স্তব্ধ করা যাইবে না।