পানি নিয়ে ভাবতে হবে
প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০১৪, ২১:৫৮
অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে আজ নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীনালা। ভাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশে বেশির ভাগ নদীই প্রবেশ করেছে ভারত থেকে। গঙ্গা ও তিস্তা নদীর উজানে ভারত বাঁধ দেয়ায় পানির প্রবাহ কমে গিয়ে মূল নদী ও শাখা নদীসহ অন্য ছোট ছোট খাল-বিলে এমনিতেই এখন পানি নেই, তার উপর অসহায় বিপন্ন নদীগুলোকে খুবড়ে খাচ্ছে অবৈধ বালু উত্তোলনকারী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, বিভিন্ন বাণিজ্যিক দখলদার এবং একইসাথে শিল্প কল-কারখানাগুলো তাদের কঠিন ও তরল দূষিত বর্জ্য ফেলে নদীকে মাত্রাতিরিক্ত দূষিত করছে। এছাড়াও নদীর উপর দিয়ে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পাধীন অপরিকল্পিত কালভার্ট, ব্রিজ, স্লুইস গেট, বাঁধ, ক্রস ড্যাম, রাস্তা ইত্যাদি নির্মাণ করার ফলে নদী হারিয়ে ফেলছে তার স্বাভাবিক গতি।
ঢাকা ওয়াসার পরিসংখ্যানুযায়ী রাজধানীর ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর বছরে ৩ মিটার বা ৯ ফুট করে নেমে যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ, মাত্রাতিরিক্ত ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন। ক্রমবর্ধমান মানুষের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহের নিমিত্ত ভূ-উপরিস্থ পানির আধার সুরক্ষা ও তার সুষ্ঠু ব্যবহারের সঠিক পরিকল্পনার অভাবই প্রকাশ করছে ঢাকা ওয়াসার এই পরিসংখ্যান। এমতাবস্থায়, ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমাতে হলে ভূ-উপরিস্থ নদী-নালা সুরক্ষায় অধিক মনোনিবেশ করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে।
জাতিসংঘের দেয়া তথ্যানুযায়ী পৃথিবীতে প্রতি ৬ জনের মধ্যে একজন মানুষ নিরাপদ পানীয় জল থেকে বঞ্চিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০২৫ সাল নাগাদ ৪০০ কোটি মানুষ পানির অভাবে ভুগবে। পৃথিবীর মোট পানির ১% হলো মিঠা বা স্বাদু পানি, যার মাত্র ০.৩% নবায়নযোগ্য। এই এক ভাগ মিঠা পানির ভূ-উপরিস্থ উত্স নদীগুলোতে আমরা বাঁধ দিয়ে গতি পরিবর্তন করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করছি। বিভিন্ন কলকারখানার বর্জ্য, পয়ঃনিষ্কাশন বর্জ্য ইত্যাদির মাধ্যমে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। নগরায়ন ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের ফলে নদী, উন্মুক্ত জলাশয়গুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা শহরের গোড়াপত্তন হয়েছে যে নদীকে কেন্দ্র করে সেই বুড়িগঙ্গা এখন এমনভাবে দূষিত হয়েছে যে, এর পানি শোধন করেও ঢাকা নগরবাসীদের ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। শীতলক্ষ্যা নদীরও একই অবস্থা। এদিকে মেঘনার অবস্থাও যায় যায় করছে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও কঠোর আইন প্রয়োগের অভাবে মেঘনার দুই তীরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিল্পকারখানা তাদের তরল ও কঠিন বর্জ্য নিষ্কাশন করছে মেঘনা নদীতে। এখনই উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে মেঘনাকেও আর রক্ষা করা যাবে না।
আমাদের দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক এলাকাতেই মিঠা পানির সরবরাহ একেবারেই অপ্রতুল। আইলা, সিডরের ফলে সেসব এলাকার অনেক পোল্ডার ভেঙ্গে গিয়ে লবণ পানি প্রবেশ করায় তা ব্যবহারের অযোগ্য। পাশাপাশি লবণ পানিতে চিংড়ি চাষও লবণাক্ততা প্রবেশের অন্যতম কারণ। সে সকল এলাকার মানুষকে দূর-দূরান্ত থেকে হেঁটে অথবা ভ্যানে করে পানি সংগ্রহ করতে হয়। উত্তরের অনেক জেলা-উপজেলাতেও পানির অভাব রয়েছে। সেখানে লবণাক্ততা না হলেও গভীর নলকূপের ব্যবহার অনেক বেশি। এ অঞ্চলে শতকরা ৭৫ ভাগ ক্ষেত্রে ভূ-গর্ভস্থ পানিই সেচকার্যের প্রধান উত্স। এক সময়ের প্রমত্তা পদ্মা নদীতে এখন বড় বড় চর জেগেছে। স্রোতস্বিনী নদ-নদীর বুক জুড়ে এখন শুধুই ধু-ধু বালুচর। দুরন্ত যৌবতি নদী এখন শীর্ণকায়। দূষণ-দখল আর নগরায়নের ফলে নদীগুলো নিশ্চিহ্ন প্রায়। আমরা ভাবছি কি আমাদের নদী নিয়ে? ভবিষ্যত্ নাগরিকদের নিরাপদ পানীয় জলের সহজপ্রাপ্যতার বিষয়টি নিয়ে?
খসড়া তিস্তা চুক্তিতে যেভাবে পানি বণ্টনের বিষয়ে বলা হয়েছে তা হলো, ভারতের গজলডোবা পয়েণ্টের কাছে প্রবাহিত পানির পরিমাণ হিসাব করে দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টন করা হবে। এ বিষয়ে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় ১ সেপ্টেম্বর ২০১১ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “৪৬০ কিউসেক পানি জমা রেখে বাকি পানির ৫২ শতাংশ নেবে ভারত এবং ৪৮ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ”। এই হিসাবানুযায়ী ভাগ হলে বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে পাবে ২৫ শতাংশ এবং ভারত পাবে ৭৫ শতাংশ।
গঙ্গার পানি বণ্টন সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে গত ৩ দশকে ভারত ও বাংলাদেশ দুটো সমঝোতাপত্র এবং দুটো চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানির সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার জন্য, বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বি-পাক্ষিক সহযোগিতামূলক আলোচনার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া একান্ত জরুরি।
লেখক :উন্নয়ন কর্মী