কুমিল্লায় ডাকাতিয়া-কাঁকড়ি নদী রক্ষা বাঁধ চরের মাটি কেটে নিচ্ছে প্রভাবশালীরা

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে নেমে আসা কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কাঁকড়ি নদীটি উপজেলার কাশিনগর এলাকায় এসে পুরাতন ডাকাতিয়া ও নতুন ডাকাতিয়া নদী নাম ধারণ করে একটি শাখা ছোট ফেনী নদীর সাথে ও অপর একটি শাখা বঙ্গোপসাগরের সাথে মিশে গেছে। এ বছর শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই চৌদ্দগ্রাম অংশে ডাকাতিয়া ও কাঁকড়ি নদী রক্ষা বাঁধ ও চরের কমপক্ষে ২০টি পয়েন্ট থেকে মাটি কেটে ট্রাক ও ট্রাক্টরযোগে ইটের ভাটাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছে প্রভাবশালী অন্তত ১২টি সিন্ডিকেট। এভাবে প্রতিবছরই মাটি বিক্রি করে প্রভাবশালীরা লাভবান হলেও বর্ষা মৌসুমে প্রতিবারই বিভিন্ন স্থানে ভাঙে নদী রক্ষা বাঁধ এবং তলিয়ে যায় নদীপাড় ও তত্সংলগ্ন এলাকার মানুষের বাড়িঘর ও ফসলের জমি। সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে নদী রক্ষা বাঁধ মেরামত করলেও বাঁধ-চরের ওই মাটি বিক্রি করে অনেকে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যান। আর বর্ষা মৌসুম এলে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে নিঃস্ব হন এলাকার কৃষক ও নিরীহ মানুষ। 

বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, খরস্রোতা কাঁকড়ি নদীর উত্পত্তিস্থল সংলগ্ন জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কৃষ্ণপুর, চকলক্ষ্মীপুর, আশ্রাফপুর, উত্তর যাত্রাপুর, রামপুর, অলিপুর, কাঁকড়ি-ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থল কাশিনগরের তিন গাঙ্গের মুখ ও ব্রিজের উত্তরে, মরা ডাকাতিয়া নদীর হিলালনগর-বারইয়া থেকে উত্তর ধর্মপুর পর্যন্ত মাঝামাঝি অংশের একাধিক স্থানসহ প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকার কমপক্ষে ২০টি পয়েন্ট থেকে অন্তত ১২টি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চলতি বছরের শুষ্ক মৌসুমের শুরু থেকে শ্রমিক লাগিয়ে ও মাটি কাটার ভারী মেশিনের সাহায্যে নদী রক্ষা বাঁধ ও চরের মাটি কেটে ট্রাক ও ট্রাক্টরযোগে অন্যত্র বিক্রি করছে। কাশিনগরের তিন নদীর মুখ ও ব্রিজের উত্তরে পাঁচটি মেশিনের সাহায্যে মাটি কেটে বিক্রি করার ফলে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত দুটি ব্রিজ হুমকির সম্মুখীন বলে জানা গেছে।

এছাড়া মাটি কাটা চক্র নদী রক্ষা বাঁধ ও চরের মাটি কেটে নেয়ার ফলে কাশিনগর এলাকার বারিয়া ব্রিজ, কাশিনগর বাজার ব্রিজ, কাশিনগর কলেজ সংলগ্ন ব্রিজ, হিলালনগর-কাতালিয়া ব্রিজও হুমকির মুখে রয়েছে।

জানা যায়, চৌদ্দগ্রামের শতাধিক ইটভাটার মাটি, বিভিন্ন এলাকার পুকুর ভরাট, নতুন শিল্পকারখানা নির্মাণে জমি ভরাটসহ ঠিকাদারের রাস্তাঘাট নির্মাণে মাটির যোগান হয় কাঁকড়ি-ডাকাতিয়া নদী রক্ষা বাঁধ ও চরের মাটি থেকে।

কাশিনগর, হিলালনগর ও কাতালিয়া গ্রামসহ নদীসংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষক আবদুল মজিদ, আফতাবউদ্দিন, ফরিদ মিয়া, বিল্লাল হোসেন, আজিমউদ্দিনসহ অনেকে বলেন, প্রতিবছরই শুষ্ক মৌসুম এলে চিহ্নিত এসব সিন্ডিকেট কাঁকড়ি ও ডাকাতিয়া নদী রক্ষা বাঁধ ও চরের মাটি বিক্রি করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ফলে বর্ষা মৌসুমে প্রায় প্রতিবছরই বিভিন্ন স্থানে নদী রক্ষা বাঁধ ভেঙে পড়ে। এতে তলিয়ে যায় নদীপাড় ও তত্সংলগ্ন এলাকার মানুষের বাড়িঘর ও বিস্তীর্ণ মাঠের ফসলি জমি, বাড়ে জনদুর্ভোগ, নিঃস্ব হন পাড়ের নিরীহ মানুষ। এছাড়া নদীর নাঙ্গলকোট ও লাকসাম অংশের নদী বিভিন্নস্থানে মাটি কাটা অব্যাহত আছে বলে তারা জানান।

পানি উন্নয়ন বোর্ড কুমিল্লার পওর উপ-বিভাগ-২ সূত্র জানায়, ২০১৭-’১৮ অর্থ বছরসহ গত তিনটি অর্থ বছরে শুধুমাত্র কাঁকড়ি নদীর তীর রক্ষা বাঁধ মেরামত কাজে সরকারের এক কোটি ৫৬ লাখ ৫৯ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এ ছাড়া পুরাতন ডাকাতিয়া ও নতুন ডাকাতিয়া সেচ ও নিষ্কাশন প্রকল্প নামে ৪৯ কোটি ৮৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকার আরও একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছর থেকে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে।

চৌদ্দগ্রাম উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপন দেবনাথ জানান, ‘কাশিনগর ও আকদিয়া এলাকায় চারদিন আগে অভিযান চালিয়ে দুটি ট্রাক্টর আটক এবং দুই হাজার ফুট পাইপ, একটি ভেকু মেশিন বিনষ্ট করা হয়েছে, আরেকটি মেশিন পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। নদীর মাটি কাটা বন্ধে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আবদুল লতিফ জগলুল জানান, ‘ডাকাতিয়া ও কাঁকড়ি নদী, চর ও পাড়ের মাটি যারা কেটে নিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে।

পাউবো উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ আবদুল্লাহ আল-মামুন অর রশিদ ভূঁইয়া বাদী হয়ে আমির হোসেন, আলমগীর, রবিউল, মনির হোসেনসহ মাটি কাটা সিন্ডিকেটের চারজনের বিরুদ্ধে চৌদ্দগ্রাম থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।’

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মোঃ আবুল ফজল মীর জানান, যারা নদী রক্ষা বাঁধ ও চরের মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত রয়েছে তারা যতোই প্রভাবশালী হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।