ট্যাক্সিক্যাব এখন সময়ের দাবি

পৃথিবীর কোনো নগর বা মহানগর ট্যাক্সি ব্যতীত চলাচল-বান্ধব হইয়া উঠে না। ঢাকা মহানগরের যেই সকল দুর্বিপাক নগরবাসীর চলাচলের স্বাচ্ছন্দ্যকে ম্রিয়মাণ করিতেছে, তাহার ভিতরে ট্যাক্সির অভাব অন্যতম। অথচ কয়েক বত্সর ধরিয়া ট্যাক্সি যেন বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রাণীর মতো বিরলদৃশ্য হইয়া উঠিয়াছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রায় বত্সর খানেক ধরিয়া ট্যাক্সিসেবা কার্যোপযোগী করিতে নূতন ও আধুনিক মানের ট্যাক্সি-যাত্রার চেষ্টাচরিত করিয়াছে বটে, কিন্তু তাহার দৃশ্যমান ফলাফল আমরা এখন পর্যন্ত দেখিতে পাইতেছি না। এইবার জানা গেল, আগামী ১৪ এপ্রিল তথা পহেলা বৈশাখে ঢাকা ও ইহার পার্শ্ববর্তী পাঁচটি জেলায় উন্নতমানের প্রায় পাঁচশত ট্যাক্সিক্যাব নামানো হইতেছে। জাপানে তৈরি এসি ও নন-এসি এই ট্যাক্সিক্যাবের সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাড়াবৃদ্ধিরও পরিকল্পনা করা হইয়াছে। মধ্যবিত্ত যাত্রীদের চাহিদার তুলনায় এই পাঁচশত ট্যাক্সি নিঃসন্দেহে অপ্রতুল। কিন্তু এই নূতন উদ্যোগের শুভযাত্রাকে ছোট করিয়া দেখিবার অবকাশ নাই। কেননা, অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হইবার ফলে ইতোমধ্যে রাজধানীর প্রায় ১১ হাজার ট্যাক্সিক্যাব অবৈধ হইয়া গিয়াছে। মধ্যবিত্তের স্বাচ্ছন্দ্যের বাহন হিসাবে ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস পরিচালনা শুরু হইয়াছিল ১৯৯৭ সালে। ইহার সেবা তুলনামূলক সাশ্রয়ী করিতে সেই সময় রেয়াতি শুল্কে ট্যাক্সি আমদানির অনুমোদন দিয়াছিল সরকার। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন কারণে ট্যাক্সি পরিণত হইয়াছে সোনার হরিণে। প্রায় দেড় বত্সর পূর্বে আধুনিক মানের হাজারখানেক ট্যাক্সি নামাইবার পরিকল্পনা লওয়া হইলেও তাহা শেষ অবধি আলোর মুখ দেখে নাই। গত বত্সরের মাঝামাঝি সময়ে সাড়ে তিন হাজার ট্যাক্সি আমদানির অনুমতি মিলিলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যেকোনো কারণেই হউক, তাহা আমদানি করে নাই। প্রায় আট মাস পূর্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা করিয়াছিল ‘দুই-তিন মাসের মধ্যেই’ ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) সম্বলিত যাত্রীবাহী অত্যাধুনিক পাঁচ হাজার ট্যাক্সিক্যাব নামাইবার। পরিকল্পনা ছিল—জাপান হইতে জিপিএস প্রযুক্তিযুক্ত ট্যাক্সিক্যাব আমদানি করা হইবে। এই জিপিএস-প্রযুক্তি যুক্ত ট্যাক্সিসেবা প্রতিবেশী ভারতেও এক্ষণে জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে। তাহা কিয়ত্খানিক ব্যয়বহুল হইলেও আমাদের মধ্যবিত্ত জনগণের আর্থিক সামর্থ্যও পূর্বের তুলনায় নূতন উচ্চতায় উন্নীত হইয়াছে। তাই, আমাদের পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যেই প্রযুক্তি জনগণকে ২৪ ঘণ্টা সেবা দিতে পারিবে, তাহাই ক্রমশ জনপ্রিয় হইয়া উঠিবে। কিন্তু দুঃখের কথা হইল, সেই উদ্যোগও এক ধরনের হিমঘরে পড়িয়া রহিয়াছে, সেই ‘দুই-তিন মাস’ এখনও শেষ হয় নাই। মন্ত্রী মহোদয় নিজেই উপলব্ধি করেন—‘আমাদের মহানগরীকে দেখে মনে হয় না এটি কোনো মহানগরী! এতে এখন আর ট্যাক্সিক্যাব চোখেই পড়ে না।’ সুতরাং তাঁহার সদিচ্ছা লইয়া প্রশ্ন নাই। মধ্যবিত্তের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য এক্ষণে যে সিএনজি-চালিত অটোরিক্সা রহিয়াছে, তাহাদের পরিসেবা লইয়া যাত্রীদের অভিযোগের শেষ নাই। প্রথমত, তাহারা মর্জিমতো অভিলক্ষ্যে চলিবে, যাত্রীর গন্তব্যের সহিত তাহার মিল না থাকিলে তখনই কথা শেষ। দ্বিতীয়ত, মিটারে নহে, তাহারা চলেন প্রায় দ্বিগুণ ভাড়ায়, চুক্তিতে। সঙ্গে শর্ত থাকে, ট্রাফিক পুলিশ ধরিলে যাত্রীকে বলিতে হইবে তিনি মিটারেই ভ্রমণ করিতেছেন। ট্যাক্সির ক্ষেত্রেও এই সবকিছু যাত্রীদের ঘাড়ে চাপিয়া বসিবে, তাহা প্রায় অবধারিত। কর্তৃপক্ষকে ভাবিতে হইবে কার্যকর পন্থা, যাহা জনসাধারণের স্বার্থ দেখিবে। অনেকেই ইহা ভাবিয়া আতঙ্কিত হইতে পারেন যে, বাস-জাতীয় গণপরিবহনের পরিবর্তে ট্যাক্সির সংখ্যা বাড়িলে ঢাকার যানজট আরও বৃদ্ধি পাইতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, ঢাকার মতো দুর্বিষহ যানজটের সমস্যা পৃথিবীর জনবহুল প্রায় সকল মহানগরেই রহিয়াছে। অন্যদিকে নগরবাসীর পরিবর্তিত আর্থিক সঙ্গতি ও সামর্থ্য ট্যাক্সিজাতীয় তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যের বাহনকে অপরিহার্য করিয়া তুলিয়াছে। ইহার সংখ্যাবৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।