জিদটা সঙ্গে নিয়েই ফিরেছেন জিয়া

ক্যালেন্ডার বলছে, এখনও বৈশাখ আসতে ঢের দেরী। কিন্তু মিরপুরের শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে যেন সময়ের আগেই প্রবল প্রতাপে চলে এসেছে খরতাপের গ্রীষ্ম। অনুশীলন শেষ করে এই চোখ পুড়িয়ে দেয়া রোদে প্যাড-গার্ডগুলো শুকোতে দিয়েছেন ক্রিকেটাররা। বাকী সবাই একটু ছায়ার খোঁজে ড্রেসিংরুমে ছুটলেও মুমিনুল হক একা একা বসে নিজের প্যাডজোড়ায় কি যেন করছিলেন। দূর থেকে মনে হচ্ছিল—একজন ক্লান্ত মানুষ বুঝি রোদের মধ্যে বসে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভাবছেন; মুখে হাসি নেই, কথা নেই। কিন্তু হঠাত্ই পাশ থেকে জিয়াউর রহমানকে হেঁটে যেতে দেখে হাসি ফুটলো মুমিনুলের মুখে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সাংবাদিকদের দিকে তাকিয়ে মুমিনুল স্বভাবসুলভ দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বললেন—প্রথম প্রশ্ন, হঠাত্ করে দলে ডাক পেয়ে কেমন লাগছে? মুমিনুল যতই রসিকতা করুন, এটা এখন জাতীয় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। বারবার বঞ্চিত হতে হতে যে জিয়াউর রহমানের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, যে জিয়াউর রহমানকে দলে দেখার জন্য সমর্থকরা রীতিমতো আন্দোলন শুরু করেছেন; সেই জিয়াউর রহমান অবশেষে দলে আসায় কেমন লাগছে, সেটা কে না জানতে চান! এমনিতেই কথাবার্তায় লাজুক জিয়া এই প্রশ্ন শুনে আরও যেন একটু গুটিয়ে গেলেন। একগাল হেসে বললেন, ‘ভালো লাগছে। আলহামদুলিল্লাহ! খুব ভালো লাগছে।’ এই সামান্য কথার মধ্যে আপনি কোনো কিছুই খুঁজে পাবেন না, যদি না টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও জিয়ার ইতিহাসটা একটু না জানা থাকে। এই জিয়া হয়তো ২০০৭ সালেই ইতিহাসের প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে পারতেন। তখন জিয়া ছিলেন নিখাদ ফাস্ট বোলার এবং মারকুটে ব্যাটসম্যান। কিন্তু সেই বিশ্বকাপে দলে থেকেও শেষ পর্যন্ত খেলা হল না ইনজুরির কারণে। ওই ইনজুরি তাকে বদলে ফেলে ব্যাটিং অলরাউন্ডার বানিয়ে ফেললো; ফাস্ট বোলার থেকে মিডিয়াম পেসার হয়ে গেলেন। এরপর ২০০৯ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও দলে ছিলেন। সেবারও খেলা হয়নি। মাঝে যেন হারিয়েই যেতে বসেছিলেন জিয়া। অবশেষে এই বছর দুয়েক হল আবার সেই ব্যাটিং অলরাউন্ডার চেহারাটা নিয়ে ফিরে এসেছেন। জাতীয় দলের হয়ে অবশ্য প্রত্যাবর্তনে সাফল্য পেয়েছেন জিম্বাবুয়ে সফরে, বল হাতে। আবার এশিয়া কাপে নিজের ঝড়ো ব্যাটিং রূপটা দেখিয়েছেন। সবারই আশা ছিল, এমন ইনফর্ম জিয়া দলে থাকবেন। সেটা হয়নি। কেন হয়নি, হলে কী হত; এসব ভেবে জিয়া সময় নষ্ট করতে চান না। আসলে পুরো অতীতকেই পেছনে ফেলার এক প্রতীজ্ঞা নিয়ে ফিরেছেন যেন। পেছনের সবকিছুকে ‘ভাগ্য’ বলে ভুলে গিয়ে এবার নতুন করে নামতে চান মাঠে, ‘আসলে সবই কপাল। যা হয়ে গেছে, তা নিয়ে আর ভাবছি না। আমার জন্য এখন এটাই নরমাল হয়ে গেছে। আমার কপালটাই এরকম—ইন অ্যান্ড আউট করতে হবে। ফলে এখন আর বেশী বিস্মিত হই না। এটা ঠিক, আমার খুব স্বপ্ন ছিল দেশের মাটিতে এই বিশ্বকাপটা খেলা। সেটা যখন হল না, আমি চিন্তা করলাম, কপালে নাই। আমি খুব ফোকাস করছিলাম নিজের খেলায়। ভাবছিলাম, ভালো কিছু করতে হবে। যাতে বিশ্বকাপের পরে যে জাতীয় দলের ম্যাচ আছে, সেখানে অন্তত সুযোগ পাই। তারপর তো গত পরশু হঠাত্ করে শুনলাম যে, রুবেল ইনজ্যুরড হয়েছে। আমাকে ডাকা হয়েছে। খুশি হয়েছি। এখন ভাবছি, ভালো ফর্মে আছি; টিমে যখন আসছি, সুযোগ পেলে ব্যাটিং-বোলিং দুটোতেই ভালো করতে হবে। আমি আশা করি কিছু করে যেন দলের জন্য কিছু করতে পারি। দোয়া করবেন।’ দোয়া আপনার জন্য পুরো বাংলাদেশই করছে, জিয়া। জিয়া সেটা জানেন। জানেন, কেমন করে তার জন্য উত্তাল হয়ে উঠেছে ফেসবুক থেকে চায়ের দোকান। তবে এই জানাটাকে পাত্তা দিতে চান না। নিজের একটা জেদ আছে। কিন্তু সেটাকে এই দর্শক-সমর্থকের উন্মাদনার সঙ্গে মেলাতে চান না। এই মেলানোর চাপ থেকে দূরে থাকার মন্ত্রও জানা আছে জিয়ার, ‘আমি ওইসব ফেসবুক বা বাইরের কথা মাথায় রাখি না। হ্যা, নিজের একটা জেদ আছে। তবে বাড়তি কিছু করবো, এটা ভেবে নামা ঠিক না। আমি সুযোগ পেলে সেটা কাজে লাগাতে পারলে তখন দর্শককে বাড়তি দেয়া হবে। তাতে দলেরও কাজ হবে, আমারও উপকার হবে। আসল ব্যাপার হল পারফরম্যান্স। পারফরম্যান্স করতে পারলে সব হবে। আবার ভাবেন, এতো কিছুর পর আমি খারাপও তো করতে পারি। ফলে আগেই এতো ভাবা ঠিক না। তবে হ্যা, নিজের জেদটা আছে—সুযোগ পেলে ভালো কিছু করবোই।’ সময় এবং ইনজুরি জিয়ার কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিতে পেরেছে। এই জেদটা কাড়তে পারেনি। এবার সেটার চূড়ান্ত প্রদর্শনের পালা।