স্বাধীনতাহীনতায় কেহই বাঁচিতে চাহে না

আজ মহান স্বাধীনতা দিবস। আমাদের জাতীয় জীবনে অনন্য একদিন। স্বাধীনতার স্বপ্ন সকলেই দেখে, কিন্তু তাহার আস্বাদ গ্রহণের সৌভাগ্য সকলের হয় না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সংগ্রাম করিয়াও স্বাধীনতার স্বপ্ন অধরাই রহিয়া গিয়াছে— এমন দৃষ্টান্তও কম নহে। জাতি হিসাবে আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নও যে দীর্ঘকালের তাহার উদাহরণের অভাব নাই। দেড়শতাধিক বত্সর আগে বাঙালি কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮২৭-১৮৮৭) লিখিয়াছিলেন, ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়/দাসত্বশৃঙ্খল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়’। বস্তুত স্বাধীনতাহীনতায় কেহই বাঁচিতে চাহে না। পদে পদে পরাধীনতার শৃঙ্খলের নির্মম আঘাতে যাহাদের হূদয় রক্তাক্ত হয় নাই— তাহাদের পক্ষে হয়তো স্বাধীনতার জন্য মানুষের এই আকুলতার তাত্পর্য সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব নহে। সেইদিক হইতে আমরা বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী। আমরা পরাধীনতার যাতনা ভোগ করিয়াছি। আবার স্বাধীনতার স্বাদও পাইয়াছি। সেই স্বাদের পূর্ণতা-অপূর্ণতা লইয়া প্রশ্ন থাকিতে পারে, কিন্তু বাঙালির হাজার বত্সরের ইতিহাসে ইহা যে এক অতি বিরল ঘটনা তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। আর যাঁহার জাদুকরী নেতৃত্বে এই অসাধ্য সাধিত হইয়াছিল তিনি হইলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই জন্য বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু পরস্পর অবিচ্ছেদ্যই বলা যায়। দিনটি যুগপত্ আনন্দের ও বেদনার। এই আনন্দের যেমন তুলনা হয় না, তেমনি ইহার পশ্চাতে যেই রক্ত ও অশ্রুর সমুদ্র বহমান তাহাও বিস্মৃত হওয়া কঠিন। স্বাধীনতার জন্য আমাদের অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করিতে হইয়াছে। পাড়ি দিতে হইয়াছে দীর্ঘ রক্তাক্ত পথ। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন নিঃসন্দেহে সেই যাত্রাপথের গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক। ইহার পর চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছিষট্টির ৬ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও সত্তরের নির্বাচন স্বাধীনতার স্বপ্নকে আরও স্পষ্টতর করিয়া তুলিয়াছে। এই স্বপ্নকে কেন্দ্র করিয়াই গড়িয়া উঠিয়াছে জনতার ইস্পাত কঠিন ঐক্য। একাত্তরের ৭ই মার্চ রেসকোর্সের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠে যখন ঘোষিত হইল— ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম...’ তখনই সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, ভয়-ভীতি, বাধা-বিপত্তি খড়কুটোর মতো ভাসিয়া যায়। জনতার এই অবিস্মরণীয় ঐক্য ও জাগরণের পথ ধরিয়াই আসিয়াছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। স্বাধীনতার পর ৪৩ বত্সর অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছে। অতএব, এই প্রশ্ন উত্থাপিত হইতে পারে যে, আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন কি সফল হইয়াছে? ইহার উত্তরে একপক্ষ হয়তো বলিবেন যে— না, সফল হয় নাই। আবার অন্যপক্ষ বলিতে পারেন যে— অবশ্যই সফল হইয়াছে। আমরা মনে করি যে উভয়পক্ষেই জোরালো যুক্তি রহিয়াছে। বস্তুগত বিচারে স্বাধীনতা আমাদের অনেক কিছুই দিয়াছে। সমাজ ও অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাহার উজ্জ্বল স্বাক্ষরও রহিয়াছে। তবে স্বাধীনতার মর্মগত অর্থ বিবেচনায় নিলে হতাশার সাথে বলিতে হয় যে সেই স্বপ্ন অনেকটা এখনও অধরাই রহিয়া গিয়াছে। আমাদের স্বাধীনতার মহান স্থপতিগণ সর্বপ্রকার ভয়-ভীতি ও বৈষম্যমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক যেই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন, সেই স্বপ্নকে সফল করিতে হইলে পাড়ি দিতে হইবে দীর্ঘ পথ। মনে রাখিতে হইবে যে, স্বাধীনতা আমরা অর্জন করিয়াছি। ইহা কাহারও দয়ার দান নহে। স্বাধীনতা আমাদের সামনে সম্ভাবনার এক বিশাল দিগন্ত উন্মোচন করিয়া দিয়াছে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মকেই গ্রহণ করিতে হইবে। ইহাই হইতে পারে যাঁহাদের বীরোচিত আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পাইয়াছি, তাহাদের প্রতি যথোচিত শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সর্বোত্তম পন্থা।