অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০১৪, ২১:৫১
তখন আমি অনেক ছোট । বয়স পাঁচ কি ছয়। বাবাকে একদিন প্রশ্ন করেছিলাম, বাবা স্বাধীনতা কী? বাবা বলেছিল, নিজের অধিকারকে ঠিকভাবে প্রকাশ করা, নিজের ভাষায় কথা বলা, সহজভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, নিজের ধর্ম ঠিকঠাকভাবে পালন করা। আমি বলেছিলাম এগুলো তো আমরা করতে পারি, তার জন্য আলাদাভাবে দিবস লাগবে কেন? বাবা বলেছিল, এগুলো একসময় আমরা পারতাম না, বঙ্গবন্ধু ছিল বলেই না আমরা যুদ্ধ করার সাহস পেলাম, কী ভীষণ যুদ্ধটাই না আমরা করেছিলাম। ত্রিশ লাখ লোক হাসতে হাসতে মরে গেলো। বাবা কতো সহজভাবেই না কথাগুলো বলেছিল। বয়স বাড়তে লাগলো বুঝতে পারলাম কথাগুলো যতটা সহজভাবে বাবা বলেছে, কথাগুলো অতটা সহজ নয়।
একটার পর একটা ক্লাস ডিঙাতে লাগলাম, কিন্তু পাঠ্যবইয়ের কোথাও স্বাধীনতা, ত্রিশ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ কিংবা বঙ্গবন্ধুকে খুঁজে পেলাম না, সমাজ বইয়ের এক কোণায় সাতই মার্চের একটা হাতে আঁকা ছাপানো ছবি ছিল, আমি ভেবে পেতাম না, কেন বাবা বঙ্গবন্ধুর কথা এতো বলতেন। তখন সমাজ বইয়ে একটা প্রশ্ন প্রায়ই পরীক্ষায় আসতো। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক কে? আমরা সবাই লিখতাম জিয়াউর রহমান। অনেক কাল পরে জেনেছি আমাদের ভুল শেখানো হয়েছিল।
নিজের উদ্যোগে স্থানীয় পাঠাগারে ভর্তি হয়েছিলাম। এটি ছিল আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত। বলাইবাহুল্য পরিবারের খুব সাপোর্ট পেয়েছিলাম। আমি আগ্রহ নিয়ে পড়া শুরু করলাম। ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র ঐ সময় শেখা কিছু জটিল শব্দ। আমি যে শহরে বড় হয়েছি, ঈদের সময়ে বর্ণিল আলোকছটায় আলোকিত হতো। দুর্গাপূজার সময়ও আলোকিত শহরের বিশেষ কিছু স্থান। পূজামণ্ডপের চারপাশে অনেক পুলিশ থাকতো, এখনো থাকে। একবার এক স্যারকে প্রশ্ন করেছিলাম, স্যার পূজামণ্ডপে এত পুলিশ কেন? স্বাধীন দেশে উত্সব করার অধিকার তো তাদেরও আছে। স্যার বলছিলেন, সংখ্যালঘুদের রক্ষা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। সংবিধানেও একথা বলা আছে। মনোযোগ দিয়ে পঞ্চম সংশোধনী পড়েছিলাম। দেখলাম রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। আমি আজো বুঝি নাই রাষ্ট্রের কিভাবে ধর্ম থাকে? সংবিধানের কাঁটা-ছেঁড়ায় এখন পনেরো সংশোধনী চলছে। কিন্তু ধর্মনিরেপেক্ষতার প্রশ্নে আমি পঞ্চম আর পনেরোর মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য দেখি না।
বাকস্বাধীনতা ও গণতন্ত্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ব শর্ত। এই লেখাটা যখন লিখছি তখন তথ্য আইন নিয়ে ভাবতে হচ্ছে, ভাবতে হচ্ছে এই লেখা কি শাসক বা বিরোধী দলের আঁতে ঘা দেবে কিনা? ইত্তেফাক এই লেখাটা ছাপাতে অস্বস্তি বোধ করবে কিনা ? কেননা লিখে এখানে কারাবরণ করেছে অনেকে, একজন লেখিকাকে তো গলাধাক্কা দিয়ে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। সেকুলারিজমের ব্রান্ড অ্যাম্বাসেডর শাসক দল আর আধুনিকতার কর্ণধার বিরোধী দল তো কখনো সাহসই করেনি তাকে ফিরিয়ে আনার। পাছে না আবার ভোট কমে যায় এই ভয়ে। বামদের কথা আর নাই বা বললাম। এই হলো আমাদের দেশের বাকস্বাধীনতার অবস্থা। গণতন্ত্র এখানে একদিনের ভোট দেয়া। এখানে জাতির পিতার অবদান বছরের পর বছর লুকিয়ে রাখা হয়, এখানে বছরের পর বছর শিশুদের ভুল ইতিহাস শেখানো হয়, এখানে আজো রাজাকাররা আস্ফাালন দেয়, এখানে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা দিন দিন কমে, এখানে আজো ট্রাক ভর্তি অস্ত্র আসে আর সাতক্ষীরা, বাঁশখালিতে নীরব অশ্রু ঝরে। এইসব অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত রেখেই প্রতি বছরের মতো এসেছে ২৬শে মার্চ, মহান স্বাধীনতাদিবস। লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়ার মধ্য দিয়ে বরণ করা হবে এবারের স্বাধীনতাদিবস। নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ কিন্তু এই স্বাধীনতাদিবস পূর্ণতা পাবে তখনি যখন ‘৭২-এর সংবিধান অবিকৃত অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে, অন্যথায় এটা শুধু ম্যাড়ম্যাড়ে একটা অলস ছুটিরদিন হিসাবেই রয়ে যাবে। যে দিনে আসলে কিছুই করার থাকবে না।
ঢাকা