‘সংশোধনাগার’ কথাটি কি কথার কথা

গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে গত সোমবার হঠাত্ অভিযানে ১৬টি মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ইয়াবা-গাঁজাসহ নেশাদ্রব্য উদ্ধার করা হইয়াছে। পত্রিকান্তরে এইরূপ সংবাদ দেখিয়া আমরা খুব বেশি বিস্মিত হই নাই। ইহা একটি উচ্চ নিরাপত্তাযুক্ত কারাগারের দৃশ্য। ইহার বাহিরে আরও যেই সকল সাধারণ কারাগার রহিয়াছে, সেইখানের চিত্র লইয়া অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করা হইলে—কেঁচো খুঁড়িতে কত শত কেউটের দেখা মিলিবে—তাহা বলা মুশকিল। কেন্দ্রীয় ১৩টিসহ দেশে মোট ৬৮টি কারাগার রহিয়াছে। সেইখানে মোট ধারণ ক্ষমতার তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বন্দিকে রাখা হয়। প্রথমত, কারাগারে যাহাদের স্বল্পকালীন বা দীর্ঘসময়ের জন্য আশ্রয় হয়, তাহারা সকলেই দাগী আসামি বা সত্যিকারের অপরাধী নহেন। দ্বিতীয়ত, তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশসমূহে সরিষার মধ্যেই সবচেয়ে বেশি ‘ভূত’ লুকাইয়া থাকে। তাই, যেই কারণে কারাব্যবস্থা সৃষ্টি হইয়াছে, তাহার বিপরীত ঘটনাও দেখা যায় কোনো কোনো পরিপ্রেক্ষিতে। কারাগার অনেক ক্ষেত্রেই ‘অপরাধশিক্ষা নিকেতন’ হইয়া ওঠে। কোনো নিরপরাধ মানুষ ভুল বিচারে বিনা কারণে কারাবাসের শিকার হইলে, সাজা শেষে তিনি বাহির হইয়া আসিতে পারেন দাগী আসামি হইবার শিক্ষা লইয়া। কেননা, সেইখানে সেই পরিবেশ ও চর্চাই সহজলভ্য। এই অভিযোগ নূতন নহে যে, তৃতীয় বিশ্বের কারাগারগুলি যেন অপরাধের সূতিকাগার। এইসব দেশের কারাগারে নাকি টাকা ফেলিলে সব সুযোগ সুবিধাই মেলে! কথিত আছে, ‘নিয়মের’ ফিল্টারের মাধ্যমে এইসব কারাগারে হেন কোনো দুর্নীতি ও অনিয়ম নাই যাহা হয় না। আমাদের যাহা কিছু আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি ও শৃঙ্খলা রক্ষার অবকাঠামো রহিয়াছে, তাহার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রায় সবকিছুই পশ্চিমা দেশ হইতে আমদানি করা। পশ্চিমা উন্নত দেশে কারাগার এক্ষণে শুধু অপরাধীকে অপরাধ করিতে না দেওয়ার চার দেওয়াল নহে, তাহারা যাহাতে সাজার মেয়াদান্তে সমাজের মূলধারায় মিশিয়া যাইতে পারে, দূর করিতে পারে অপরাধপ্রবণ মানসিকতা—তাহার ব্যবস্থা করা হয়। সেই কারণে সেইখানে কারাগার এক্ষণে রূপান্তরিত হইয়াছে সংশোধনাগারে। নরওয়েতে ২০১১ সালে ব্রেভিক নামের যে উগ্র জাতীয়তাবাদী যুবক ৭৭ ব্যক্তিকে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করিয়া হত্যা করিয়াছে, তাহাকে সেই দেশের আদালত মাত্র ২২ বত্সরের সংশোধনাগারে অতিবাহিত করিবার নির্দেশ (সাজা) দিয়াছেন। সেই কারাগার তথা সংশোধনাগারে আছে ব্যায়ামাগার, গ্রন্থাগারের সুবিধা। উপরন্তু তাহার কক্ষে টেলিভিশন ও কম্পিউটারের সুবিধা দেওয়া হইয়াছে। পশ্চিমা বিশ্বের কারাগারগুলি যেন ছুটিকালীন ক্যাম্পের মতো, যেইখানে গবেষণাকাজ চালানোও অসম্ভব নহে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশসমূহে কারাগার বন্দি শূন্য হইয়া শাটডাউন হইতেছে যেইখানে, সেইখানে তৃতীয় বিশ্বের কিছু কিছু অঞ্চল যেন প্রতীকীভাবে পুরোটাই একটি কারাগার। সেইখানে অধিক অপরাধীরা হয়তো কারাগারের ভিতরের কারাগারে বসবাস করেন। সুতরাং এই সব দেশের কারাগারের কারাগারসমূহে সরিষার মধ্যে ভূত থাকিতেই পারে। তাহা ছাড়া, চুরি ডাকাতি দুর্নীতি বা রাহাজানির অভিযোগে সাজাপ্রাপ্তরাই শুধু কারাভোগ করেন না, দেশে দেশে বহুকাল ধরিয়াই আমরা দেখিয়া আসিতেছি দেশপ্রেমিক বা জনগণের স্বার্থ নিয়া লড়াই করা মানুষকেও কারাগারে অন্তরীণ করা হইয়াছে বিভিন্ন সময়ে। প্রায় দুই বত্সর পূর্বে আমাদের ‘কারাগার’ খোলস পাল্টাইয়া ‘সংশোধনাগার’ নাম পাইয়াছে। অনেকের মতে, নামের পরিবর্তন বাহ্যিক মাত্র, ‘কদু’ হইয়াছে ‘লাউ’—মধ্যে যাহা ছিল, তাহাই আছে। যাহার মধ্যে সদুদ্দেশ্য রহিয়াছে, তাহার জন্য অধৈর্য হইয়া সমালোচনার মুখর হওয়া নিশ্চয়ই কাজের কথা নহে। কারাগারকে অপরাধীদের সংশোধনের জায়গা হিসাবে গড়িয়া তুলিবার সদিচ্ছায় বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের হিসাব-নিকাশও নানা জটিলতায় আকীর্ণ। বলিবার কথা হইল, পানি দিয়া বারংবার শরীর ধুইয়া ফেলিলে অন্তস্থ ময়লা সাফ হয় না। ভিতরের ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা হইতে বাহির হইয়া আসিতে না পারিলে বাহ্যিক পরিবর্তনে কার্যকর কোনো ফলোদয় ঘটে না। ‘সংশোধনাগার’ কথাটি তখন তুরস্কের কবি নাজিম হিকমত-এর ‘জেলখানার চিঠি’র মতো—“ধরো, আমার জেলের দশটা বছর—ওসব তো ‘কথার কথা” হইয়া রহিবে।