খেলার সাথে রাজনীতি, না রাজনীতির সাথে খেলা

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতির সাথে খেলা, না খেলার সাথে রাজনীতি, তা নিয়ে মানুষের মাঝে এক ধরনের যুদ্ধ চলছে। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাট-বাজার, চা এর দোকান, আড্ডাস্থলে চলছে তুমুল তর্ক-বিতর্ক। আর এ যুদ্ধ যেমন চলছে বাস্তব জীবনে, তেমন চলছে ভার্চুয়াল জগতেও। তবে বাস্তব জীবনের চেয়ে সোস্যাল মিডিয়াতে যেমন ফেইসবুক, টুইটার, ব্লগ-এ সব চেয়ে বেশি। একটা দেশ তার নিজস্ব জাতীয় পতাকা বহন করে, নিজস্ব জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে নিজেদের ভালো খেলাটা খেলতে চেষ্টা করে, চেষ্টা করে নিজেদের বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে। সেই সাথে নিজ দেশের শিল্প-সংস্কৃতি উপস্থাপন করতেও সচেষ্ট হয়। বিশ্ব পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য নানান ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। সাথে থাকে তাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দের ছবি ও জীবন কাহিনী। জাতীয় পতাকা বহন ও জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা প্রতিটি দলের জয়-পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে তাদের একটি দেশের সুনাম যেমন বয়ে আনে, তেমনি বদনামও বহন করে চলে। আর খেলায় অংশগ্রহণকারী দলের, একে অপরে মাঝে তিক্ত অভিজ্ঞতা যদি থাকে, থাকে যদি যুদ্ধ করার মত আরও তিক্ত কাহিনী, থাকে যদি স্বাধীনতা যুদ্ধের মত এক অনবদ্ধ ইতিহাস, তা হলে তো আর কথাই নেই। মাঠে চলে আরেক ধরনের যুদ্ধ, যুদ্ধ চলে দর্শক সারিতে বসা উল্লাসিত জনতার মাঝেও। আসুন, একটু পিছনের দিকে। ১৯৩৮ সালের কথা। তখন জাপান আর চীনের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ। কয়েক মাসের মধ্যেই সেই যুদ্ধে চীনের প্রায় ২০ লাখ মানুষ মেরেছিল জাপানি সৈন্যরা। চাইনিজরা ভুলে যায়নি সেই বর্বরতার ইতিহাস। আর তাই জাতি হিসেবে চাইনিজরা প্রতিশোধ নিতে নিজেদের তৈরি করেছে দীর্ঘ ৭৬ বছর ধরে। শুরু হয় জাপানি পণ্যের নকল পণ্য বাজারজাত করণ। আর খেলার মাঠে শুরু হয় জাপান-চীন এর মধ্যকার আরেক যুদ্ধ। আর সে যে খেলাই হোক না কেন। উত্তেজনা যেমন থাকে খেলোয়ারের মাঝে, তেমনি রাজনীতিবিদসহ উভয় দেশের জনগণের মাঝে। ১৯৪৭ সাল। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান আলাদা দুটি রাষ্ট্র গঠন করা হয়। কিন্তু থেমে থেমে যুদ্ধ যেন লেগেই ছিল। দুটি স্বাধীন দেশের জাতীয় পতাকা আর জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে যখন খেলা শুরু হয়, তখন নতুন করে রাজনৈতিক সমীকরণও মিলাতে থাকে দু’দেশের রাজনীতিবিদসহ সাধারণ জনগণ। খেলোয়ারের ভিতরে যেমন থাকে প্রতিশোধ পরায়ণতা, তেমনি দর্শকের সারিতে বসে খেলা উপভোগকারীর ভিতরেও থাকে আরেকটা যুদ্ধ জয়ের স্বপ্ন। ভারত-পাকিস্তান খেলা মানে টান টান উত্তেজনা। মানুষ তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে মিলাতে থাকে জয়-পরাজয়ের হিসেব-নিকেশ। আমেরিকার জন্ম শত্রু হিসেবে মনে করা হয় ইরানকে। বিশ্ব রাজনৈতিক সমীরকণে যদিও আমেরিকার কাছে ইরান একটি নাবালক বা ছোট রাষ্ট্র। আমেরিকার যেমন আছে অস্ত্র তেমন আছে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তির শক্ত অবস্থান। তবে এই দুই দেশের মধ্যে ফুটবল খেলার সময় দেখা যায়, তারা একে অপরের প্রতি কতটুকু প্রতিশোধ পরায়ণ। বাংলাদেশের খেলোয়ারও বসে নেই। আজ অনেকে সংসদ সদস্যও হয়েছেন। প্রতিনিধিত্ব করছেন বাংলাদেশের জনগণের। হয়ত কোন একদিন ইমরান খান এর মত করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও মন্তব্য করবে এই সব প্রতিনিধিত্বকারী খেলোয়াড়। শুরু হবে আরেক ধরনের যুদ্ধ। এশিয়ার কাপ এ বাংলাদেশ টাইগারদের একের পর এক পরাজয়ে, বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা হতাশ হয়েছে, হতাশ হয়েছে খোদ টাইগারস অধিনায়কও। আর তাই রাগে, অভিমানে টাইগারদের খেলা ছেড়ে দেয়ার মত মন্তব্যও করেছেন অধিনায়ক মুশফিক। এটা শুধু টাইগারস অধিনায়ক মুশফিকুর রহমানের মন্তব্য যে তা নয়, ভার্চুয়ার জগত সার্চ করলে এমন অসংখ্য মন্তব্য পাওয়া যাবে। আর এই হতাশার জন্য অনেকে রাজনীতিকে দায়ী করেছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা কেটে উঠতে না উঠতেই শ্রীলংকার সাথে খেলা। এখানেও ভালো কোনো অর্জন করতে পারেনি বাংলাদেশের টাইগারসরা। দলের মধ্যে পরাজয়ের ক্লান্তি যেখানে ভাসমান, সেখানে আবার এশিয়া কাপ খেলা সত্যিই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। আর সেটি প্রতীয়মান হয়েছে আফগানিস্তানের সাথে পরাজিত হবার মধ্য দিয়ে। চলতি টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপেও তারা হংকং ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে বাজেভাবে হেরেছে। অতএব, খেলার সাথে রাজনীতির সম্পর্ক বিদ্যমান। ৩২৬ নিয়ে ভার্চুয়াল জগতেও শুরু হয় সমীকরণ। ৩=মার্চ, অগ্নিঝড়া স্বাধীনতার মাস। ২৬=২৬ শে মার্চ, স্বাধীনতা দিবস। আর ৩২৬ = যুদ্ধাপরাধীদের জামিন অযোগ্য ধারা বলেও মন্তব্য করেন। আবার অনেকে ব্যস্ত থেকেছে রাজনৈতিক সমীকরণে। খেলার সাথে রাজনীতি, না রাজনীতির সাথে খেলা এই সমীকরণটি পাঠক হয়ত এবার নিজগুণে বুঝে নিতে সক্ষম হবেন।  লেখক : ব্লগার, সংগঠক kabir_tanmoy@yahoo.com