কী যাতনা বিষে—

সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম, ‘বিচার না পেয়ে ঘাতক হয়েছি’ এবং এর পরের লাইনেই লেখা, ‘মেয়েকে উত্ত্যক্তকারীকে হত্যার দায়ে গ্রেফতারকৃত মা’। সেখানে আছে একজন বিধ্বস্ত ভদ্রমহিলার ছবি। তার নাম খাদিজা বেগম (৪৫)। হ্যাঁ, উনিই একজনকে খুন করেছেন; ঠিক মানুষকে নয়, এক মানুষরূপী পশুকে তিনি হত্যা করেছেন। খবরটা পড়ে গা ছমছম করে উঠলো। প্রকাশিত খবরে বলা হয়, যশোর সদর উপজেলার দেয়ারা ইউনিয়নের ভেকুটিয়া গ্রামে চলতি বছরের ১২ মার্চ এই ঘটনা ঘটে। উত্ত্যক্তকারী একই এলাকার বাসিন্দা ছিল। তার নাম মফিজুর রহমান মফি (৪৪)। ব্যক্তিগত জীবনে সে পাঁচ সন্তানের জনক ছিল এবং মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি বিয়ে করেছিলেন মোট চারটি। পঞ্চম বিয়ে সম্পন্ন করার জন্য সে খাদিজা বেগম-এর ছোট মেয়েকে উত্ত্যক্ত করতো। খাদিজা বেগম তার কিশোরী মেয়েকে মফির হাত থেকে বাঁচাতে সবার কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। সবাই আশ্বাস দিলেও কেউ তাকে শেষ পর্যন্ত সাহায্য করেনি। পরে তিনি নিজেই মেয়েকে রক্ষার ভার তুলে নেন। একজন স্নেহময়ী মায়ের নাম উঠলো ঘাতকের তালিকায়। তার মানে ঘাতক তৈরি করছে আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা? সমাজ যদি ব্যাপারটিতে বিশেষভাবে নজর দিতো তবে একজন মায়ের এমন অবস্থা হতো না। একটি পরিবার মাকে হারাতো না। পরিবারটির অনেকও ক্ষতি হয়ে গেল। কিন্তু এই ক্ষতির হাত থেকে পরিবারটিকে রক্ষা করতে কি পারতেন না সমাজ শাসকগণ? অবশ্যই পারতেন, কিন্তু তাদের দায়সারা ভাবের জন্য সবটাই ওলট-পালট হয়ে গেল। সাদা চোখে দেখলে, আবার খাদিজা বেগম-এর মৃত্যুদণ্ডও হয়ে যেতে পারে নয়তো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড! পরিবারটি কি ভীষণভাবে ক্ষতগ্রস্ত হলো না? এই ঘটনার দায় সমাজ এড়াতে পারে না। আরেকজন মায়ের কথা বলি। চাঁপা রানী ভৌমিকের কথা মনে আছে হয়তো অনেকের। ফরিদপুরের সেই মা, মনে পড়ে? যমজ দুই আত্মজাকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদে জানিয়েছিলেন মা। পরিনামে তার প্রাণ কেড়ে নেয় উত্ত্যক্তকারীরা। ২৬ অক্টোবর, ২০১০। মূল উত্ত্যক্তকারী রনি ও তার দুই সহযোগী মোটর সাইকেল চালিয়ে পেছন দিক থেকে চাঁপা রানী ভৌমিককে ধাক্কা দেয়। তিনি রাস্তায় ছিটকে পড়ে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান। তাত্ক্ষণিক তাকে মধুখালী উপজেলা কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে সেখানে অবস্থার অবনতি হতে থাকলে তাকে সেখান থেকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়ার পথে সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে চাঁপা রানী ভৌমিক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সেই সময়ের এমন আরেকটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছিল। মোটর সাইকেলে পিষ্ট করে যেভাবে চাঁপা রানীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল ঘাতকেরা, ঠিক তেমনি একটি ঘটনা ঘটেছিল এরও আগে। নাটোরের বাগাতিপাড়ার লোকমানপুর কলেজ-এর শিক্ষক ছিলেন মিজানুর রহমান। তার ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার (ইভটিজিং) প্রতিবাদ করায় ২০১০ সালের ১২ অক্টোবর হামলা চালানো হয় তার ওপর। বখাটেদের মোটর সাইকেলের আঘাতে গুরুতর আহত হন। প্রথমে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং শেষে সেই বছরের ১৪ অক্টোবর রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ)-তে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে তিনি সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিত্সাধীন ছিলেন। কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্রের সাহায্যে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল শিক্ষক মিজানুর রহমানকে। ২৩ অক্টোবর রাতে টানা ১১ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর শিক্ষক মিজানুর রহমানের জীবনাবসান ঘটে। পরবর্তীতে মিজানুর রহমান ও চাঁপা রানী ভৌমিকের হত্যাকাণ্ডকে সাধারণ দুইটি দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেবার অভিযোগ উঠেছিল। বিচারের অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলো কি আদৌতেও বিচার পাবে? শিক্ষক মিজানুর রহমানের একমাত্র কন্যা নুসাইবা রহমান মমো। মমোর বাবা যখন মারা যান তখন তার বয়স মাত্র চার বছর। মেয়েটি তখনো বুঝেই উঠতে পারেনি, তার বাবার আর নেই। আজ হয়তো বোঝে, আজ নিজে নিজে কাঁদে। কিন্তু এটি নির্মম সত্য, তার বাবা আর কোনদিন ফিরবে না। না ফেরার দেশে যারা যায়, তারা আর ফেরে না। যার কাছের স্বজন হারিয়ে যায়, সেই জানে কতখানি ভারি সেই বেদনাভার। আমরা কি জানি? আমরা কি বুঝি? হ্যাঁ, তবুও কিছুটা বুঝি; মানুষ বলে বুঝি। সবটুকু নয় যদিও, তবুও কিছুটা তো বুঝি। এই মানবজীবন মায়ায় কাটে, মায়ার টানে ভাসে। মায়ায় বাঁচে, মায়ায় মরে; মায়ায় খেয়া ভাসে। হ্যাঁ, মায়া। অদ্ভুত এক অনুভূতি। এই মায়ার টান ছিন্ন করেই মানুষ না ফেরার দেশে চলে যায়; চলে যেতে হয়। শিক্ষক মিজানুর রহমান যে শিক্ষার্থীকে ইভটিজিং করায় প্রতিবাদ করেছিলেন, যে শিক্ষার্থীর কারণে তিনি বখাটেদের হাতে নিহত হয়েছেন এবং যে শিক্ষার্থীর কারণে তার কন্যা আজ পিতৃহারা সেই শিক্ষার্থীর নাম ‘ববিতা’। ববিতা আজ আর নেই। সেও না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছে। নিজ ইচ্ছায় সে স্বেচ্ছামৃত্যুকে বেছে নিয়েছে। ২০১৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর, প্রেমিকের অন্যত্র বিয়ে করার বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে বিষপানের পর হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। মৃত্যুকালীন সময়ে ববিতা রাজশাহী বরেন্দ্র কলেজে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। ববিতার জন্য আমার আক্ষেপ হয়। শিক্ষক মিজানুর রহমান স্যার এবং তার পরিবারের জন্য আমার কষ্ট হয়। ববিতা কত বোকা, কত আবেগপ্রবণ। নিজের জীবনের গুরুত্ব সে অনুধাবন করতে পারেনি। লেখক :সাহিত্যকর্মী preetiraha@ymail.com