মনস্তত্ত্ব

প্রেম-অপ্রেম আর মায়ার ছলনা

‘এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না—শুধু সুখ চলে যায়, এমনি মায়ার ছলনা।’ রবীন্দ্রনাথের গানটি নতুন করে মনে পড়ে যায় নিখোঁজ হওয়া মালয়েশীয় বিমানের প্রধান পাইলটের প্রেম-বিরহের সংবাদ পড়ে। গত ৮ মার্চ যখন বিমানের কম্যান্ডার পাইলট জাহারি আহমেদ শাহ বিমানটি নিয়ে আকাশে উড়েছিলেন, তার একদিন আগেই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তার স্ত্রী বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। এ কথা জানান, জাহারিরই এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অন্য এক নারীর সঙ্গে জাহারির সম্পর্ককে কেন্দ্র করে স্ত্রীর সঙ্গে নাকি মনোমালিন্য চলছিল বেশ কিছু দিন ধরেই। তবু তার বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়াটা মন থেকে মেনে নিতে পারেননি জাহারি। জাহারির বন্ধু জানাচ্ছেন, মানসিকভাবে বেশ ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। বিপর্যস্ত মন নিয়েই নাকি সেদিন বিমান নিয়ে উড়ে যান আকাশে। এমএইচ ৩৭০ হারিয়ে যাওয়ার পরে তদন্তের গতিপ্রকৃতি এখন আবর্তিত হচ্ছে মূলত জাহারিকে ঘিরেই। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জাহারির দাম্পত্য সমস্যা। জানা গিয়েছে, ককপিটে বসার কিছু আগে এক নারী তাকে ফোন করেছিলেন। কে সেই নারী? স্ত্রী নাকি বান্ধুবী? কী কথা হয়েছিল দু’জনের? এইসব প্রশ্ন নিয়ে ধোঁয়াশার পাশাপাশি সন্দেহ ছড়াচ্ছে জাহারির মানসিক সুস্থতা নিয়েও। জাহারির বন্ধুই বলছেন, মনের দিক থেকে জাহারি সুস্থ ছিলেন না। নইলে কেন তিনি আকাশে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন বিশ্বের সঙ্গে? তার উদ্দেশ্য কি ছিল আত্মহনন? ভয়ঙ্কর শোনালেও অসম্ভব নয়। প্রেম যেকোনো বয়সেই আসতে পারে। বেলা-অবেলা মানে না। আর প্রেমের ঘোরে মানুষ পারে না এমন কোনো কাজ নেই এ জগতে। প্রেমের প্রভাব মানুষের মস্তিষ্কে তথা শরীরে কী বিচিত্র সব প্রভাব ফেলে তা জেনে অবাক হতে হয়। মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণায় জানা যায়—প্রেম বা ভালবাসার তিন পর্যায় রয়েছে-কামনা, ভালোলাগা এবং আনুগত্য। কামনার পর্যায়টা সর্বপ্রথম এবং এতে শরীরের ভেতরে রীতিমত হরমোনের বন্যা বয়ে যায়। অ্যাড্রেনালিন এবং নরপিনেফ্রিন এর প্রভাবে হূিপণ্ডের গতি বেড়ে যায়, হাতের তালু ঘামতে থাকে। এর পাশাপাশি ডোপামিন তৈরি করে উচ্ছ্বাসের অনুভূতি। অনেকটা ড্রাগ নেবার মতোই সে অনুভূতি। প্রেম কাজ করে পেইনকিলারের মতো। আকর্ষণীয় একটি মুখ দেখলে নাকি শারীরিক ব্যথা কমে যায়। মস্তিষ্কের যে অংশে মরফিনের মতো পেইনকিলারগুলো কাজ করে, ঠিক সেই অংশেই এই অনুভূতিটিও কার্যকর হয়, ফলে শরীরের ব্যথা কমে যায়। আর ভালোবাসার মানুষটির প্রতি যেহেতু আকর্ষণ বেশি থাকে, তাই তার প্রভাবেই শরীরের ব্যথাও কমে যায় অনেকখানি। এর সঙ্গে বেড়ে যায় মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল। প্রেমে পড়লে মস্তিষ্কের ‘প্লেজার সেন্টার’ বা সুখ-কেন্দ্রের মাঝে প্রচুর পরিমাণে রক্ত সরবরাহ হয়। আর এই ঘটনাটি সাধারণত ঘটে প্রেমের দ্বিতীয় পর্যায় ‘ভালোলাগা’তে, যখন দুইজন একে অপরের সাথে সম্পর্ক দীর্ঘ করার কথা ভাবতে শুরু করেন। সমপ্রতি জার্মানির গবেষকেরা জানিয়েছেন, মানুষের আকর্ষণের পেছনে রয়েছে অক্সিটোসিন হরমোন। ভালোলাগা বা ভালোবাসার কথার সময় বাইরের সৌন্দর্য দেখার চেয়ে ছেলেদের মধ্যে কাজ করে হরমোনের নিঃসরণ। ছেলেদের চোখে মেয়েদের সুন্দর দেখানোর জন্য দায়ী এ হরমোনটির নাম ‘অক্সিটোসিন’। আর শুধু প্রেমের সম্পর্ক তৈরিতে নয়, সম্পর্কে ভাঙন বা বিচ্ছেদের ঘটনার পেছনেও এই হরমোনটি রয়েছে বলে মনে করেন গবেষকেরা। যাদের সম্পর্ক ভেঙে যায়, তাদের কষ্ট বহু গুণ বেড়ে যায়। এর নেপথ্য কারণ হিসেবে মার্কিন বিজ্ঞানীরা বলছেন, অক্সিটোসিন নামের একটি হরমোনই এমন দুঃখের অনুভূতির জন্য দায়ী। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ফেইনবার্গ স্কুল অব মেডিসিনের গবেষকরা বলেন, কোনো কষ্টের অনুভূতি বা নেতিবাচক সামাজিক অভিজ্ঞতার ফলে তৈরি ভয় ও উদ্বেগের সংবেদনশীলতাকে বাড়িয়ে দেয়ার পেছনে অক্সিটোসিনের ভূমিকা রয়েছে। প্রেম, ভালোবাসা, সুখ, শান্তি—এসবের কোনো আকার, আয়তন, রঙ নেই? তাই এগুলোর অনুভূতি আমাদের প্রত্যেকের কাছে ভিন্ন? বড়ই আপেক্ষিক? বারো থেকে বিরাশি যেকোনা বয়সে এসেই মানুষ প্রেমের খুনসুঁটি, অভিমান, আকর্ষণকে উপভোগ করেন। গবেষকরা অন্তত তাই মনে করেন। প্রেম নাকি স্বর্গ থেকে আসে! কিন্তু সেটা একই সঙ্গে স্বর্গ বা নরক বানিয়ে দিতে পারে কারও সাদামাঠা জীবনকে। সুখের লাগি প্রেম চায় মানুষ কিন্তু মায়ার ছলনায় সুখ পরিণত হতে পারে অসুখে। সেই অসুখেই কী বিধ্বস্ত হল মালয়েশিয়ার বিমান? লেখক : সাংবাদিক, শিক্ষক 19ad78@gmail.com