সিস্টিন চ্যাপেল
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০১৪, ২০:০২
চিত্রকলায় যাদের আগ্রহ আছে ফ্রেস্কো সম্পর্কে নিশ্চয় জানেন তারা। ফ্রেস্কো একধরনের চিত্র যা দেয়ালের উপর আঁকা হয়। অতীতে মূলত দু ধরনের ফ্রেস্কোর প্রচলন ছিল। কেউ কেউ শুকনো দেয়ালে ছবি আঁকতেন আবার কেউবা দেয়ালে আলাদা প্লাস্টারের প্রলেপ দিয়ে সেই ভেজা প্লাস্টারের উপর। আমাদের এ অঞ্চলে খ্রিস্টের জন্মের দু-তিন শ বছর আগের ফ্রেস্কো আবিষ্কৃত হয়েছে অজন্তার মূর্তির গায়ে। সেগুলো আছে সিস্টিন চ্যাপেলের গুহায়। লিখেছেন প্রাঞ্জল সেলিম
পুরোনো প্রস্তর যুগের ‘সিস্টিন চ্যাপেল’ হিসেবে খ্যাত স্পেনের আলতামিরা গুহা আবারও দর্শকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। ১৪ থেকে ২০ হাজার বছর আগের আলতামিরা গুহার লাল-কালো চিত্রমালা প্রাচীন গুহাচিত্রের অন্যতম সেরা নিদর্শন। বিপুল দর্শকের সমাগমে ঐতিহাসিক এই চিত্রমালা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রায় ১২ বছর ধরে এই গুহার দ্বার দর্শকদের জন্য বন্ধ ছিল। আলতামিরা গুহাকে ইউনেস্কো ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ ঘোষণার আরও আগে থেকেই বিজ্ঞানীদের পরামর্শে বেশ কয়েকবার এখানে দর্শকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। তবে, মানবসভ্যতা বিকাশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য এই প্রাচীন গুহা দেখতে সারা দুনিয়ার গবেষক-পর্যটকদের ভিড় বরাবরই ছিল। কিন্তু কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রবল আগ্রহ সত্ত্বেও আলতামিরা গুহা ঘুরে দেখার সুযোগ পাননি ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক বা মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ফিলিপ কালদেরনের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরাও।
১৯৭৭ সালে প্রথমবারের মতো দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ করে দেওয়ার আগে আলতামিরা গুহায় প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার দর্শক পা রাখতেন। কিন্তু বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, মানুষের শরীরের তাপ, শ্বাস-প্রশ্বাস থেকে নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং বাতাসের আর্দ্রতায় প্রায় ২০ হাজার বছরের পুরোনো এই গুহাচিত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় ২০০২ সালে প্রায় স্থায়ীভাবেই দর্শকদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয় আলতামিরা গুহা। একটি জাদুঘরে আলতামিরা গুহাচিত্রের অনুকৃতি রয়েছে। কিন্তু দুনিয়াবাসীকে প্রাচীন পূর্বপুরুষ ও নারীদের শিল্পসত্তার এই অমূল্য নিদর্শন দেখানোর জন্য বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা হয় ‘আলতামিরা জাদুঘর’। মূল গুহার খুব কাছেই গড়ে তোলা এই জাদুঘর আসলে আলতামিরা গুহার একটা প্রায় সমান আকৃতির ‘অনুকৃতি’। প্রায় একই রকম বিন্যাসে সেখানে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে গুহার দেয়াল আর ছাদে আঁকা মহিষের ছবিসহ অন্যান্য চিত্র। কিন্তু অনেক দর্শকই তৃপ্ত নন এই বিকল্প ব্যবস্থায়। মাত্র কয়েক শ ফুট দূরেই ‘আসল’ গুহাটা আছে আর তিনি একটা ‘নকল কিছু’ দেখছেন—এই অনুভূতি মেনে নিতে পারেন না অনেকেই। এদিকে, স্পেনের ক্যান্টাব্রিয়া অঞ্চলের স্থানীয় সরকারও দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটনের বিপুল রাজস্ব হারানো নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাই দফায় দফায় বিজ্ঞানী-প্রত্নতত্ত্ববিদ ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষজ্ঞ পরিষদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে আসছেন তারা।
বাইবেলে বর্ণিত সোলেমানের মন্দিরের আদলে তৈরি লাল ইটের চারকোনা সিস্টিন চ্যাপল সাধারণভাবে পোপের বাসস্থান হিসেবে পরিচিত। ইতালিতে জন্ম নেওয়া পোপ চতুর্থ সিক্সতাস (১৪১৪) যিনি পোপ দ্বিতীয় পলের মৃত্যুর পর ১৪৭১ সালে এ পদে আসীন হন (১৪৭১-৮৪) তার নামানুসারেই সিস্টিন চ্যাপলের নামকরণ। তার সময় থেকেই পোপদের আবাসন হিসেবে সিস্টিন চ্যাপল পাকাপাকি ব্যবহূত হয়ে আসছে। ইতালির সেরা সব চিত্রকরগণ সেসময় তাদের বাসস্থানকে সমৃদ্ধ করেছেন তাদের মেধা আর শ্রম দিয়ে। রেঁনেসা যুগের বিখ্যাত সব চিত্রকর আর ভাষ্করগণ বিশেষ করে রাফায়েল, বার্নিনি, বাত্তিচলি, মাইকেল এঞ্জেলোর সেরা কর্ম দিয়ে সাজানো এই সিস্টিন চ্যাপলের স্বর্ণযুগের শুরুটা করেছিলেন পোপ জুলিয়াস-২ যিনি ১৫০৩ সালে পোপের ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত একটানা ১০ বছর পোপ ছিলেন। পোপ জুলিয়াস-২ বিখ্যাত ছিলেন তার বিদেশ নীতি, বিশাল স্থাপনা তৈরির উত্সাহ দাতা এবং চিত্রকলার প্রতি আগ্রহের জন্য। তার মৃত্যুর পর পরবর্তী পোপ দশম লিও পূর্বধারা থেকে বিচ্যুত না হয়ে আরও কিছু স্থাপনা অলঙ্করণের কাজে লোক নিয়োজিত করেন। এর মাঝে সেইন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা অন্যতম। প্রতি বছর খ্রিস্ট ধর্মের মোট ৫০টি অনুষ্ঠানের মধ্যে ২৭টি অনুষ্ঠিত হয় এই সিস্টিন চ্যাপেলে, এছাড়া নতুন পোপকে বরণ অনুষ্ঠানের আয়োজনও এখানে হয়। ৮টি বৃহত্ অনুষ্ঠান যার মাঝে বড়দিন আর ইস্টারের অনুষ্ঠান অন্যতম অনুষ্ঠিত হয় সেইন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায়। সেইন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার একটু পেছনে ডানদিকে এই সিস্টিন চ্যাপল।
ইতিহাসের গল্প
রোমের আসার পরপরই রাফায়েল নামের এক কার্ডিনাল রোমান ওয়াইনের দেবতা বাক্কাসের মূর্তি বানানোর কাজ দেন, কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য অসম্ভব সুন্দর সেই কাজ শেষ পর্যন্ত কার্ডিনালের পছন্দ হয়নি (এটি এখন ফ্লোরেন্সের এক মিউজিয়ামে আছে)। ইতালিয়ানরা প্রথমে না চিনলেও রোমে অবস্থানরত ফ্রান্সের প্রতিনিধি এঞ্জেলোকে চিনতে ভুল করেননি মোটেই, তারই অনুরোধে এঞ্জেলো তৈরি করেন তার জীবনের সেরা দুটি কাজের একটি ‘পিতা’। একই থিমের উপর আরও অনেক মূর্তি পরবর্তীতে এঞ্জেলো তৈরি করলেও প্রথমটার ধারে কাছেও আসতে পারেনি সেসব। রোম থেকে এঞ্জেলো আবার ফিরে যান ফ্লোরেন্সে। ফ্লোরেন্স তখন স্বাধীন রাজ্য, আর এর স্বাধীনতার প্রতীক ‘ডেভিডের’ মূর্তি গড়ার দায়িত্ব পড়ে এঞ্জেলোর উপর। পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস ক্ষমতায়, খবর পাঠালেন এঞ্জেলোকে, তারই আমন্ত্রণে ১৫০৫ সালে এঞ্জেলো আবার ফিরে যান রোমে। ফিরে এসেই দায়িত্ব পান সিস্টিন চ্যাপলের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজের, পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয় তাকে। একটানা চল্লিশ বছর কাজ করেন তিনি এই সিস্টিন চ্যাপলকে ঘিরে।