রাজনীতির গতিধারা

দেশব্যাপী এখন উপজেলা নির্বাচন চলছে। উপজেলা নির্বাচন হচ্ছে কয়েক কিস্তিতে। চার কিস্তি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। উপজেলা নির্বাচনের পাশাপাশি দশম জাতীয় সংসদের অধিবেশনও চলছে। গত ২৯ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখে জাতীয় সংসদের অধিবেশনের মাধ্যমে দশম জাতীয় সংসদের কার্যক্রম শুরু হয়। বেগম রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দল হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে। এ বিরোধী দল চিরাচরিত বিরোধী দল বলতে যা বুঝায়, তা নয়। আমরা সবাই বিরোধী দল বলতে তুমুল হৈ চৈ, অশিষ্ট শব্দ চয়ন আর নিয়মিতভাবে ওয়াক আউট করার দৃশ্য দেখতে অভ্যস্ত। বর্তমান সংসদে এমনটি নেই। সরকারের বিরুদ্ধে একাট্টা, সমালোচনামুখর বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সংসদে এখন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজমান বটে। সংসদের বাইরেও দেশব্যাপী মোটামুটি একটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছিল। এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশটি এসেছিল উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। তবে চতুর্থ কিস্তিতে উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে অপেক্ষাকৃত বেশি গোলযোগ এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সুতরাং দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা বৃদ্ধির ফলে ‘শান্তিপূর্ণ’ পরিবেশটি এখন অনেকটা ম্রিয়মাণ। আগে সারাদেশে উপজেলা নির্বাচন হতো একসঙ্গে। এখন হয় কয়েক কিস্তিতে। একসঙ্গে সকল উপজেলায় নির্বাচন হওয়া আবার ভিন্ন ভিন্ন সময়ে হওয়ার মধ্যে সুবিধা-অসুবিধা দু’টোই আছে। একদিনে সব নির্বাচন হলে জয়-পরাজয় যা হোক, একদিনেই হয়ে গেলো। অপরদিকে, ভিন্ন ভিন্ন দিনে হলে জয়-পরাজয় নিয়ে নতুন নতুন কলা-কৌশল করার সুযোগ থাকে। চার কিস্তি মিলিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের তুলনায় বেশ এগিয়ে গেছে। এখানে ৩৮৬টি উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা ১৬৭টি উপজেলা পরিষদে এবং বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা ১৪৬টি উপজেলা পরিষদে জয়লাভ করে। সংসদের বাইরের বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ থেকে সরকারি দলের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার, ভোট কেন্দ্র দখল, ফলাফল পাল্টে দেয়া এবং বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে অহেতুক মামলা-হামলা করার অভিযোগ করা হচ্ছে। অপরদিকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করায় নসিহত করা হচ্ছে এবং দাবি করা হচ্ছে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার। আমরা বরং বলতে চাই, উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করায় রাজনীতিতে আপাতত একটি স্বস্তির সময় পার করছে। এরআগে বিগত ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের পক্ষে-বিপক্ষে রণপ্রস্ততি ছিল। শেষ পর্যন্ত অবশ্য জয় হয়েছিল সরকারি দল আওয়ামী লীগের। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নির্বাচন বর্জন বা প্রতিরোধ ফলদায়ক হয়নি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় দু’টি রাজনৈতিক দল। সময়, কালভেদে এ দু’টি দলের মধ্যে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে থাকার ক্ষেত্রে হেরফের হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী ঘুরে ফিরে এ দু’টি দল অধিকাংশ সময় ক্ষমতায় থেকেছে। এরশাদ এবং তার জাতীয় পার্টি রাজনৈতিক ময়দানে প্রভাবকের ভূমিকায় নেই। প্রথম কিস্তির উপজেলা নির্বাচনে মাত্র একটিতে জয়লাভ করে সংসদে বিরোধী দলের তকমাটি লজ্জায় ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। এখানে বরং জামায়াতের উত্থান হচ্ছে। বেশ কয়েকটি উপজেলায় জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা জয়লাভের মাধ্যমে ক্রমশ কোনঠাসা অবস্থা থেকে তারা বেড়িয়ে আসছে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছ থেকে যুদ্ধাপরাধ এবং জঙ্গিবাদের দায়ে জামায়াতকে যেখানে নিষিদ্ধ করার দাবি আসছে, সেখানে উপজেলা নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীদের জয়লাভ ভাবনার বিপরীতে নেতিবাচক বার্তা বহন করছে। জামায়াতের নব উত্থান মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি এবং প্রগতিশীল লোকজনের জন্য দু:খের সংবাদ। দেশের জন্যও তা অশনি সংকেত। উপজেলা নির্বাচনের দুই কিস্তির মধ্যে বিএনপি ভালো করেছিল। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের পরাজয় মেনে নেয়ার মানসিকতা ধরে রাখার ব্যাপারে সংশয় ছিল। দ্বিতীয় কিস্তির নির্বাচনে থেকেই কেন্দ্র দখলের প্রবণতা চোখে পড়েছে। চতুর্থ কিস্তিতে এসে এটা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব খবর সংবাদপত্রগুলোতেই বেড়িয়েছে। উপজেলা নির্বাচন স্থানীয় সরকার নির্বাচন হিসেবে খ্যাত। কাগজে কলমে এ নির্বাচন অরাজনৈতিক বা দলীয় নির্বাচন নয়। আসলে বাস্তবে কোনো নির্বাচনই অদলীয় নয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর পরই উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় দলটির জন্য অস্বস্তিদায়ক কিছু অপেক্ষা করছে বলে মনে হয়। সেটা যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সকল দলের অংশগ্রহণে মধ্যবর্তী নির্বাচন দেয়া তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকারও এ বিষয়টি অবগত। এ জন্য উপজেলা নির্বাচনের ফলাফলটি আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে ভাবিয়ে তুলছে। উপজেলা নির্বাচনে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সামরিক শাসক হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলেও রাজনীতির কালগর্ভে তিনি এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। উপজেলা নির্বাচনে এরশাদ দলীয় প্রার্থী নির্বাচন করেছেন বটে, তবে প্রার্থীরা সবাই খাবি খাচ্ছে। হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের চারিত্রিক এবং স্বভাবগত দৃঢ়তার অভাবে জাতীয় পার্টি ভেঙ্গে কয়েক টুকরা হয়েছে। দ্বিধা বিভক্ত জাতীয় পার্টির কোনো কোনো জায়গায় অল্পস্বল্প ভোটও রয়েছে। ফলে জাতীয় পার্টি এখন অনেকটাই আঞ্চলিক দলে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক ময়দানে গণমানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারার কারণে দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোও ভালো অবস্থানে নেই। এসব দলগুলো কোনো রকমে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। প্রগতিশীল নেতাদের কেউ কেউ বুর্জোয়া দল হিসেবে পরিচিতি বিএনপি ও আওয়ামী লীগে মিশে গেছে। এসব দলের কোনো কোনো নেতা নিজ দলীয় প্রতীকও বিসর্জন দিয়ে নৌকা বা ধানের শীষ বরণ করেছেন। ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ তত্ত্বে আর বিশ্বাস না করে জাসদ (সিরাজ) এর শাহাজান সিরাজ বিএনপিতে ভিড়ে ছিলেন। রাজনীতির এই চালচিত্রে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে। রাজনীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে যেভাবেই হোক ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় গেলে টিকে থাকা। বিএনপি, জামায়াতকে শেখ হাসিনা মহাজোটে আনতে না পারলেও অবশিষ্ট প্রায় সবগুলো দলকে শেখ হাসিনা বশীভূত করতে পেরেছেন। এটি শেখ হাসিনার একটি অসাধারণ কৃতিত্ব হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ কিংবা পার্টির দলীয় চেয়ারম্যান হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকারের আজ্ঞাবহ। তারা সুবিধামতো সময়ে স্রোতের অনুকূলে গা ভাসিয়ে দিতে সিদ্ধহস্ত। আওয়ামী লীগের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিএনপি। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে জুন-জুলাই মাসে বিএনপি নতুন করে আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওই আন্দোলন কী আরেকটি ফ্লপ ছবি হবে, না কী সরকারের ভীত কাপিয়ে দেবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। অপরদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্টারি প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে জোর দেয়া হয়েছে। সেটি কীভাবে হবে, কবে হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। রাজনীতির এই অনিশ্চিত যাত্রা, কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তা সময়ই বলে দেবে। লেখক: গবেষক ও বিশ্লেষক email: asumanprju@gmail.com