বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

ফ্রান্সের একটি আর্থিক ও বীমা প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর উদীয়মান দশ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত করিয়াছে। ফ্রেঞ্চ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি ফর ফরেন ট্রেড বা সংক্ষেপে কোফেস নামক এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণ হইল, ব্রিকসভুক্ত (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) পাঁচটি দেশের অর্থনীতির গতি কমিতেছে। বর্তমানে তাহারা নানা সমস্যায় ভুগিতেছে। তাহারা পণ্য রপ্তানিতে ক্রমেই প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাইতেছে। তাহাছাড়া উত্পাদনের গতি বাড়াইবার জন্য সেইসব দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা তেমন বেশি নহে। ফলে এই পাঁচ দেশের অর্থনীতি গড়ে ৩.২ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করিবে। আর বাংলাদেশসহ উদীয়মান দশটি দেশ তাহার চাইতেও বেশি প্রবৃদ্ধি লাভ করিবে। এইভাবে এইসব দেশ ব্রিকসভুক্ত দেশের জায়গা দখলের পথে আগাইয়া যাইতেছে বলিয়া সংস্থাটি মনে করে। এই দশটি দেশকে আবার দুইভাগে বিভক্ত করা হইয়াছে। প্রথম ভাগে রহিয়াছে পেরু, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, কলম্বিয়া ও শ্রীলঙ্কা। কোফেস ব্রিকসের আদলে এই দেশগুলির নাম দিয়াছে ‘পিপিকস’। এইসব দেশ এখন সবচাইতে ভাল অবস্থানে আছে। দেশগুলির ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ তুলনামূলকভাবে ভাল থাকিবার কারণে তাহারা উন্নতি লাভ করিতেছে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় ভাগে আছে বাংলাদেশ, কেনিয়া, তানজানিয়া ও ইথিওপিয়া। এই দেশগুলি সম্পর্কে কোফেসের মন্তব্য হইল, এইসব দেশে ব্যবসা করা কঠিন বলিয়া উন্নতির ধারা ব্যাহত হইতে পারে। তাহার পরও তাহারা এইসব দেশের ব্যাপারে আগ্রহী ও আশাবাদী। কেননা ২০০১ সালে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলিতেও অনুরূপ সমস্যা ছিল যাহা একসময় তাহারা কাটাইয়া উঠিতে সক্ষম হয়। কোফেস নূতন দশ দেশের সম্ভাবনা বুঝাইতে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলির ২০০১ সালের অবস্থার সঙ্গে উদীয়মান দেশগুলির তুলনা করিয়াছে। সেই অনুযায়ী তাহারা পর্যবেক্ষণমূলক মতামত দিয়াছে। আমরা লক্ষ্য করিতেছি, বেশ কয়েক বত্সর ধরিয়া বিশেষত বাংলাদেশের ব্যাপারে আশাবাদী মানুষ ও মহলের সংখ্যা ক্রমেই বাড়িতেছে। আমরা জানি, এই ব্যাপারে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা সবচাইতে উচ্চকণ্ঠ। তাহার মতে, বাংলাদেশ এশিয়ার উদীয়মান টাইগার বা বাঘ। অনেকে মনে করেন, বিশ্ব অর্থনীতি এশিয়ামুখী হওয়ায় এবং বিশেষ করিয়া দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায় ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ চলিতে থাকায় এই সম্ভাবনা দেখা দিয়াছে আরও বেশি। বাংলাদেশ এই অঞ্চলের সন্নিহিত কোণে অবস্থান করিতেছে। তাই তাহার প্রভাব যুক্তিসংগত কারণেই এখানে পড়িবার কথা। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোটাই আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। অর্থনীতির চাকাকে সচল ও গতিশীল করিতে হইলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আগে জরুরি। আমরা এই ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিয়া এখনও কিছু বলিতে পারিতেছি না। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক্সটারনাল বা বহির্খাত তথা আমদানি-রপ্তানি, রেমিট্যান্স, বিদেশি সাহায্য ও বিনিয়োগের একটি গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি অর্থনৈতিক উদ্যোগ ভাল করিতেছে। এই কারণেই দীর্ঘদিন ধরিয়া বত্সরে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরিয়া রাখা সম্ভবপর হইয়াছে। ২০০৯ সালের পর বিশ্বমন্দার সময়েও বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল গতিশীল। যে কারণে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে চিহ্নিত করে ‘অমীমাংসিত বিস্ময়’ হিসাবে। উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে মার্কিন প্রতিষ্ঠান জেপি মরগান ভবিষ্যদ্বাণী করিয়া বলিয়াছিল, বাংলাদেশ হইবে পৃথিবীর আগামীর অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাঁচটি দেশের একটি। তখন এই পাঁচ দেশের নাম দেওয়া হইয়াছিল ‘ফ্রন্টিয়ার ফাইভ’। আমেরিকার আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস ব্রিকস সদস্যভুক্ত ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের পরে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হইবে এমন ১১টি দেশের একটি তালিকা প্রণয়ন করে। তাহার মধ্যেও ছিল বাংলাদেশের নাম। অর্থাত্ কোফেসের পর্যবেক্ষণ নূতন নহে। নূতন সংযোজন মাত্র। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাইতে হইলে আমাদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ফুলাইয়া-ফাঁপাইয়া দেখিবার প্রবণতা আছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে। আবার যেইসব বিদেশি সংস্থা ঋণ বা অনুদান দেয় তাহারাও তাহাদের সফলতা নিজ দেশের জনগণের সম্মুখে তুলিয়া ধরিতে গরীব দেশগুলির ব্যাপারে উদ্দেশ্যমূলক প্রশংসায় পঞ্চমুখ হইতে পারে। তাহার পরও বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। গতিশীল রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক নীতিমালার প্রয়োজনীয় সংস্কার, অবকাঠামো তৈরি, শিল্পখাতের বিকাশ, বিদ্যুত্ ও জ্বালানির সীমাবদ্ধতা দূরীকরণ, দুর্নীতি নিরসন ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারি।