চিকিত্সকদের ধর্মঘট ও রোগীর মৃত্যু
প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০১৪, ২২:০০
চিকিত্সকদের ধর্মঘটের কারণে উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহত্ চিকিত্সালয় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সা না পাইয়া এক রোগীর মৃত্যু হইয়াছে বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। এই রোগীটি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হইয়া গত বৃহস্পতিবার রাত্রে ঐ সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। তবে ঐদিন বিকাল চারটা হইতে চিকিত্সকদের ধর্মঘটের কারণে তিনি সুচিকিত্সা পান নাই বলিয়া জানাইয়াছেন মৃতের ভাই। তাহার চিকিত্সা ছিল নার্স ও ইন্টার্নি ডাক্তার নির্ভর। এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর জন্য এখন চিকিত্কদের ধর্মঘটকে দায়ী করা হইতেছে। এই ধর্মঘটের কারণে রাজশাহী জেলার সকল বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পাশাপাশি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এমনকি উপজেলা হাসপাতালগুলিতেও কর্মবিরতি পালন করেন চিকিত্সকরা। ফলে স্থানীয় ও দূর-দূরান্ত হইতে আগত রোগীদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে। গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জানা যায়, প্রশাসনের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে এই ধর্মঘট আজ রবিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত স্থগিত করা হইয়াছে। ইহার মধ্যে দাবি পূরণ না হইলে তাহারা আবারও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করিতে পারেন।
চিকিত্সকদের এই ধর্মঘট এবং তাহাদের অনুপস্থিতিতে রোগীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া কেহ কেহ বলিতেছেন যে, আন্দোলনের নামে চিকিত্সাসেবা বন্ধ করা যাইবে না। আমরা ইহার সহিত পুরাপুরি একমত পোষণ করিতে পারি না। কেননা চিকিত্সকরাও মানুষ এবং তাহারা এই সমাজের বাহিরের কেহ নহেন। রাজশাহীর চিকিত্সকদের এই যুগপত্ আন্দোলনের পশ্চাতে তাহাদের একজন সহকর্মীর গ্রেফতার ও জামিন নামঞ্জুর করিবার ঘটনা জড়িত রহিয়াছে। যাহাকে গ্রেফতার করা হইয়াছে তিনি রাজশাহী শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকের মালিক। একইসঙ্গে তিনি বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) রাজশাহী শাখা ও স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদের (স্বাচিপ) অন্যতম নেতা। গত ৯ ডিসেম্বর তাহার ব্যক্তিগত মালিকানায় পরিচালিত ক্লিনিকে রাজনৈতিক সহিংসতায় এক ব্যক্তির পা ভাঙিয়া গেলে তিনি এই ক্লিনিকে ভর্তি হইয়াছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অপারেশন করিতে গিয়া তাহার মৃত্যু হয়। এই অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর পর সংশ্লিষ্ট ডাক্তারসহ ঐ ক্লিনিকের মালিক ও ডাক্তারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলায় গ্রেফতারকৃত চিকিত্সক ও ক্লিনিক মালিকের জামিন না হইলে জেলার ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স এসোসিয়েশন অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের ডাক দেয়। বিএমএ ও স্বাচিপ তাহাতে সমর্থন দেয়। ইহাতে ধর্মঘটের প্রভাব সর্বত্র পড়িতে শুরু করে। পেশাগত মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় চিকিত্সকদের ডাকা এই ধর্মঘটকে অন্যায্য বলিবার কোন সুযোগ নাই। তাহারাও যেকোন কারণে সংক্ষুব্ধ হইতে পারেন।
সামপ্রতিককালে বাংলাদেশে চিকিত্সাধীন অবস্থায় কোন রোগীর মৃত্যু হইলে রোগীর স্বজনদের বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিবার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাইতেছে। ইহা উদ্বেগজনক। অনেক সময় সমস্যার গভীরে না গিয়াই নির্বিচারে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও কর্মরত ডাক্তার-নার্সদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটিতেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলি ইহার শিকার হইতেছে। ভুল চিকিত্সা বা চিকিত্সকদের অবহেলা বহুক্ষেত্রে একটি আপেক্ষিক বিষয়। ইহা ডাক্তার ভেদে ভিন্ন রূপ লাভ করিতে পারে। পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত এই ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিয়া কিছুই বলা যায় না। তাহার পরও যাহাতে বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি ও তাহার আত্মীয়-স্বজনরা ইহার প্রতিকার পান তার ব্যবস্থা থাকা উচিত। কিন্তু ভাঙ্চুর বা হামলার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করিয়া অন্যের চিকিত্সা পাইবার অধিকারকে ক্ষুণ্ন করা অনুচিত। মনে রাখা বাঞ্ছনীয় যে, দলবল নিয়া অন্যের ওপর হামলা চালানো যাইতেই পারে, তবে যাহারা হামলার শিকার হন তাহাদেরও তো দলবল বা সংগঠন থাকিতে পারে। রাজশাহীর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া যদি সারাদেশের চিকিত্সকগণ ধর্মঘটে যান, তখন দেশের চিকিত্সা ব্যবস্থার কী হাল হইবে তাহা সহজেই অনুমেয়। অতএব, সকল পক্ষকে সীমালংঘন হইতে বিরত থাকিতে হইবে। এরূপ ক্ষেত্রে প্রশাসনকেও বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টির পরিচয় দিতে হইবে। কাহারও বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উঠিলে নিয়মতান্ত্রিক উপায়েই ব্যবস্থা গ্রহণ কাম্য। এইক্ষেত্রে আইনের দুর্বলতা থাকিলে তাহা দূর করিতে হইবে। আর জনস্বাস্থ্য রক্ষায় যেকোন বিশৃঙ্খলা দ্রুত রোধ করিতে হইবে যে কোন উপায়ে।