[আ ন্ত র্জা তি ক ]

ক্রিমিয়া এবং ইউক্রেন নিয়ে দ্বন্দ্ব

ইউক্রেনের অখণ্ডতার ব্যাপারে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে তর্ক-বিতর্কের যেন শেষ নেই। শুরুটা একে অপরকে হুমকি দিয়ে হলেও গতকাল সর্বশেষ পুতিন-ওবামার ফোনালাপ থেকে জানা যায়, প্রেসিডেন্ট ওবামা এ ব্যাপারে রাশিয়াকে সুনির্দিষ্ট একটি লিখিত প্রস্তাব দেয়ার পরামর্শ দেন এবং ওবামা স্পষ্ট ভাষায় কূটনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টা চালাতে তার সংকল্পের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি আরও বলেন, রাশিয়া তাদের সৈন্য ফিরিয়ে নিলে এবং তারা আর ইউক্রেনের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব লংঘন না করলেই কেবল এটা সম্ভব। ফলে ক্রিমিয়া এবং ইউক্রেন নিয়ে যে দ্বন্দ্ব চলছে তার সমাধান সহসা হচ্ছে বলে মনে হয় না। রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যকার ঘটনাটি শুধু একটি সাধারণ ঘটনা নয়। বলা চলে এই ঘটনার একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। কিন্তু এটি এখন কেন এমন হলো সেটিই সবার জিজ্ঞাসা এবং এর পটভূমি কী সেটিও কিন্তু একটি ইন্টারেস্টিং ঘটনা। আসলে রাশিয়ার যে অ্যাকশন, যে ভূমিকা সেটা আমি মনে করি শুধু এই অঞ্চলেই নয়, বিশ্বশক্তি হিসাবে জানান দেয়ার জন্যই রাশিয়ার এই প্রয়াস। শীতল যুদ্ধ শেষ হবার পরে এই পৃথিবীতে একটি একক পরাশক্তি (One World Power)-এর জন্ম হয় এবং সেটি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গনের ফলে রাশিয়ার যে প্রতিপত্তি সেটি কিন্তু অনেকটা ম্লান হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ক্রিমিয়াতে তার হস্তক্ষেপের মাধ্যমে রাশিয়া নিজেকে আগের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। এখন পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে ইউক্রেন এবং ক্রিমিয়ার মধ্যকার ভাঙ্গনের জন্য দোষারোপ করছে। নিরপেক্ষভাবে বললে বলা যায়, রাশিয়া ক্রিমিয়াতে যে অ্যাকশন নিয়েছে সেটা কিন্তু এই পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব বিস্তারকেই প্রতিনিধিত্ব করছে। আমেরিকা, ইউরোপ জি-এইট থেকে রাশিয়াকে বহিষ্কার করেছে। তারা বলছে যে কোন একটি সার্বভৌম দেশের অংশকে একটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে রাশিয়া যে কাজটি করল, তা নৈতিক এবং রাজনৈতিক কোন প্রকারেই শুদ্ধ নয়। কিন্তু পশ্চিমারা ভুলে যায় তাদেরও এই ধরনের ঘটনার অনেক নজির রয়েছে। ইরাক, যুগোস্লোভিয়ায়, কসোভোতে পশ্চিমা বিশ্ব যা করেছে তা এই ধরনের ঘটনার চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। কসোভো, যুগোস্লোভিয়াতে টানা ২০-২২ দিন ধরে বম্বিং করা হয়েছে। কসোভোকে আলাদা করার জন্য পশ্চিমারা সব রকম প্রচেষ্টাই চালিয়েছে। কিন্তু রাশিয়া তেমনটি করেনি বা করতে চায়নি। অনেকেই মনে করেন যে, আমরা কী আবার নতুনভাবে শীতল যুদ্ধের আবির্ভাব দেখছি? আমার মনে হয় শীতল যুদ্ধ পুরোপুরিভাবে শেষ হয়ে যায়নি। সেটি অন্য নামে, ভিন্ন চেহারায় এতদিন পরিচালিত হতো। সিরিয়াতেও আমরা দেখেছি শীতল যুদ্ধের প্রতিফলন। শীতল যুদ্ধের সময়গুলোতে আন্তর্জাতিকভাবে আমরা কোন যুদ্ধ কিংবা বিগ্রহ দেখিনি। কিন্তু শীতল যুদ্ধ চলাকালীন সময়গুলোতে এই দুই পরাশক্তির মধ্যে Regional Conflict হয়েছে, এবং এর ফরে Annexation, Buffer state তৈরি করা এগুলো কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে হয়ে আসছে। হিটলারও কিন্তু এক সময় শক্তি প্রয়োগ করেছিলেন জার্মানী থেকে আসা মাইনরিটির সিকিউরিটির জন্য এবং আমরা সেই একই অজুহাত শুনতে পাচ্ছি রাশিয়ার মুখে। যে তারা ইউক্রেনকে ১৯৫৪ সালে ক্রিমিয়া দান করেছিলেন, সেখানে রাশিয়ান গোত্রের যে লোক আছে তাদের সুরক্ষার জন্য রাশিয়া সেখানে হস্তক্ষেপ করেছে। প্রথমে তে তা ছিল পরোক্ষ, এখন তারা সৈন্য দিয়ে ক্যাম্পগুলো দখল করে নিয়েছে। ক্রিমিয়া একটি অত্যন্ত জরুরি এবং জিওপলিটিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ এরিয়া। ইউক্রেন এবং ক্রিমিয়াতে যদি পশ্চিমা বিশ্বের একটা কর্তৃত্ব সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে রাশিয়ার যে ক্ষমতা সেটি কিন্তু কমে যাবে এবং এজন্য প্রায় দুশো বছর ধরে ক্রিমিয়া নিয়ে টানাপড়েন লেগেই আছে। প্রথমে এটি অটোমেয়ার সাথে ছিল। তারপর এটি চলে গেল রাশিয়ার হাতে। এটি নিয়ে যুদ্ধ হলো বৃটিশদের সাথে যেখানে বৃটিশরা পরাজয় বরণ করলো। সুতরাং অতীত থেকেই ক্রিমিয়ার দখল নিয়ে একটি টানাপড়েন ছিল এবং এর কারণ হলো ক্রিমিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান। যেহেতু ইউক্রেন Eastern Europe এবং রাশিয়ার মধ্যকার একটি লিঙ্ক, সুতরাং ইউক্রেনে একটা Friendly Government থাকুক সেটা রাশিয়া চাইবেই এবং কখনোই চাইবে না যে ইউক্রেনে একটি বৈরী সরকার থাকুক। ইউক্রেন সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনে রাশিয়ার পর দ্বিতীয় বৃহত্তম Republic ছিল। এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই ইউক্রেন জার্মানীর অনেক আঘাতও সামলেছে। কিন্তু বর্তমানে এই দ্বন্দ্বের কারণ হলো রাশিয়া যখন বলছে যে, যারা ভাষাগত, জাতিগত minority সংখ্যালঘু রয়েছে তাদেরকে আমরা সুরক্ষা প্রদানের জন্য এসেছি, কিন্তু ক্রিমিয়াতে তো আরো একটি জাতিগোষ্ঠী রয়েছে তাতার নামে, যারা মোট জনসংখ্যা ১০%, তারা যদি এখন স্বাধীনতা চায় তাহলে তারা কী করবে? এখন মূলকথা হলো, তারা যেটা বলছে পশ্চিমা বিশ্বের কোন অধিকার নেই রাশিয়ার এই কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার। ক্রিমিয়ার এই ঘটনা ভবিষ্যতের জন্য একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে কী না? যেখানে ক্রিমিয়ার সাধারণ জনগণ রাশিয়ার সাথে যুক্ত হতে আগ্রহী কিন্তু সংবিধান মোতাবেক তাদের এ ধরনের কোন ক্ষমতাই নেই। যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গনের পরে অসংখ্য ছোট জাতি রাষ্ট্র বিরাজ করছে যা স্বাধীন না হলেও একটি দেশের অংশ। যেমন কসোভো, আজারবাইজান, অসিডিয়া, নাজার্নো কারাডাইন ইত্যাদি। শীতল যুদ্ধের কোন সম্ভাবনা আপাতত নেই। তবে এ নিয়ে যে পশ্চিমা বিশ্ব ও রাশিয়ার মধ্যে টানাপড়েনের সূত্রপাত হবে, দর কষাকষি চলবে, ঘাত-প্রতিঘাত হবে যা হয়তো যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াবে না কিন্তু শীতল যুদ্ধের সূচনা করবে কী না সেটি বলতে আরো কিছুদিন হয়তো অপেক্ষা করতে হবে। রাশিয়ার এই ঘটনাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে নিয়ে ভবিষ্যতে যদি কোন দেশে এ ধরনের বিভক্তির সূত্রপাত হয় কী না সেই আশংকাই করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাশিয়া প্রথমে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করলেও বিভিন্নভাবে একে প্রভাবিত করেছে। ক্রিমিয়ার শতকরা ৮০% হলো রাশিয়ান জাতিসত্তার অধিকারী। সেখানে যা ঘটেছে তা হলো স্থানীয় জনগণ যে ভোটের মাধ্যমে রাশিয়ার সাথে যুক্ত হওয়ার কথা বলেছে, সেটিকে অবৈধ বলে ইতোমধ্যেই ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ একমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারই এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাখে। যেহেতু পাশ্চাত্যের দেশগুলো একে অবৈধ হিসেবে দেখছে তারা নিশ্চয়ই এর বিপক্ষে অবশ্যই কোন না কোন অবস্থান নেবে। বর্তমান পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলো পরিচালিত হচ্ছে Realist ভাবধারায়, Idealist ভাবধারায় নয়। নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষার যার যা করার প্রয়োজন সে তাই করবে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নীতির অনুসরণ করা হচ্ছে কী না সে ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা আসলে কেউই করে না। এক্ষেত্রে মূল ধারাটি হলো যদি আমেরিকা এ রকম কাজ করতে পারে তবে ক্ষমতা, প্রভাব থাকা সত্ত্বেও রাশিয়া কেন তা করবে না। পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে জি-এইট থেকে বহিষ্কার করেছে কিন্তু রাশিয়া তাকে খুব বেশি তোয়াক্কা করেনি। এখন চিন্তা-ভাবনা চলছে তার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের। কিন্তু রাশিয়াকে অর্থনৈতিক অবরোধ দেয়া হলে সেখানে যে সব পশ্চিমা বিনিয়োগ রয়েছে সেগুলো মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। যার প্রভাব পড়বে পশ্চিমা দেশগুলোতেও। যার ফলে শুধু মৌখিকভাবে বললেও কিন্তু এখনো পর্যন্ত রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়া, তারপর ক্রিমিয়া নিয়ে আমেরিকা-রাশিয়া দ্বন্দ্ব, এর ফলে বিশ্ব শান্তির উপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। এই প্রভাব বাংলাদেশের উপর প্রত্যক্ষভাবে না পড়লেও কিছুটা তো পড়বেই। ক্রিমিয়া ইস্যুতে বাংলাদেশ এখনো তার অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে কিছু বলেনি। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ আমেরিকার সাথে যুক্ত, ঐতিহাসিক দিক দিয়ে রাশিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সহায়ক রাষ্ট্র। তাই বাংলাদেশের উচিত হবে যেকোন পক্ষ নির্বাচনেই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এগোনো, কারণ শুধু অতীত বা বর্তমান নিয়ে চিন্তা করলেই চলবে না। চিন্তা করতে হবে ভবিষ্যত্ নিয়েও। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আদর্শ, নীতি এবং নৈতিকতার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে সরকারের উচিত কোন সিদ্ধান্তে আসা। তাড়াহুড়ো করাটা এক্ষেত্রে আত্মঘাতীও হতে পারে। ক্রিমিয়ার জনগণ তাদের নিজ ইচ্ছায় রাশিয়ার সাথে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে এবং সেই অনুযায়ী তারা তাদের ঘড়ির সময়ও বদলে নিয়েছে রাশিয়ার সময় অনুযায়ী। তাই বিচার বিশ্লেষণ করে বলা যায় বারবার হাত বদল হওয়া এই দেশটি এভাবে অন্তত একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে চলে আসবে এবং সহসাই আর হাত বদল হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। তবে ক্রিমিয়ার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোতেও যদি বিভক্তির সূত্রপাত ঘটে তবে তা ভবিষ্যতে রাষ্ট্র ব্যবস্থার উপর চরম হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ক্রিমিয়া রাশিয়ার সাথে যুক্ত হওয়া সোভিয়েত রাষ্ট্র গঠনের দিকে ইঙ্গিত না দিলেও ক্ষুদ্র একটি আশংকা থেকে যায়। যদিও ভবিষ্যতে পুরো সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠনের সম্ভাবনা নেই তবে আরো ক্ষুদ্র জাতিরাষ্ট্রগুলো ভবিষ্যতে ভাঙ্গন অথবা জোড়া লাগার সমূহ সম্ভাবনা রয়ে যায়। অনুলিখন: সাইদুর রহমান খান লেখক: আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক।