বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্প : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০১৪, ২১:৪২
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রাণী সম্পদ খাতের উপখাত হিসাবে পোল্ট্রি খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে দীর্ঘকাল থেকে। যা দেশের গ্রামীণ পরিবারের গৃহস্থালি কাজের আয়বর্ধনের একটি হাতিয়ার। কারণ ডিম এবং মাংস সরবরাহের মাধ্যমে দেশের প্রোটিন ঘাটতি পূরণে পোল্ট্রি খাতের পরিচিতি পুষ্টি বিজ্ঞানীদের কাছেও খুবি বেশি। এর মধ্যে এই শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ কর্মকাণ্ড কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। বাংলাদেশের জিডিপিতে এই উপখাতের অবদান ২.৬৭% এবং চলতি অর্থ বছরে এ খাতের প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির হার ৩.৯৮ %। বর্তমানে বাংলাদেশের পোল্ট্রির সংখ্যা ২২৮০.৩৫ লক্ষ যা বছরে ৩০০৫৩ লক্ষ ডিম উত্পাদন করে থাকে (উত্স :বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০১২, ঢাকা)।
বর্তমানে দেশে ডিম ও মাংসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অপ্রতুল যা ক্রমবর্ধমান মূল্য বৃদ্ধি থেকে অনুধাবন করা যায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর পোল্ট্রি খাতের অভিভাবক এবং বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় ও উপজেলাতে দাপ্তরিকভাবে একটি পোল্ট্রি খামার রয়েছে যারা উত্পাদন ও চিকিত্সাসহ সব ধরনের সম্প্রসারণের সুবিধা ব্যক্তি পর্যায়ে পোল্ট্রি খামারি তথা চাষীদেরকে অনেকাংশে দেয়া হয় এবং পোল্ট্রি খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে সরকারের প্রাণী সম্পদ নীতিমালা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার নীতিমালায় প্রাণী সম্পদ প্রচলিত খাতসমূহে ঋণ বিতরণের নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংক / আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে ব্যবস্থা নিতে বলছে, প্রথমত পোল্ট্রি খামার স্থাপন ও খাদ্য টিকা নির্দিষ্ট এলাকায় কেন্দ্রীভূত না রেখে ভৌগলিক অবস্থান নির্বিশেষে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ঋণের ব্যবস্থা গ্রহণ, দ্বিতীয়ত পোল্ট্রি বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস ও বিদ্যুত্ উত্পাদনের উত্সাহ প্রদানসহ ঋণের জোগান ইত্যাদি। বাংলাদেশের রায়ু মাটি জল তাপসহ সার্বিক পরিবেশ পোল্ট্রি চাষে উপযোগী বিধায় এ সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে উক্ত শিল্পকে অনেক দূরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সত্যি কিন্তু পাশাপাশি চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে যা প্রান্তিক চাষীদের বেলায় প্রযোজ্য । যেমন পোল্ট্রিতে দেশি-বিদেশি কোম্পানীর ব্যাপক বিনিয়োগ, একদিনের মুরগির বাচ্চার খাবার ও ওষুধের উচ্চমূল্য ঋণের বৈষম্য, বীমার অনুপস্থিতি, বার্ড ফ্লুর আক্রমণ, নির্দিষ্ট কোম্পানীর কাছ থেকেই মুরগির বাচ্চা ফিড ওষুধ কেনার বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি। অথচ বর্তমানে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান এই শিল্পে রয়েছে। হিসাব মতে একটি মুরগি গড়ে সর্বোচ্চ ৩০০টি ডিম দিতে পারে এবং ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) হিসাবে বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি হালি ডিম বিক্রি হয় ৩০ টাকায় আর প্রতিটি ডিমের মূল্য পরে ৭.৩০ টাকা যা উত্পাদন খরচের প্রায় কাছাকাছি। বাংলাদেশের ডিমের জন্য কোন প্রকার সংরক্ষণাগার নেই। যার ফলে এই সুবিধা থেকে খামারি বঞ্চিত হচ্ছে অথচ সারা ভারতে সরকারিভাবে ৬০০টি ডিম সংরক্ষণ নাগার রয়েছে।
একটি হিসাব মতে সারা দেশে প্রায় আড়াই কোটি ডিম এবং ২৬ লাখ কেজি মুরগি উত্পাদন হচ্ছে প্রতি মাসে যা আভ্যন্তরীণ চাহিদার কাছাকাছি হলেও এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষত পোল্ট্রি ফিডের মূল্য ও ওষুধসামগ্রীর অভাবে কিছু কিছু অঞ্চলের পোল্ট্রি খামারিরা বিশেষত ঢাকার উপকণ্ঠে নিজ উদ্যোগে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে যেমন গাজীপুরের ২২ খামারি নিজেদের খামারের প্রয়োজনীয় ফিড নিজেরাই উত্পাদন করছে। এতে প্রতি কেজি ফিডের খরচ পড়ছে ৩০ থেকে ৩৩ টাকায় মাত্র যা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্যই করা হচ্ছে মানসম্মতভাবে। এই সকল ব্যক্তি পর্যায়ের উদ্যোগ দেশের পোল্ট্রি উত্পাদনের নিবিড় অঞ্চলগুলোতেও গ্রহণ করা যেতে পারে কিন্তু সময় সময় এই স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগটিতে সরকারি নীতিমালা নেই যা খামারিদের বিপাকে ফেলে দেয় যেমন— ২০১১ সালে বার্ড ফ্লুর সংক্রামন দেখা দিলে তত্কালীন মত্স্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রী বীমা চালুর কথা ঘোষণা দিলেও তা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি যার ফলে এই শিল্পে দুর্দশা দেখা দিলে ক্ষুদ্র খামারি, বাচ্চা উত্পাদনকারী ও পোল্ট্রি ফিড বিক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই শিল্পে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান এবং কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হলেও এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু নীতিমালা থাকলেও প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর এ ব্যাপারে নীরব থাকে। এর পরও ব্যাংকাররা পোল্ট্রি শিল্পে ঋণ দিতে আগ্রহী নয় যদিও কৃষি ব্যাংক ও রাকাব এ ব্যাপারে বিভিন্ন শর্তে মাঝারি খামারিদের ঋণ দিয়ে থাকে। যার বেশির ভাগই শ্রেণি বিন্যাস ঋণ। এই সকল পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, শিল্পটি একটি প্রয়োজনীয় খাত হলেও সরকারি পর্যায়ে এর তেমন অগ্রাধিকার নেই।
তাই বেসরকারি খাতের উদ্যোগই আমাদের এখন ভরসা এবং যারা বর্তমানে এই উদ্যোগের সাথে জড়িত আছেন বা ভবিষ্যতে আসার চিন্তা-ভাবনা করছেন অনায়াসেই তারা এই শিল্পের কাজ সুন্দরভাবে ঘোচাতে পারেন কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদার পল্লী মুখী নীতিমালা বর্তমানে এই শিল্পের জন্য বড় শক্তি ও আশার আলো। তাই পূর্বের ন্যায় কৃষি ব্যাংক বা সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রাণী সম্পদ শাখা খুলে এই শিল্পের নিবিড় কার্যক্রম চালাতে পারে। তবে পোল্ট্রি শিল্পের ফিড আমদানি বা স্থানীয়ভাবে তৈরির জন্য যে কাঁচামাল বা শিল্প সহায়তার প্রয়োজন সরকারকে তা করতে হবে এবং আভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের জন্য মুরগির বাচ্চা বা ডিম যদি আমদানি করতে হয় তবে নিজস্ব খামারিদের স্বার্থের দিকে লক্ষ রেখে মূল্যের সমতা আনতে হবে যাতে খামারি বা আমদানিকারক উভয়ের স্বার্থের যেন রক্ষা হয়। দেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বৃহদাকার খামারগুলোতে মানসম্মত বাচ্চা উত্পাদন ও তার সরবরাহ ক্ষুদ্র খামারিদের অনেকাংশে উত্সাহিত করবে এবং সরকারের অগ্রাধিকার খাত হিসাবে পোল্ট্রিতে ভর্তুকি অবশ্যি পূর্বের ন্যায় অব্যাহত রাখবে যা বর্তমানে কৃষিবান্ধব সরকারের কাছে জাতীয় প্রত্যাশা ।
[ লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি ]