পানির সদ্ব্যবহার

ত্রুটিপূর্ণ পানি ব্যবস্থাপনার কারণে ঢাকা ওয়াসাকে বত্সরে গচ্চা দিতে হয় ১৫২ কোটি ৭০ লাখ টাকা মাত্র। ওয়াসার দায়িত্বশীল সূত্রের বরাত দিয়া পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত এক রিপোর্টে বলা হয়, দৈনিক ২২৫ লিটার পানি উত্তোলন করা হইলেও অপচয় হইয়া যায় ৫৭ লিটার। কোনো কোনো মহলের খামখেয়ালিপনা, কারিগরি ত্রুটি, অবৈধ সংযোগ ইত্যাদি কারণে বিপুল পরিমাণে পানি চলিয়া যাইতেছে ক্ষতির খাতায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রাহকগণও পানির অপচয় করিয়া থাকেন। কল ছাড়িয়া বন্ধ করিবার কথা ভুলিয়া যান অনেকেই। মোটকথা, পানি ব্যবহারে যতটা হিসাবি হওয়া উচিত, তাহা অনেকের মধ্যেই নাই। বিশ্বজুড়িয়া বিশুদ্ধ খাবার পানি যে ইহারই মধ্যে মহার্ঘ হইয়া উঠিয়াছে সেই খেয়ালও নাই। বাস্তবতা হইল, শহর কী গ্রাম, কমবেশি পানির দুর্ঘট এখন সবখানেই। বাংলাদেশে পানির সমস্যা ক্রমে তীব্র হইতে তীব্রতর হইতেছে। সমস্যাটি ইতিমধ্যে বহুমাত্রিক রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। দেশের ৪টি নদীপ্রণালির সবগুলি নদীই আজ কমবেশি সংকটাপন্ন। খালবিল ও হাওর-বাউড়ের অবস্থাও সঙ্গীন। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অনিবার্য অভিঘাতে বাড়িয়া চলিয়াছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। ফলে দেখা দিতে শুরু করিয়াছে লবণাক্ততার ক্রমসমপ্রসারমান সমস্যা। উপকূলীয় ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভুগর্ভস্থ পানির স্তরেও লবণের আধিক্য দেখা দিতে শুরু করিয়াছে বলিয়া কোনো কোনো গবেষণা রিপোর্টে উল্লেখ করা হইয়াছে। এমন কি ঢাকা ও ইহার পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহেও এহেন বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিয়াছে। পানির সমস্যা যে কেবল বাংলাদেশের তাহা অবশ্য নয়। বলিতে গেলে সমস্যাটি বিশ্বব্যাপী। বলা হইয়া থাকে যে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি কখনও বাঁধে তাহা হইলে উহা বাঁধিবে পানি লইয়া। বিশ্ব জুড়িয়া পানি সংকটের কারণ যতটা না প্রকৃতিগত, তাহার চাইতে অনেকবেশি মনুষ্য সৃষ্ট। ওয়ার্ল্ড ওয়াটার কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের ১ শত ১০ কোটি মানুষ আজ সুপেয় পানির অধিকার হইতে বঞ্চিত। পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে ৩৯ হাজার শিশু মারা যায় পানিঘটিত রোগে। ডায়রিয়ায় মারা যায় ১০ লাখ ৮০ হাজার মানুষ। বলাবাহুল্য, ডায়রিয়া রোগের প্রধান কারণ দূষিত পানি। মোট কথা পানির যে সমস্যা তাহার সমাধানের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তোলা। ইহার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ভাবে সকলের অংশগ্রহণে একটি পরিকল্পিত এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তোলার আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশে প্রতিবত্সর অঞ্চলভেদে ১১১০ মিলিলিটার হইতে শুরু করিয়া ৫৬৯০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হইয়া থাকে। ইহা মোটেও কম নহে। কিন্তু বিপুল এই বৃষ্টির পানির সামান্যই আমরা সদ্ব্যবহার করিতে পারি। সিংহভাগ পানিই নষ্ট হইয়া যায় , সংরক্ষণ করা হয় না। এমতাবস্থায় খাল ও বিল বাঁওড় খনন সংস্কার করা জরুরি। সেচ এবং গৃহস্থালি কাজে সারফেস ওয়াটারের ব্যবহার বাড়ান গেলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমিবে। ইহাতে মিঠা পানির সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়া আসা সম্ভব হইতে পারে বলিয়া অনেকেই মনে করেন। ইহার পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন নগর,মহানগর ও পৌর এলাকা সমূহের বাসিন্দাগণের পানি ব্যবহারে সচেতনতার পরিচয় দেওয়া একান্ত কর্তব্য। বিশুদ্ধ কিংবা পরিশোধনযোগ্য পানির ভান্ডার অফুরন্ত নহে। পানির ভূ উপরিস্থ এবং ভূ-গর্ভস্থ উভয় উেস সংকট দেখা দিতে শুরু করিয়াছে। কাজেই পানির অপচয় রোধ করিতে হইবে। সর্বত্র পানির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষের যেমন সচেতনতার প্রয়োজন রহিয়াছে, তেমনই দরকার ভাল ব্যবস্থাপনা।