কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট :যুগোপযোগী করিতে হইবে

এমন একটা সময় ছিল যখন টাইপরাইটিং (মুদ্রার লিখন) ও শর্টহ্যান্ড (সাঁটলিপি) না শিখিলে চাকুরীর ইঁদুর দৌড়ে পিছাইয়া পড়িতে হইত। ৬৫ বত্সর পূর্বের ‘আধুনিক’ যুগে তত্কালীন যুগোপযোগী দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠা করা হইয়াছিল ১৬ জেলায় ১৬টি কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট। কিন্তু সময় এখন এইরূপে পরিবর্তিত হইতেছে যে, প্রতি দশকে প্রযুক্তির বিকাশ ঘটিয়াছে জ্যামিতিক হারে। যেই কালে প্রোটোটাইপ ট্রানজিস্টর ছিল ভিনগ্রহ হইতে ভাসিয়া আসা শব্দগ্রাহকের মতো বিস্ময়কর যন্ত্র, সাদাকালো টেলিভিশন ছিল উচ্চমানের জাদুর বাক্স, চাঁদ ছিল রূপকথার চরকিকাটা বুড়ির দেশ—সেই কালেরই সিলেবাস লইয়াই কিনা এই মঙ্গলাভিযানের যুগে পড়ানো হইতেছে টাইপরাইটিং ও শর্টহ্যান্ড! যেই পাঠক্রম ও তাহার যন্ত্রপাতি জাদুঘরে চলিয়া গিয়াছে এক দশক পূর্বেই, তাহা কিনা আজও বহাল রহিয়াছে ওই ১৬টি কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটে! যেই অবকাঠামো রহিয়া যায় পুরানো প্রতিষ্ঠানের, ইহার নববিকাশ শুধু আবশ্যিক নহে, ইহার ব্যত্যয় পুরো শিক্ষাটাই হিতে-বিপরীত হইয়া যাইতে পারে। সুতরাং এক্ষণে যেই ছাত্র ও শিক্ষকের সংকট চলিতেছে এই প্রতিষ্ঠানসমূহে, তাহা শুধু স্বাভাবিক নহে, বরং বিস্ময় হইল— দুই-চারিখানা শিক্ষার্থী এখনও মেলে কি করিয়া? আরও বিস্ময় হইল— এখন দেশের কোথাও সাঁটলিপি ও মুদ্রার লিখন-এর ব্যবহার না থাকিলেও, ১৯৫৯ সালের চিন্তাভাবনার আদলে এই প্রতিষ্ঠানসমূহে অন্যান্য সাধারণ বিষয়ের সহিত মুদ্রার লিখন বিস্তারিত পড়ানো হয়, যাহা কিনা এখনও বাধ্যতামূলক! প্রযুক্তি এমনই আগ্রাসী ও নির্মম যে, তাহা পুরানো যেকোনো কিছু নালা তৈরি করিয়া ভাসাইয়া লইয়া যায় জঞ্জালের মতো। এককালের লেটার-প্রেস এক্ষণে জাদুঘরের বস্তু। সেলুলয়েড ফিল্মশিল্পের আজ মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়াছে। এককালের বিস্ময়কর ‘টেলিগ্রাফ’ আজ ইতিহাসের ‘বিলুপ্ত’ অধ্যায়ে প্রবেশ করিয়াছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি আসিয়া অ্যানালগ সমস্ত ডিভাইসকেই খোলনলচে বদলাইয়া দিয়াছে। ইহা সভ্যতার বিকাশ ও নির্মাণেরই অপরিহার্য পরিক্রমা। সেই কারণে ডাকঘর তাহাদের এককালের অতি জনপ্রিয় ও অপরিহার্য বিবিধ সেবা নূতন করিয়া বিন্যস্ত করিতে বাধ্য হইয়াছে। যেইসকল প্রতিষ্ঠানের সমৃদ্ধ অবকাঠামো ও লোকবল রহিয়াছে, তাহারা যত তাড়াতাড়ি নিজেদের নূতন প্রযুক্তির সহিত আত্তীকরণ ঘটাইতে পারেন, তাহাদের সঙ্কটও তত দ্রুত দূরীভূত হয়। ইহাতে তাহারা যে শুধু বিলুপ্ত হইবার বিপদাপন্ন তালিকা হইতে নিজেদের অপনয়নই করেন না, লাভজনক ও টেকসইও হইয়া ওঠেন ভবিষ্যতে টিকিয়া থাকিতে। দেশের ১৬ জেলায় যে ১৬টি কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট রহিয়াছে, তাহাদের রহিয়াছে মহামূল্যবান অবকাঠামো। এই অবকাঠামোই তাহাদের সবচেয়ে বড় পুঁজি। ইহাকে কাজে লাগাইতে হইলে যুগোপযোগী হইয়া উঠিতেই হইবে। সিলেবাসের আধুনিকায়নসহ নূতন প্রযুক্তিশিক্ষার তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক বিষয়গুলি সন্নিবিষ্ট করা খুব কঠিন পদক্ষেপ নহে। এই বাস্তবোচিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করিলে প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি ঘটাও অসম্ভব নহে। প্রবাদের কথায়, অতিকায় হস্তী লোপ পাইলেও ক্ষুুদ্র আরশোলা বহাল তবিয়তে টিকিয়া যায়। তাহার কারণ ওই যুগের সহিত নিজেকে মানাইয়া লওয়া।