ভেজাল খাদ্য এবং আমাদের ভাবনা
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০১৪, ২২:০০
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পণ্যের মান, গুণাগুণ, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, সেবার মান ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে ১৯৮৭ সাল থেকে সনদ প্রদান শুরু করলেও বর্তমানে ৬টি ক্যাটাগরীতে ISO সনদ প্রদান করে আসছে। পাশাপাশি প্রত্যেক দেশের ন্যায় বাংলাদেশের পণ্যের মান, পরিমাণ, ওজন, গুণাগুণ, রং, দাম ইত্যাদির গুণগত মান পরীক্ষার জন্য BSTI (Bangladesh Standards and Testing Institution) নামে একটি সরকারি সংস্থা রয়েছে। ১৯৮৫ সালে সরকারের এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড ইনস্টিটিউশন ও সেন্ট্রাল টেস্টেং ল্যাভরেটরিজ নামক ২টি প্রতিষ্ঠানকে একত্রিভূত করে এই প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল শিল্প, খাদ্য ও রাসায়নিক পণ্যের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মানের সাথে মান রেখে দেশে একটি জাতীয় মান তৈরি ও নিশ্চিত করা। অর্থাত্ পণ্যের মান, পরিমাণ, গুণাগুণ, যথার্থতা ইত্যাদি দেখাশুনার দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু তারপরও আমরা কতটুকু গুণগত মান সম্পূর্ণ পণ্য পেয়ে থাকি তা দেখার বিষয়। কারণ আইনের তোয়াক্কা না করে বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটিয়ে অতি নিম্নমানের পণ্য যে উত্পাদন হচ্ছে তা আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি। বিভিন্ন ফ্লেভারের সাহায্যে স্বাদ, রং ও গন্ধ মিল রেখে যে সব পণ্য প্রস্তুত করা হয় তা কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত তা নিয়ে ভাববার বিষয়। এটা ছাড়াও ফরমালিন শব্দটির সাথে আমরা খুবই পরিচিত। সম্প্রতি যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের তার এক বক্তব্যে বলেছিলেন, দুর্নীতিযুক্ত রাজনীতি ফরমালিনের মত ক্ষতিকর। এই কথা থেকে আমরা আবারও উপলব্ধি করতে পারলাম, ফরমালিন একটি ক্ষতিকর পদার্থ। ডাক্তারদের ভাষ্য অনুযায়ী যেই ফরমালিন দিয়ে মানুষের মৃত দেহকে প্রক্রিয়াজাত করে রাখা হয় সেই ফরমালিন এখন খাদ্যে মিশানো হচ্ছে। উদ্দেশ্য যেন খাদ্যদ্রব্য না পচে, রং ঠিক রাখা বা কাঁচা ফল কম সময়ে পাকিয়ে পেলা। ইদানিং এই শব্দকে একটু উন্নত করে প্রিজারভেটিব বলে ডাকতেও শুনা যায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছু কিছু খুচরা ব্যবসায়ী বলতে শুনেছি, কম পরিমাণে ফরমালিন মেশালে তেমন ক্ষতি হয় না। কিন্তু ফরমালিনযুক্ত খাবার খেয়ে একটি জাতী যে ধীরে ধীরে মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তা কয়জনে বা ভাবেন। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম বলে তারা এর প্রভাবে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। ফরমালিনযুক্ত বা ভেজাল খাবারের ফলে হার্ট, কিডনী, ফুড ফয়জনিন, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস এবং ক্যান্সারের মত মারাত্মক রোগে শরীরে বাসা বানতে পারে। যা ধীরে ধীরে মানুষকে আক্রান্ত করে। সম্প্রতি এক মেডিক্যাল রিপোর্টে বলা হয়েছে, কিডনীর ৭০ থেকে ৮০ ভাগ নষ্ট হওয়ার আগে তার উপসর্গ পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় না। অর্থাত্ এসব ভেজাল খাদ্য আস্তে আস্তে মানুষের শরীরকে অকেজো করে তোলে। যা সাথে সাথে প্রভাব বিস্তার না করলেও আস্তে আস্তে এই দেশের ১৪ কোটি মানুষের দুচিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার ঢাকা শহরে ইদানিং কয়েকটি কাঁচা বাজারকে ফরমালিন মুক্ত ঘোষণা করে তাদের আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু আমরা একযোগে সারা দেশকে ফরমালিন মুক্ত ঘোষণা করতে পারবো না কেন? যারা খাদ্যে ফরমালিন বা ভেজাল মেশায় তারা কি জ্বিন না পরী। যে তাদেরকে ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না। আর কিছু দিন পর আমরা আম, কাঁঠাল, লিচু ইত্যাদির মত অতি সুস্বাদু ফল পেতে যাচ্ছি। তাই শুরু থেকেই এসব ফলে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর মেডিসিন দিয়ে স্প্রে করা হয় এবং কাঁচা অবস্থায় বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পদার্থ দিয়ে অপরিপক্ব অবস্থায় পাকানোর চেষ্টা করা হয়। অবশেষে বাজারে আসার আগে ফরমারিন যুক্ত পণ্য হিসাবে বাজারে আর্ভিভূূূূূত হয়। ইদানিং মাছ মারার ক্ষেত্রে ডেনিটল ১০ ইসি ও গ্যাস ট্যাবলেট (অ্যালুমিনিয়াম ফসপাইড) নামক এমন একটি পদার্থ ব্যবহার করা হয় যা পোকামাকড় দমনে এবং ক্ষেতে ব্যবহার করার নিয়ম থাকলেও তা দিয়ে মাছ মেরে বাজারে বিক্রি করা হয়। যা একেবারে স্বাস্থ্যসম্মত নয়। তাই আমাদের এখনই উচিত আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের গুণগত মান উন্নয়নের জন্য শিল্প প্রতিষ্ঠানকে ISO সনদ নিতে উত্সাহিত করা, BSTI কে আরো শক্তিশালী করা, বিভিন্ন পণ্যের উত্পাদন স্থলে তদারকির ব্যবস্থা করা, ফরমালিন আমদানির উপর কড়াকড়ি আরোপ করা, কাঁচা ফলমূলসমূহ কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় উত্পাদিত হয় বিধায় ঐসব উত্পাদন স্থলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীির নজরদারী বাড়িয়ে দেয়া, কাঁচামালের বাজারসমূহে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করা, শিল্প মালিক, উত্পাদনকারী, মৌসুমী ফলের ব্যবসায়ীদেরকে দেশের স্বার্থে জনগণের কল্যাণের কথা মাথায় রেখে ব্যবসা করা। কারণ এই দেশের বেশির ভাগ সীমিত আয়ের মানুষ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে এই বিষ কিনে তার প্রতারিত হচ্ছে। সাথে আথে প্রমাণ করার সুয়োগ নেই বিধায় প্রতিবাদের সুয়োগ তাদের নেই। তাই যে ফরমালিন আস্তে আস্তে জাতীকে স্বাস্থ্যহীন জাতীতে পরিণত করবে তা থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে হবে। তাই আমরা ফরমালিনকে না বলি, ফরমালিন যুক্ত পণ্য বর্জন করি। তাই লাখ কণ্ঠে একই আওয়াজ হোক ফরমালিনমুক্ত বাংলাদেশ।
লেখক : প্রভাষক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, নিকুঞ্জ মডেল কলেজ, খিলক্ষেত, ঢাকা