ইতিহাস :বিতর্ক ও বাস্তবতা

দুটি বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন আবার সরগরম হয়ে উঠেছে, সংসদেও উত্তপ্ত কথা হয়েছে। একটি হলো: প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানের নাম উচ্চারণ, আর দ্বিতীয়টি হলো: সরকার পতনের আন্দোলন এমনই কঠোর হবে যে গিনেজ বুকে নাম উঠবে। দুটি বিষয়েরই অবতারণা করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি তাঁর বক্তব্যে বিষয় দুটি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন এটাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। উচ্চারণ যত সহজ-সরল-সাবলীল হোক না কেন, তিনি হয়তো এর মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারেননি—তিনি কী বলছেন, কেনইবা বলছেন। প্রথম রাষ্ট্রপতি বিষয়ে বক্তব্য প্রদানের পর বিএনপির ওয়েবসাইটটি অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়, কারণ সেখানেও এ বিষয়ে বর্ণনা ছিল। ওয়েবসাইটটি বন্ধ করার মধ্য দিয়েও প্রমাণিত হয় তারা ভুল লিখেছিলেন, এখন জনরোষে পড়ে শোধরানোর চেষ্টা করছেন। অপরদিকে, লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা গানের বিশ্বরেকর্ড ও অসম্ভব জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে বেগম জিয়া তাঁদের আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত রেকর্ড গড়ার দুঃস্বপ্ন দেখাতে সচেষ্ট। এরকম অলীক-উদ্ভট চিন্তা যাদের মাথায় থাকে তাদেরকে দিয়ে আর যাই হোক, রাজনীতি করা সাজে না। রাজনীতির নামে দেশের মানুষকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলতে পারে না। মানুষকে বিভ্রান্ত করার অধিকার কোন রাজনীতিবিদের নেই। কেউ কেউ বলছেন বেগম জিয়ার দুঃখ প্রকাশ করা উচিত, কেউ কেউ বলছেন রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা হওয়া উচিত। শুধু দুঃখ প্রকাশ করে অথবা মামলা করে কি ইতিহাস বিকৃত করার দায় এড়ানো যায়? প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানের নাম উচ্চারণ করায় পুরো জাতি বিস্মিত, হতভম্ব। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনকেই ম্লান করে দেয়া হয়েছে এই একটি উচ্চারণের মাধ্যমে। বিএনপি বহু বছর ধরে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবেও প্রচার করছে। যদি তিনি ঘোষকই হন তাহলে ১৯৭১ সাল থেকে কেন নয়? ‘আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করছি’— এরকম একটি বাক্য থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় ঘোষণাটি বঙ্গবন্ধুর যা পাঠ করেন মেজর জিয়া। সেখানেও কথা আছে, স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ, কিন্তু মেজর জিয়া ঘোষণা পাঠ করেন ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে। আরও কথা আছে, মেজর জিয়া কখনো বলেননি তিনি স্বাধীনতার ঘোষক, রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়েও আমরা এমন কথা শুনিনি। একের পর এক নতুন প্রজন্ম আসছে আর তারা বিভ্রান্ত হচ্ছে, দুটি ভাগে ভাগ হচ্ছে। এর দায় কে নেবে? বিএনপির মতো একটি শক্তিশালী দলের কাছ থেকে আমরা এখন আর মিথ্যাচার আশা করি না। জিয়াউর রহমান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, না হলে বীর উত্তম খেতাব পেতেন না। শুধু সেক্টর কমাণ্ডারই নয়, তাঁর নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে ‘জেড ফোর্স’ নামে তিন ফোর্সের একটি ফোর্সের প্রধানও বটে। ১১ জনের একজন, ৩ জনেরও একজন। সুতরাং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন মহান সৈনিক তিনি। এই সত্যটুকু লালন করে চললেও বিএনপির জন্য অনেক মঙ্গল বয়ে আনবে সন্দেহ নেই। অপরদিকে, আওয়ামী লীগ এত পুরনো আর কত ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া সত্ত্বেও জিয়াউর রহমানের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্য বোধ করে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে অপমান আর অপবাদ দিয়ে তারা নিজেদেরকে জাতির সামনে কতটা হীনতার পরিচয় দিচ্ছে তা অনুমান করতে পারছে না। রাষ্ট্রপতি হিসেবে না হোক, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর যোগ্য সম্মানটুকু দিলে আওয়ামী লীগ লাভবান হতো সন্দেহ নেই। কার ভয়ে, কিসের ভয়ে আওয়ামী লীগ জিয়াউর রহমানকে স্বীকৃতি দিতে চায় না? জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ঠিক একই কথা। বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে বিএনপি কখনো জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। আমরা তো সবাই জানি বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে এই বাংলাদেশ হতো না, এই বাংলাদেশ না হলে বিএনপির জন্ম হতো না। তা হলে এই সত্যকে স্বীকার করে নিতে বিএনপির বাধা কোথায়? নিজেদেরকে যদি জিয়াউর রহমানের আদর্শই ভেবে থাকেন, নিজেদেরকে যদি এতটাই গণতান্ত্রিক ভেবে থাকেন, যদি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বাসী হয়ে থাকেন তাহলে বঙ্গবন্ধুকে বুকের ভেতরে স্থান দিতে ভয় কেন? প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আজ এই দ্বন্দ্ব চলছে। জানি না এই দ্বন্দ্বের শেষ কোথায়। শুধু সত্যটাকে বুকে লালন করার বা ধারণ করার অনীহা থেকেই এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত এবং যতদিন সত্যকে সত্য বলা সম্ভব হবে না ততদিন এই জাতি একবার গহীন সমুদ্রে ডুববে, একবার ভাসবে। জাতিকে ডুব সাঁতার খেলতে দিয়ে রাজনীতিবিদগণ যে কৌশলে এগোচ্ছেন তা জাতির জন্য মোটেও কল্যাণকর নয়। আমরা এখনো একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারিনি। আমরা এখনো কোন সরকারি প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে পারিনি। আমরা এখনো নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানার সুযোগ করে দিতে পারিনি। এই সংকীর্ণ মনমানসিকতা নিয়ে আর যা-ই হোক, রাজনীতি হয় না। রাজনীতিবিদদের মুখেই অহরহ শুনে থাকি তারা মানুষের কল্যাণে, দেশের কল্যাণে কাজ করেন। অথচ দেশ, জনগণ সবই ক্রমশ স্বাস্থ্যহীন হয়ে পড়ছে, লাবণ্যহীন হয়ে পড়ছে আর তারা ঠিকই স্ফীত থেকে স্ফীততর হচ্ছেন। দুদকের মামলা থেকে এবং নির্বাচন কমিশনে দেয়া হলফনামা থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশ আরও ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগোবে নিশ্চিত বলা যায়। রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করছেন, যারা করেছেন ও করবেন তাদের কাছ থেকে অন্তত সত্যটা জানার আশা করতেই পারি। আন্দোলন করে গিনেজ বুকে নাম উঠাতে তত্পর ব্যক্তিরা দেশের নাম যে ডুবাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু ক্ষমতায় যাওয়া আর ক্ষমতায় টিকে থাকার আন্দোলনে মত্ত থাকলে তারা দেশকে ভালোবাসবে কখন, মানুষকে ভালোবাসবে কখন? বিএনপি নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধার দল হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে চাইলেও তাদের গায়ে জামায়াতের সাইনবোর্ড লেগে আছে, বলা যায় জামায়াত তাদের শরীরে আষ্টেপৃষ্ঠে সেঁটে আছে। যারা এদেশের স্বাধীনতা চায়নি, যারা হাজারো মানুষকে হত্যা ও নির্যাতন-নিপীড়ন করেছে তাদেরকে সাথে নিয়ে গর্ব করা যায় না। বিএনপিতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন যাঁরা এই বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারবেন। গত বেশ কয়েক বছর ধরে জামায়াতকে নিষিদ্ধের কথা উঠেছে। জামায়াতের জন্ম থেকে তারা এর আগে তিনবার নিষিদ্ধও হয়েছিল। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এটা এখন অধিক জরুরি বিবেচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। উপযুক্ত পরিচর্যার অভাবে দেশের চেহারা সুশ্রী হতে পারছে না। এ জন্য নীতিনির্ধারক লোকদেরকে বা প্রতিষ্ঠানকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার যখন কোন একটি দলকে বা দলের প্রধানকে নাকে খত দেয়ার মতো ভাষা প্রয়োগ করেন তখন আর মনে হয় না নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। এমন অবস্থা থেকে জাতি পরিত্রাণ চায়। সঠিক ইতিহাস যেমন চোখের সামনে মেলে ধরা প্রয়োজন তদ্রূপ প্রয়োজন প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে, প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে সঠিক ও নিরপেক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন। আমরা সাধারণ মানুষ যেন সাধারণভাবেই বেঁচে থাকতে পারি। শুধু একটাই চাওয়া, আমাদের দেশটা যেন হয় সুশ্রী, লাবণ্যময়, স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধশালী। লেখক :কবি ও শিশুসাহিত্যিক