নিরাপদ রক্তের অঙ্গীকার
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০১৪, ২১:৪৪
মানব দেহের অভ্যন্তরে প্রবাহমান অস্বচ্ছ লাল তরল পদার্থ হচ্ছে রক্ত। রক্তকে প্রধানত দু’ভাগে ভাগ করা যায় রক্ত কণিকা ও রক্তরস। মোট রক্তের ৪৫ ভাগ রক্ত কণিকা এবং ৫৫ ভাগ রক্তরস বা প্লাজমা। এই রক্তরসের ৯২ ভাগ জলীয় অংশ থাকে। রক্তকণিকায় তিন ধরনের জীবপদার্থ থাকে। যেমন: ১২০ দিন জীবনকাল নিয়ে থাকে লোহিতকণিকা, ২ থেকে ১০ দিনের আয়ুস্কাল নিয়ে থাকে শ্বেতকণিকা এবং মাত্র ২ দিনের আয়ু নিয়ে থাকে অণুচক্রিকা। লোহিতকণিকা রক্তের হিমোগ্লোবিনের মাত্রাকে বৃদ্ধি করে, শ্বেতকণিকা রক্তের অনুপ্রবেশকারী রোগ-জীবানুকে ধ্বংস করতে সহায়তা করে এবং অণুচক্রিকা রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়তা করে।
একজন সুস্থ সবল দেহধারী ৫০ কেজি ওজনের মানুষের দেহে ১ হাজার ৩ শত মিলিলিটার রক্ত বাড়তি থাকে। লিঙ্গভেদে পুরুষ ও মহিলাদের দেহের রক্তের মোট পরিমাণে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ছেলেদের ক্ষেত্রে শরীরের ওজনের প্রতি কেজিতে রক্ত থাকে ৭৬ মিলিমিটার এবং মেয়েদের থাকে ৬৬ মিলিলিটার। হূদযন্ত্র মানবদেহের অভ্যন্তরে শিরা ধমনী দিয়ে সমগ্র শরীরে রক্ত প্রবাহ করে থাকে। সুুস্থ ও স্বাভাবিক হূিপন্ড ২৪ ঘন্টায় ৮ গ্যালন রক্তকে পাম্প করে থাকে। মানব দেহের ধমনী ও শিরার মোট দৈর্ঘ্যের পরিমাপ করলে তা দাঁড়ায় ১২ হাজার মাইল। শরীরতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া চলমান রাখার বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনে শরীরে বিদ্যমান রক্তের মাত্র ৬০ ভাগ ব্যবহূত হয়। বাকি রক্ত থাকে ক্রিয়াহীন ও অলস। সর্বাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই সময়ে রক্ত সংগ্রহ করে মাইনাস ৫-৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ৩০-৩৫ দিন পর্যন্ত নিরাপদে রক্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব।
দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে নানাবিধ রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, গর্ভবতী নারী ও প্রসূতি মাতার সংখ্যা বাড়ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যাও প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও, থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া, ক্যান্সার ইত্যাদি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নানাবিধ রোগের নিয়মিত অপারেশন, প্রসূতি মাতার রক্তরক্ষণ, থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া, ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীসহ সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত রোগীদের জরুরি ভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে রক্তের বাত্সরিক চাহিদার পরিমাণ ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ ব্যাগ রক্ত। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকের মাধ্যমে এতো বিপুল পরিমাণের রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহ করে রোগীদের সন্তোষজনক সেবা প্রদান করা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এই মহতী উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এগিয়ে এসেছে যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। এই বিপুল পরিমাণ রক্ত সংগ্রহ করতে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ২০৫টি রক্ত সঞ্চালক কেন্দ্র রয়েছে যারা অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সকল উদ্যোগের মাধ্যমে সংগৃহীত রক্তের পরিমাণ স্বাস্থ্য খাতের বাত্সরিক চাহিদার মাত্র ৬০ ভাগ মাত্র। অর্থাত্, রক্তের মোট চাহিদার বিপরীতে এখনও বিপুল পরিমাণে ঘাটতি রয়েছে, যা জরুরি চিকিত্সা ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা সত্য যে, হাসপাতালে অসুস্থ রোগীর জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে অনেক সময় টাকার ব্যাগ নিয়ে ঘুরলেও বিশুদ্ধ রক্ত পাওয়া যায় না। আবার কখনও রক্ত পাওয়া গেলেও তা সময় মতো সরবরাহ করতে না পারায় অনেক মূল্যবান জীবন অকালে ঝড়ে যায়, যা ব্যক্তি ও পরিবারের জন্যে কি ধরনের বেদনাদায়ক তা শুধুমাত্র ভুক্তভোগীরাই উপলব্ধি করতে পারেন।
নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালনের ক্ষেত্রে রক্তদাতার জন্যে কিছু সংক্রামক রোগ যেমন: হেপাটাইটিস বি ও সি; ম্যালেরিয়া, সিফলিস, গনোরিয়া, এইডস্, জণ্ডিস ইত্যাদির পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উক্ত রোগসমূহ পরীক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে এমন প্রতিষ্ঠানকে রক্তকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি প্রদানের নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিভাগীয় শহর, জেলা শহর এমনকি উপজেলা বা বন্দর পর্যায়ে আজকাল ব্যাঙ্গের ছাতার মতো ব্লাড ব্যাংক ও ক্লিনিক গড়ে উঠেছে যাদের না আছে প্রয়োজনীয় ও দক্ষ জনবল, না আছে প্রয়োজনীয় ও মানসম্মত আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং সংরক্ষণাগার। তারপরেও চলছে রক্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সরবরাহ। জীবর রক্ষার এতো বড় অনুষঙ্গ কিভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে তা দেখভাল করার জন্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষ কাজ করছে না। এ কারণে বাংলাদেশে অনেক পেশাদার রক্তদাতা রয়েছেন যারা স্বাস্থ্যগত মান বিচারে অযোগ্য কিন্তু তারা নির্দ্বিধায় রক্ত দান করছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের রক্ত সংগ্রহ করে একজন অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করার লক্ষ্যে তার শরীরে অনুপ্রবেশ করাচ্ছে।
প্রতিটি সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ যাদের শারীরিক ওজন ১০০ পাউন্ড এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক তারাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতি ৩-৪ মাস অন্তর শরীরের বাড়তি অলস এক ব্যাগ রক্ত দান করতে পারেন। কারণ আপনার দানকৃত একব্যাগ রক্ত অন্য একজনের অসুস্থতাকে নিরসন করে তাঁকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে অন্যান্য ভূমিকা রাখতে পারে। রক্তদানের অঙ্গীকার পূরণের মাধ্যমে রক্ত দাতা ও রক্ত গ্রহীতার স্বার্থ এবং অধিকারকে সমুুন্নত রাখার অভিপ্রায়ে জেগে উঠুন সবাই, সময়ের প্রয়োজনে এবং মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারে। তাই আসুন, আমাদের শরীরে জমে থাকা অলস রক্তকে নি:স্বার্থভাবে মানবতার কল্যাণে দান করে সহমর্মী হয়ে অন্যজনের পাশে দাঁড়াই যিনি আপনার সাহায্যের অপেক্ষায় প্রহর গুণছেন, যার আর্তনাদকে এখনও আপনি দেখতে বা শুনতে পাচ্ছেন না।
লেখক :উপ-ব্যবস্থাপক (কার্যক্রম), পিকেএসএফ