শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানই বেশি জরুরি
প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৩৬
২০০৯ সালে মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর গ্রহণের বয়সসীমা ৫৭ থেকে ৫৯ করার মাধ্যমে শুরু হয় সরকারি চাকরিতে নিয়োজিতদের বয়সসীমা বাড়ানোর উদ্যোগ। আবার ২০১২ সালে মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে অবসর গ্রহণের বয়সসীমা এক বছর বাড়িয়ে ৬০ বছর করার পাশাপাশি অন্য চাকরিজীবীদের অবসর গ্রহণের বয়সসীমা ৫৭ থেকে ৫৯ বছর করা হয়। অন্যদিকে দেশের সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয় ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৬৫ বছর। আবার বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ আইন, ২০১৩-এর অনুমোদনক্রমে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের বিজ্ঞানীদের অবসরের বয়সসীমা ৫৯ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা হয়। পরবর্তী সময়ে দেশের সব বিজ্ঞানীর অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর (৬৭ বছর করা) নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের অবসর গ্রহণের বয়সসীমা আরেক দফা বাড়িয়ে ৬০ বছর করার সিদ্ধান্ত (এবং এরই সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমাও ৬৭ করার চিন্তা-ভাবনা চলছে) প্রক্রিয়াধীন আছে বলে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ।
আমাদের দেশের বাস্তবতা বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে, যিনি ৫৯ বছর বয়সে অবসরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁর ছেলেমেয়েরা হয়তো অনেকে পড়ালেখা শেষ করে চাকরি খুঁজছে আবার কেউ কেউ চাকরি করছেও। আবার এর ব্যতিক্রমও হতে পারে তবে তা নিতান্তই কম যা উদাহরণ হিসেবে দেওয়া যাবে না। আমি নিশ্চিত যে যিনি কিছুদিন পর অবসরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অথচ তাঁর একটি ছেলে বা মেয়ে বেকার অবস্থায় হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছে তিনি নিঃসন্দেহে চাইবেন তাঁর অবসরের সময়সীমা না বাড়িয়ে তাঁর বেকার ছেলেটির বা মেয়েটির চাকরির ব্যবস্থা হোক। এতে করে তাঁর পুরো পরিবারের হতাশা কমে যাবে। পাশাপাশি ঐ পরিবারটি যে অসচ্ছলতায় ভুগবে তাও কিন্তু না। কারণ এতে করে বেকার মেয়ে বা ছেলেটির নির্ভরশীলতা কমছে। পাশাপাশি তিনি তাঁর পেনশনের টাকাও পাবেন। সব মিলিয়ে পরিবারটিতে সচ্ছলতার অভাব ঘটবে না। কিন্তু যদি ঐ ব্যক্তিটির অবসর গ্রহণের বয়সসীমা বাড়িয়ে ৬০ করা হতো আর তাঁর ছেলে বা মেয়েটির চাকরি না হতো (এবং যদি ৩০ বছর পেরিয়ে যেতো) তাহলে তাকে সারাজীবনই হতাশায় ভুগতে হতো যার রেশ বাবা-মাকেও টানতে হতো। এমনও হতে পারতো যে ছেলেটি তখন মাদকাসক্ত বা অপরাধমূলক কাজেও জড়িয়ে পড়তে পারতো। আবার মেয়েটির হয়তো বিয়ে হতেও জটিলতা পোহাতে হতো। এরপরও অবসর গ্রহণের বয়সসীমা বাড়ানো হলে সেটি হবে অনেকটা ‘তেলা মাথায় ঢালো তেল, রুগ্ণ মাথায় ভাঙো বেল’-এর মতো অবস্থা! সেটি না করে সরকারের ভেবে দেখা উচিত কীভাবে চাকরিতে ঢোকার বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩২/৩৩ করা যায়। এখন সময় এসেছে এটি ভেবে দেখার। আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে যে অনেকগুলোতেই ৪ বছরের স্নাতক ডিগ্রি শেষ করতে ৫ বছর বা কোথাও কোথাও আরো বেশি সময় লেগে যায়। তারপর স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করতে প্রায় দেড় থেকে দুই বছর লাগে। সব মিলিয়ে পড়ালেখা শেষ করতেই তাদের বয়স ২৬/২৭ হয়ে যায়। আবার পাস করার সঙ্গে সঙ্গেই যে তারা চাকরির সুযোগ পেয়ে যায় তাও নয়। তাদেরকে অপেক্ষা করতে হয় কখন শূন্য পদের বিপরীতে বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়, বিজ্ঞাপন মোতাবেক আবেদন করে নির্বাচনী পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা, ফলাফল প্রকাশ ইত্যাদি বিভিন্ন জটিল ও সময়সাপেক্ষ বিষয়সমূহ পাড়ি দেওয়ার জন্য। দেখা যায় একটি নিয়োগ সম্পন্ন হতে হতে ১ বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। পদের সংখ্যা প্রার্থীর তুলনায় নিতান্তই কম থাকে বলে একজন প্রার্থীকে স্বাভাবিকভাবেই একাধিক বার চেষ্টা করে যেতে হয়। কিন্তু বর্তমানে চাকরিতে ঢোকার বয়সসীমা ৩০ বছর হওয়ায় অনেকেই ১/২ বারের বেশি সেই সুযোগ পায় না। তাই সার্বিক বিষয়সমূহ বিবেচনা করে অবসরের বয়সসীমা না বাড়িয়ে চাকরিতে ঢোকার বয়সসীমা বাড়ানোর উদ্যোগ নিলে সেটি দেশের বিশাল শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য হিতকর হবে বলে অনেকের বিশ্বাস।
ময়মনসিংহ