[ রা জ নী তি ]

নির্বাচন, গণতন্ত্র এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা

নির্বাচন নিয়ে সম্ভবত সবচেয়ে বাজে কথা বলেছিলেন— নরঘাতক হিটলার। ‘বরং সূচের ফুটোর ভেতর দিয়ে একটি আস্ত উট গলিয়ে বেরোতে পারে কিন্তু নির্বাচনের ভেতর দিয়ে কোনো ভালো মানুষ বেরিয়ে আসতে পারে না’ বলে মনে করতেন এই নাত্সী নেতা। এ ব্যাপারে সুবোধ সাহিত্যিক এলিয়টও কম যাননি। নির্বাচনের আন্তরিকতাকে তিনি মুরগীর আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির জন্যে ধূর্ত শিয়ালের প্রার্থনার আন্তরিকতার সাথে তুলনা করেছেন। কোন পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা এতোটা নির্বাচন বিতৃষ্ণ হয়ে উঠেছিলেন তা খুঁজে বের করা হয়তো জ্ঞান চর্চার স্বার্থে জরুরি, কিন্তু তারচেয়ে অনেক বেশি জরুরি এ মুহূর্তে, আমাদের জন্যে, এটা নিশ্চিত করা যে, বাংলাদেশের মানুষ যেনো কোনোভাবেই এরকম নির্বাচন বিতৃষ্ণ হয়ে না ওঠে। নির্বাচন বিষয়টি জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। চুয়ান্ন’য় (১৯৫৪) নির্বাচিত হয়েও ক্ষমতায় বসতে পারেনি বলে তার ক্ষোভ জন্মেছিলো; আটান্ন’র (১৯৫৮) নির্বাচনবঞ্চিত হয়েছিলো বলে সে ক্ষোভ বেড়েছিলো; সত্তরে (১৯৭০) নিরঙ্কুশভাবে নির্বাচিত হয়েও ক্ষমতাবঞ্চিত হওয়ায় সে ক্ষোভ দাবানল হয়ে উঠেছিলো। স্বাধীন বাংলার প্রথম সরকারও গঠন করা হয়েছিলো নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের নিয়েই। তাই নির্বাচন বাংলাদেশের উদ্ভব ও বিকাশের একমাত্র রাজনৈতিক বাহন। সে কারণেই কোনো অনির্বাচিত সামরিক/অসামরিক শক্তি এদেশের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে খুব বেশিদিন টেকসই হতে পারেনি। তাই বলে নির্বাচিত মাত্রেই যে সব সময় সবকিছু উদ্ধার করেছে তাও নয়। ঘাসের ভেতরে যেমন সাপ, এ-দেশের রাজনীতিতে তেমনি গণতন্ত্রের পোশাক পরা মেষকেও অনেক সময় দেখা গেছে স্বৈরাচারী নেকড়ে হয়ে উঠতে। তারপরও যে ইতিবাচক রাজনৈতিক পালাবদলগুলো হয়েছে, সেগুলো মূলত নির্বাচনের মাধ্যমেই। তাই শত ব্যর্থতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন এতোটা গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে শতধাবিভক্তি থাকলেও তাই নির্বাচনের প্রাসঙ্গিকতা/অনিবার্যতা নিয়ে কোনো বিভেদ নেই। সদ্য সমাপ্ত উপজেলা নির্বাচন নিয়েও তেমনি রকমারি কূটতর্ক আছে। কি হয়েছে এবং কি হতে পারতো নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের মতভেদের কুলকিনারা নেই। প্রথম দিককার ফলাফল দেখে যারা তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা শুরু করেছিলেন, তারাই আবার শেষে এসে অসন্তোষের বিষ ঢালছেন। অভিযোগের আঙুল তুলছেন নির্বাচন কমিশনের দিকে। তারা বেমালুম ভুলে যাচ্ছেন যে, এই একই কমিশনের অধীনেই তারা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনগুলোতে বিজয় পেয়েছিলেন। শুধু তাই নয় সৌজন্যের পরাকাষ্ঠা দেখাতে কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জানাতে গিয়েছিলেন। অথচ এখন ফলাফল কিছুটা খারাপ হতে থাকলে সৌজন্যের মুখোশ খুলে খিস্তি আউড়ানো শুরু করেন। মানছি, শেষের দফাগুলোর নির্বাচন নিয়ে জনমনে বেশ খানিকটা অস্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে। মান বাঁচাতে সরকারি দলের উগ্র তত্পরতা, পাড়ায়-মহল্লায় ‘ধমক বাহিনীর উত্পাত, কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাগুলো আকস্মিক কিংবা বিচ্ছিন্ন হলেও তা অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণে বাধা দিয়েছিলো। অথচ নির্বাচন কমিশন আন্তরিকভাবে চাইলেই সেগুলো অনেকাংশেই কমিয়ে আনা যেতো। সরকার কিংবা সরকারি দলেরও উচিত ছিলো উপজেলা নির্বাচনের মতো একটি অপেক্ষাকৃত গৌণ নির্বাচনে পরাজয়ের ঝুঁকি এড়াতে হঠকারি কিছু করে নিজেদের অবস্থান দুর্বল না করা এবং সর্বোচ্চ মাত্রায় নিরপেক্ষতা রক্ষার মাধ্যমে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে এখনো জনমনে যে জিজ্ঞাসাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে— সেগুলো নিরসিত হতে সাহায্য করা। কিন্তু সরকার সে সুযোগ গ্রহণে কিছুটা হলেও ব্যর্থ হয়েছে। তবে ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের চাইতে ৫ দফার উপজেলা নির্বাচনের গুণগত ও পরিমাণগত উভয় মানই বেশি। ৫ জানুয়ারিতে ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন প্রতিহত করার চেষ্টা করা হয়েছিলো। চরম সহিংসতা ও আতঙ্ক সৃষ্টির মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি বেসামাল করবার চেষ্টা করা হয়েছিলো। বর্তমানে ৫ দফায় যে প্রাণহানি ঘটেছে তার চাইতে অধিক প্রাণহানি ঘটেছিলো ঐ একদিনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। তারপরও সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পেরেছিলো এবং তা নিয়ে যতো প্রশ্নই থাক না কেনো, সাংবিধানিক অনিবার্যতার কারণেই হোক কিংবা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে অগণতান্ত্রিক শক্তির অযাচিত আগমন ঠেকানোর জন্যেই হোক, তা আমাদের গ্রহণ করতে হয়েছিলো। তবে সেই নির্বাচনের যে ক্ষত, যে সামগ্রিক রাজনৈতিক লোকসান তা কাটিয়ে উঠবার চেষ্টা থাকা উচিত ছিলো উপজেলা নির্বাচনে। নাকে খত দিয়ে আসুক কিংবা চামড়া বাঁচাবার জন্যেই আসুক উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক পদক্ষেপ। সহিংসতার রাজনীতিকে না বলার চিহ্ন হিসেবে বিবেচ্য পদক্ষেপ। প্রাথমিকভাবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও প্রশংসার দাবি রেখেছে। তবে ফলাফলে বিএনপি-জামায়াতের পাল্লা যখন বেশির দিকে থেকেছে তখন তারা কমিশনকে নিরপেক্ষ মনে করেছে এবং ফলাফল যখন কমের দিকে গিয়েছে তখন নিরপেক্ষতা হানির প্রশ্ন তুলেছে। এই মানসিকতাও সমর্থনযোগ্য নয়। বস্তুত, উপজেলা নির্বাচন একটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এতে প্রার্থী নির্বাচনের মৌল প্রবণতা সাধারণত অরাজনৈতিক হয়ে থাকে। প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়ের চাইতে তার সততা, যোগ্যতা, আচরণ প্রভৃতি সমর্থন আকর্ষণের মাপকাঠি হিসেবে কাজ করে। সেজন্য উপজেলা নির্বাচনে হারজিত সব সময় একটি দলের রাজনৈতিক স্বাস্থ্য কিংবা স্বাস্থ্যহানির লক্ষণ হিসেবে বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। অথচ আমাদের প্রধান দলগুলো হয়তো তাই মনে করে থাকে। তবে ফলাফল বিপর্যয়কে রাজনৈতিকভাবে না দেখে সুপাত্র মনোনয়নের চর্চাকে কার্যকর করলে দলগুলো একদিকে যেমন বিদ্রোহী প্রার্থিতার বিড়ম্বনা থেকে নিষ্কৃৃতি পেতে পারে, অন্যদিকে তেমনি নির্বাচনী ফলাফলও উন্নততর করতে পারে। তাহলে একপক্ষকে হয়তো কারণে-অকারণে নির্বাচন বয়কট/বর্জন করার কথা ভাবতে হবে না, অন্য পক্ষকেও তেমনি ক্ষমতার পেশী খাটিয়ে সাফল্য ছিনতাইয়ের কথা ভাবতে হবে না। সব মিলে নির্বাচন হয়ে উঠবে অবাধ ও নিরপেক্ষ। আবার সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে রাজনীতিকরণের কথাও ভাবা যেতে পারে। এবং সেটাই সম্ভবত সময়ের দাবি। রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থীকে সমর্থন না দিয়ে সরাসরি মনোনয়ন দিলে অভ্যন্তর এবং বহিস্থঃ অনেক ঝামেলাই এড়ানো যাবে। ধাপে ধাপে শেষ হয়ে গেলো উপজেলা নির্বাচন। এই নির্বাচন নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকতে পারে, থাকতে পারে অনেক ক্ষোভ, হতাশা কিংবা আরো কিছু। তবুও ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ রাজনীতিতে একটি নির্বাচন তাত্ক্ষণিক ফলাফল তেমনটা না বয়ে আনলেও এর সুদূরপ্রসারী ফল অবশ্যই ইতিবাচক। তাছাড়া দ্বন্দ্ব, সংঘাত, বিতর্ক নির্বাচন তথা রাজনীতি মাত্রেরই অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। ভারতের মতো বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশেও নির্বাচনী দ্বন্দ্ব ও সংঘাত আমাদের চাইতে বেশি ছাড়া কম নয়। তবুও বাস্তবতার অজুহাত দেখিয়ে আমরা আমাদের কোন রাজনৈতিক বিচ্যুতিকে জায়েজ করতে চাই না। নির্বাচনটি অবশ্যই আরো ভালো হতে পারতো। সরকার কিংবা সরকারি দল আরো বেশি আন্তরিক ও দায়িত্বশীল হতে পারতো। নির্বাচন কমিশন আরো বেশি সক্রিয়তা এবং আত্মনির্ভরশীলতার পরিচয় দিতে পারতো। তারপরও সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। সব কিছু শেষ হয়ে গেলো বলে যারা আহাজারি করছেন, তারা অবশ্যই ঠিক বলছেন না। বিএনপি যে অভিযোগ তুলে প্রতিশোধের হুমকি দিচ্ছে তা যেনো রাজনৈতিক বাচনেই সীমাবদ্ধ থাকে। উপজেলা নির্বাচনের যে ফলই বিএনপির ঘরে উঠুক- তা তাদের হূত অবস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে। সে জন্যে দরকার গঠনমূলক ইতিবাচক রাজনীতি। তা না করে দলটি যদি আবারো জামায়াত নির্দেশিত সহিংসতার পথে পা বাড়ায়- তাহলে হয়তো আর শেষ রক্ষা হবে না। তবে সবচেয়ে বড়ো কথা হলো— বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক টানাপড়েনের একটি সমাপ্তি ঘটা দরকার। আমরা ইংল্যান্ড, আমেরিকা কিংবা ভারতের মতো একটা নির্বাচন ব্যবস্থাও মেনে নিতে পারছি না, আবার নিজেরাও একটা সার্বজনীন, টেকসই ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে পারছি না। নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে আমাদের অবস্থান এবং দৃষ্টিভঙ্গি ক্ষমতার ভেতর এবং বাইরে আমাদের অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল। গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশের জন্য যেমন নির্বাচন প্রয়োজন, সেই নির্বাচন আবার অবাধ, নিরপেক্ষ হওয়াও প্রয়োজন। তাই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা জ্ঞাপক একটি নির্বাচনী পলিসি গ্রহণের জন্য সরকারের কাজ শুরু করা উচিত। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে হলে আমাদের রাজনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধকে কিংবা ঠাণ্ডা লড়াইকে যে কোনো মূল্যে ব্যালট বাক্সের ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। তাকে আর রাস্তায় নামানো ঠিক হবে না। একটি শক্তিশালী নির্বাচন ব্যবস্থাই রক্ষা করতে পারে আমাদের সোপার্জিত স্বাধীনতা, আমাদের গণতন্ত্র, সর্বোপরি আমাদের বাংলাদেশকে। সেই সুষম নির্বাচন ব্যবস্থা রচনার দায় দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে। লেখক: অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক