[ আ ন্ত র্জা তি ক ]
মিসরের গণতন্ত্র রক্ষায় আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪৪
মিসরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সর্বপ্রথম প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসির দল ব্রাদারহুডের হাজার হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে গণ-মৃত্যু রায় দিয়ে দেশটির বর্তমান সামরিক সরকার মিসরের গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঢুকিয়ে দিয়েছেন। আবার বসন্তের সিঁড়ি বেয়ে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে ব্রাদারহুড মিসরে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু করে। মিসরের এ শিশু গণতন্ত্রের লালন-পালন এবং বিকাশের ক্ষেত্রে বিশ্বের গণতন্ত্রমনা ব্যক্তি গোষ্ঠীসহ আন্তর্জাতিক সমাজের দায়-দায়িত্ব অনেক বেশি। শাসনভার গ্রহণের পর থেকেই ব্রাদারহুড আভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুহম্মদ মুরসিকে প্রথম থেকেই চড়াই-উত্রাই পার হয়ে যায়। ব্রাদারহুডের সাথে মিসরের সেক্যুলারপন্থী রাজনৈতিক দলসমূহের মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব, মিসরের কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী, সামরিক-বিচারিক এলিট এবং আন্তর্জাতিক নানা মহলের সাথে ব্রাদারহুডের সম্পর্কে টানাপড়েন এক পর্যায়ে নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের পথ চলাকে কন্টকাকীর্ণ করে তোলে।
মূলত: মিসরে স্বৈরশাসন দীর্ঘায়িত হয়েছে সামরিক ও বিচারিক আমরা এলিটদের সক্রিয় সহযোগিতায়। ফলে প্রথম থেকেই এ গোষ্ঠী গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র পাকাতে থাকে।
মিসরের ইতিহাসে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট ডক্টর মুহাম্মদ মুরসি স্বৈরশাসকদের রেখে যাওয়া স্বার্থগোষ্ঠী দ্বারা প্রবল বাধার সম্মুখীন হন। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা খর্ব করতে সেই চক্রান্তকারীরা দীর্ঘ-অভিজ্ঞতা প্রসূত ষড়যন্ত্রের শক্তি তীক্ষ থেকে তীক্ষতর করতে থাকে। নতুন প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্ট নির্বাচন দিলে পার্লামেন্টের হাতে দেশ পরিচালনার, আইন রচনার ভার অর্পিত হবে, এ ভয়ে সেই কুচক্রীরা নির্বাচিত পার্লামেন্টকে অকার্যকর করে তোলে। গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট মুরসি বুঝতে পারেন। সকল দুর্বলতা কাটিয়ে তাকে দৃঢ় ভূমিকায় নামতে হবে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে এবং শিশু গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে।
নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথে পা বাড়াতে না দিয়ে দেশীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রচক্র একজোট হয়ে পৈশাচিক পদ্ধতিতে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। মুরসি যাকে মিসরের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর পদে আসীন করান, মুরসি যাকে মিসরের সামরিক বাহিনীর প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত করান, সেই বেঈমান বিশ্বাসঘাতক জেনারেল শিশি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মুরসীকে কাপুরুষের মত ক্ষমতাচ্যুত করেন। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে মিসরের ইতিহাসে গণতন্ত্রের নক্ষত্র পতনের ঘটনা ঘটে।
সুদীর্ঘ অত্যাচার, নির্যাতিত, শোষণ-বঞ্চনা সহ্য করেও মুসলিম ব্রাদারহুড সমাজকর্ম, জনহিতকর কার্যাবলী এবং জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা রেখে আপামর জনগণের মনের মুকুরে যে স্থায়ী ভালোবাসায় আসন গড়ে তুলেছিল—যে ব্রাদারহুড মিসরের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার ভ্রাতৃ সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পেরেছিল, সেই ভ্রাতৃ সম্পর্ক থেকে দেশ ও জাতিকে নিষ্ঠুরভাবে ছিন্ন করে সামরিক-বিচারিক আমলারা পুনরায় গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধে একতাবদ্ধ হলো! ইতিহাসের সকরুণ পুনরাবৃত্তি!
২০১৩ সনের জুলাই মাসে ক্ষমতাচ্যুতির পর মুরসির সমর্থকরা রাস্তায় নেমে আসেন এবং উপর্যুপরি আন্দোলন ঘোষণা করেন। মসজিদের নামাজের পর তাসবীহ-হাতে নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে জড়ো হওয়া নাগরিকদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায় মিসরীয় পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর হায়েনারা। হাজার হাজার শান্তিপ্রিয় বিক্ষোভকারীকে যৌথ বাহিনী পাখির মত গুলি করে শহীদ করে। মিনা ও এল আদাওয়া শহরের পুলিশ কেন্দ্রে গণ-আক্রমণে মাত্র একজন পুলিশের মৃত্যুকে অযুহাত করে ব্রাদারহুড কর্মীদেরকে গণ-আসামি করে মামলা দায়ের করা হয় ২০১৩ সালের আগস্টে। এক বছর পর সাম্প্রতিক সময়ে সেই মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় হাজার হাজার ব্রাদারহুড কর্মীর গণমৃত্যু রায় (mass death sentence) ঘোষণার মাধ্যমে মিসরের উদীয়মান গণতন্ত্রের গণহত্যার নির্লজ্জ অধ্যায় সূচনা করা হয়।
গত ২৪ মার্চ মিনার একটি কোর্ট ৫২৮ জন শান্তিপ্রিয় ব্রাদারহুড কর্মীর বিরুদ্ধে মৃত্যু-রায় ঘোষণা করে। বিশ্বব্যাপী এ রায়ের বিরুদ্ধে নিন্দা, ঘৃণা ও প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়। এতদসত্ত্বেও সকল বৈশ্বিক নিন্দাবাদ উপেক্ষা করে পরের দিন অর্থাত্ ২৫ মার্চ এল আদাওয়ার আরেকটি কোর্ট ৬৮৩ জন ব্রাদারহুড কর্মীর বিচার কার্য শুরু করে। বেদনার ব্যাপার হলো একই বিচারপতি সৈয়দ ইউসুফ উভয় কোর্টের বিচারের দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে যে অবিচার ও দুর্বিচারের কালো অধ্যায় রচনায় ভূমিকা রাখছেন; ইতিহাস হয়ত একদিন তার সুবিচার করবে।
মিনা ও এল আদাওয়ার আদালত দুটির নানা দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে। প্রথমত, মিনার আদালত মাত্র দুটি সেশনে শুনানির পরে রায় দিয়ে বিচার ও ন্যায়ের সকল পথ রুদ্ধ করেছে। দ্বিতীয়ত, মিনার আদালতে অভিযুক্তদের নিযুক্ত আইন বিশারদদের কোন কথা বলতে দেয়া হয়নি। তাঁদের অনুপস্থিতিতে বিচার কার্য পরিচালনা করে বিচারের নামে তামাশা করা হয়েছে। তৃতীয়ত, অভিযুক্তদের আইনী লড়াইয়ে তাদের নির্যুক্ত আইনজ্ঞদেরকে অনুপস্থিত রেখে বিচার কার্য পরিচালনায় মিসর এবং অন্যান্য দেশের আইনী প্রক্রিয়ার স্বীকৃত নিয়ম মানা হয়নি। চতুর্থত, মিনা ও এল আদাওয়ার আদালতে একই বিচারক সৈয়দ ইউসুফকে নিয়োগ দিয়ে মিসরের সামরিক-বিচারিক আমলাদের যোগসাজশ ও ষড়যন্ত্র প্রকাশিত হয়েছে। যা অত্র আদালতদ্বয়ের স্বেচ্ছাচারিতা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতা প্রমাণ করছে। ভবিষ্যতে হয়ত এই অপরাধে অত্র আদালতদ্বয়কে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
উপরি-উক্ত আইনী প্রক্রিয়ায় বেআইনী উপাদান সক্রিয় থাকায় আন্তর্জাতিক মহল উক্ত আদালতদ্বয়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছে—এতো অসংখ্য অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে মাত্র দুটি সেশনে সুবিচার পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ এবং যুক্তির বাইরে। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাংক ওয়াল্টার স্টেইনমেন উক্ত রায়কে খুবই ‘অবিচারমূলক’ হিসেবে অভিহিত করে অনতিবিলম্বে এমন প্রহসনমূলক বিচার কার্য বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। ইইউ-এর পররাষ্ট্র নীতির প্রধান ক্যাথরিন এ্যাস্টন মিসরের বিচারিক কর্তৃপক্ষকে অভিযুক্তদের অধিকার সংরক্ষণ করে সুবিচার কায়েমের স্ব্বার্থে আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় এ গণমৃত্যুদণ্ডকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের লংঘন হিসেবে অভিহিত করেছে। বিশ্বব্যাপী ঘৃণা ও নিন্দা পাস কাটিয়ে মিসরের স্বেচ্ছাচারী শাসকবর্গ ঘৃণিত, বিতর্কিত ও প্রহসনমূলক বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। দেশটির বিচার মন্ত্রণালয় অভিযুক্তদের পুনঃবিচার ও আপিলের সুযোগ রয়েছে বলে দায়সারাগোছের জবাব দিলেও মিসরের বিচারিক ইতিহাস কেবলমাত্র অবিচার, অত্যাচার ও নিষ্ঠুরতায় কদর্য ইতিহাসই বার বার উপস্থাপিত করে মিসরের বর্তমান আদালত যে কখনো সুবিচার করবে না। সে কথারই স্পষ্ট ইংগিত দিচ্ছে। এমতাবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়বদ্ধতা প্রচুর। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউ কেবল মিসরের বিচার প্রক্রিয়াকে নিন্দা করে তাদের দায়িত্ব পালন হয়েছে ভাবলে মারাত্মক অন্যায় হবে। আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্রর সংবিধান অনুযায়ী কোন সামরিক শাসক বা সামরিক একনায়ক বা সামরিক অভ্যুত্থানকারী দল ও গোষ্ঠীকে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য দেয়া যায় না। বেদনাদায়ক হলো মিসরের বিচারিক-সামরিক আমলাদের সার্বিক অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড সত্ত্বেও মিসরে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য বিশেষ করে সামরিক সাহায্য অব্যাহত রয়েছে। আমরা গণতন্ত্রকামী মানুষ যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউকে উদাত্ত আহ্বান জানাই যাতে তারা অনতিবিলম্বে মিসরের সামরিক শাসন, সামরিক শাসক ও গণতন্ত্রের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক সামরিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবরোধ চালু করুন। গণতন্ত্র রক্ষার নামে ইরাক ও আফগানিস্তানে পাশ্চাত্য যে দুর্নাম কুড়িয়েছে। মিসরের গণতন্ত্র রক্ষায় অবদান রেখে হয়ত তারা কিছুটা সুনাম অর্জনে সক্ষম হবে।
আন্তর্জাতিক সমাজ বিশেষত জাতিসংঘের ওপর এটা একেবারেই অপরিহার্য যে, জাতিসংঘ মিসরের বিরুদ্ধে মানবিক হস্তক্ষেপ করবে, যা বহুজাতিক সামরিক হামলার পথেও বিস্তৃত হতে পারে। ইউক্রেনের স্বায়ত্তশাসিত ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের হুমকি-ধামকির কিয়দংশও যদি মিসরের উদীয়মান গণতন্ত্রের প্রতিপক্ষ মিসরীয় আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে কার্যকর করা যায়, তাহলে মিসরের শিশু গণতন্ত্র রক্ষা করা সম্ভব হবে। আফ্রো-এশীয় আরব জাহানে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী দ্বিমুখী নীতি যে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে, তার পুনরুদ্ধার সম্ভব কেবল গণতন্ত্রের পক্ষে পাশ্চাত্যের একনিষ্ঠ, বাস্তবিক ও সুদৃঢ় ভূমিকা পালনে। আর তখনি কেবল রাশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের প্রতিবাদ বিশ্বময় সোহার্দ্য পাবে, গ্রহণযোগ্যতা পাবে। মিসরের ব্রাদারহুডের গণমৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে গণতন্ত্রের যে গণহত্যা শুরু হয়েছে, বা বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সমাজকে কঠোর হতে হবে এখনি।
লেখক :অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
email: mramin68@yahoo.com