পানির দেশে হাহাকার পানির জন্য

পানির দেশ হাওর-ভাটি বাংলায় বছরের ছ’মাস থাকে অথৈ থৈ থৈ পানির নিচে। আর বাকি ছ’মাস শুকনো, সবুজের সমারোহ। আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, হাওরের সবচেয়ে বড় সমস্যা এবং সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা বা সুবিধা কি ? আমার উত্তর হবে- ‘পানি’। বর্ষার সময় অতিরিক্ত পানি এবং শুকনোর সময় অতি কম পানি, দু’টোই সমস্যা। এখন ফাল্গুন-চৈত্র-বৈশাখ মাস, শুকনো সময়ে, নদী-নালা, খাল-বিল, ডোবা, পুকুর, খাড়ি সব পলি (Sediments) পরে ভরাট হয়ে পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। পানির স্তরও অনেক নিচে নেমে গেছে। পানির অভাবে গৃহস্থালি, নিত্যপ্রয়োজনীয় কার্যাদি, কৃষি, মত্স্য, পশু সম্পদ সবই সমস্যার সম্মুখীন। পানির অভাবে অনেকে নিয়মিত গোসল করতে পারেন না। হাওরবাসী এখনো অনেকে খোলা পায়খানা ব্যবহার করে। ফলে চারিদিকে নারকীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শিশু ও নারীরাই বেশি ভুগছেন, রোগ-বালাই বাড়ছে। সারারাত ঝির ঝির করে নদীর তলায় জমা পানি সকালে সেচ পাম্প দিয়ে তুলে নেয়া হয়। সেচ নালার বাঁকে তলানীতে জমে থাকা এ পানি দিয়েই মগ ভরে ‘কাক গোসল’ সারতে হয়। পানির কারণে ‘শাঁখের করাতে’র মতো বর্ষা আর শুকনার সময় অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহায় হাওরবাসী। অথচ, এসব জলাশয়কে কেন্দ্র করেই দেশের বিভিন্ন এলাকা হতে মানুষ এসে জনবসতি-গুচ্ছ গ্রামগুলো গড়ে উঠেছিল। আর এখন উল্টো স্রোত বইছে, অভিবাসন বাড়ছে। আমাদের হাওরে রয়েছে ৬ শতাধিক বড় বিল, প্রায় লক্ষাধিক বিল, ঝিল, পুকুর, গাতা (গর্ত), ডোবা যার অধিকাংশই এখন ভরাট হয়ে গেছে। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে চালু ‘কাজের মাধ্যমে খাদ্য’ কর্মসূচির অধীনে বা বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে এ জলাশয়গুলো খনন করে দিলে বহুমুখী উপকার পাওয়া যাবে। এগুলো বর্ষার পানি ধারণ করে শুকনো সময়ে হাওরবাসীর গৃহস্থালি, গোসল, কৃষি কাজ, মত্স্য চাষ ও পরিবেশ রক্ষা করবে। সবচেয়ে বড় যে কাজটি করবে তা হচ্ছে, ফসল কাটার আগে বৃষ্টির পানি ধারণ করে নদীতে মিশতে না দিয়ে ফ্লাশ ফ্লাড বা পাহাড়ি ঢলকে প্রলম্বিত করে একমাত্র বোরো ফসল রক্ষা করবে। খননকৃত এসব জলাশয়ে মত্স্য চাষ করে, আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে জীবনযাত্রায় উন্নয়ন সূচকে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। নদী খনন বা বাঁধ নির্মাণের সাথে এ বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ধাক্কার প্রথম আঘাতটি আমার হাওরেই লাগবে। হাওরে পানির মধ্যে, পানির সাথে, পানিতে বেড়ে উঠা উপযোগী গাছ লাগাতে হবে। গাছ হলে মাছ হবে, পাখির বাসা হবে, পরিবেশ সুরক্ষা হবে, আয় বাড়বে, ভূমি ক্ষয় রোধ এবং ‘আফালের তাফালিং’ এর ঢেউয়ের আঘাত হতে গ্রামগুলোকে রক্ষা করবে। আমরা স্বস্তিতে থাকতে পারবো, ইনশা আল্লাহ। হাওর উন্নয়ন বোর্ডকে বরেন্দ্র বা পাহাড়ী উন্নয়ন বোর্ডের মতো জনবল ও বাজেট দিয়ে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। ‘হাওর মহা-পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে। ‘হাওর মন্ত্রণালয়’ সৃষ্টি করতে হবে। ‘টিপাইমুখ বাঁধ’সহ ভারতের পানি আগ্রাসী জিঘাংসা বন্ধ করতে হবে। দুর্দিনে এবং পানি সমস্যাতে উপরোক্ত সুপারিশগুলি হতে আরে মোক্ষম হাতিয়ার। লেখক: কৃষি প্রকৌশলী