স্মরণ

বিচারপতি মোরশেদ :তাঁর জীবন সাধনা

বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ ১৯১১ সালের ১১ জানুয়ারী কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯২৬ সালে ব্রিটিশ বাংলার রাজশাহী বিভাগের ছাত্রদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরে তিনি ১৯৩০ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৯৩৩ সালের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাস করেন। উভয় পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণি লাভ করেন। বিচারপতি মোরশেদ ১৯৩৪ সালে বাংলার ফোর্ট উইলিয়াম-এ হাইকোর্ট অব জুডিকোচারে অ্যাডভোকেট হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যে তিনি তার এই কর্মজীবন ছেড়ে ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য ইংল্যান্ড চলে যান। ১৯৩৯ সালে সোসাইটি অব লিনকন্স ইন দ্বারা বার-এ ভর্তি হন। সেই বছর তিনি একমাত্র ব্রিটিশ ভারতের ছাত্র ছিলেন, যিনি সম্মান চূড়ান্ত পরীক্ষায় পাস করেন। ভারতবর্ষের জন্য এ ছিল এক গৌরবময় সাফল্য। ইংল্যান্ড থাকাকালে বিচারপতি মোরশেদ পৃথিবীর বিভিন্ন খ্যাতনামা ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে আসেন। এদের মধ্যে ছিলেন লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিকস প্রকল্পের হ্যারল্ড লাসকি, যুক্তরাজ্য ভারতীয় লিগের প্রধান মি. কৃষ্ণ ম্যানোল ও অন্যরা। ইংল্যান্ড থেকে ফিরেই তিনি আবার আইন পেশায় যোগ দেন এবং অতি অল্প সময়ে কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।। তিনি ট্রাইব্যুনাল ইমপ্রুভমেন্টস, কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের সিনিয়র সরকারি উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি হালসা বাগান অগ্নিসন্ধান, ভবানীপুর ব্যাংক জালিয়াতি মামলা এবং মুনির অনুসন্ধান কমিশন মামলার আইনজীবী ছিলেন। ওই সময় তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। যারা বাংলায় কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন করার চেষ্টা করেছিলেন কংগ্রেসের প্রতিনিধি এবং প্রজা পার্টির প্রতিনিধি, তিনি তাদের সঙ্গে জড়িত হন। তিনি প্রগতিশীল মুসলমানদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিচারপতি মোরশেদ তাদের সঙ্গেও যোগ দিয়েছিলেন, যারা সংক্রিয়ভাবে স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসের প্রস্তাবকে সমর্থন করেছিলেন। এই মিশন ভারতের উত্তর, পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলে একটি স্বায়ত্তশাসিত মুসলিম দল বা গ্রুপ এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে একটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব দেয়। অবিভক্ত বাংলার পক্ষে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে বিচারপতি মোরশেদ ছিলেন অন্যতম। ১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চরম আকার ধারণ করলে তিনি সেই দাঙ্গা রোধে সংক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ভারত বিভাগের পর তিনি তদানীন্তন পূর্ববাংলায় ফিরে আসেন এবং অ্যাডভোকেট হিসেবে ঢাকা হাইকোর্টে যোগ দেন। এবং প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৫৯ সালে তিনি পদোন্নতি লাভ করেন। বিচারপতি হিসেবে মোরশেদ ছিলেন এক আপসহীন ব্যক্তিত্ব এবং আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের প্রতি তার ছিল দৃঢ় বিশ্বাস। জেনারেল আইয়ুব খান যখন সারা দেশ সামরিক আইন জারি করেন, তখন বিচারপতি মোরশেদ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। এখানে বিচারপতি মোরশেদের দেয়া কিছু মামলার বিচারের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। বিচারগুলোর মধ্যে— প্রথমত, আবদুল হক বনাম ফজলুল কাদের চৌধুরী ও অন্যদের মধ্যকার বিখ্যাত মামলা বা মিনিস্টার কেস নামে পরিচিত। এই মামলার স্পেশাল ব্রেঞ্জের প্রিসাইডিং বিচারক হিসেবে যে রায় দেন, তার ফলে ১৯৬২ সালে সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক মন্ত্রীদের মন্ত্রিত্বের আসন থেকে বিচ্যুত করেন। এই মামলার রায়ের ফলে প্রেডিডেন্ট আইয়ুব খান মন্ত্রীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধন করতে বাধ্য হন। দ্বিতীয়ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কনভেনশন (সন্ধি বা চুক্তি) মামলা, যা জাকির আহমেদ মামলা হিসেবে সুপরিচিত। এই মামলায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক জাকির আহমেদকে বহিষ্কৃত করার রায় বাতিল করেন। অডি অলটার্স পারটেম তত্ত্ব তিনি এই মামলার যে তীক্ষ মেধার সঙ্গে প্রয়োগ করেছিলেন, তা আজও আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালতে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে অনুসরণ করা হয়। তৃতীয়ত, বিচারপতি হলো কর্নেল ভট্টাচার্যের মামলা। এই মামলায় আদালতের পক্ষে বলতে গিয়ে বিচারপতি মোরশেদ রুশো থেকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘বল প্রয়োগ কখনো আইনের উত্স হতে পারে না। এটা রাজনৈতিক দর্শনের একটা মতবাদ, যা অবিমিশ্রভাবে গৃহীত হয়নি। হবসীয় ধারার অপর এক রাজনৈতিক মতবাদে অবশ্য মনে করা হয় যে, সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের বল বা শক্তি হচ্ছে আইন বা রাষ্ট্রের উত্স বা ভিত্তি। লকের মতো আরো অনেক রাজনৈতিক দার্শনিক অবশ্য উপরোক্ত দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যবর্তী অবস্থান নিয়েছেন। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীর এই দিনে আমরা তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।