পাবলিক লাইব্রেরিকে বাঁচাইতে হইবে

দেশের পাবলিক লাইব্রেরিগুলির দশা নিতান্ত করুণ। কোনো কোনোটি রীতিমতো ধ্বংসের মুখে। কোনোটি হয়তো তালাবদ্ধ হইয়া আছে বহুদিন ধরিয়া, ভিতরে ইঁদুর ও পোকামাকড়ের আবাস গড়িয়া উঠিয়াছে, গ্রন্থগুলিই হইয়াছে তাহাদের উপাদেয় খাদ্য। কোনোটির ভবন জরাজীর্ণ, পড়ো পড়ো অবস্থা। অথচ এই জ্ঞানকেন্দ্রই ছিল একসময়ের ক্ষুদ্র শহরগুলির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। লাইব্রেরি ভবন, তাহার মাঠ বা বাগান জ্ঞানপিপাসুদের পদচারণায় মুখরিত থাকিত। কেবল সাহিত্যপাঠ নহে, সাহিত্যচর্চারও কেন্দ্রভূমি হিসাবে বিবেচিত হইতো গণগ্রন্থাগারগুলি। সাহিত্যপাঠ, গবেষণা হইতে শুরু করিয়া দৈনন্দিন খবরাখবরের জন্য দৈনিক-সাপ্তাহিক পত্রিকা ও সাময়িকী পাঠ করিতে মানুষ গণগ্রন্থাগারে গমন করিত। স্থানীয় মেধাবীদের জ্ঞানের উত্স ও তাহা চর্চার পরিসর উপহার দিয়া থাকিত গ্রন্থাগারগুলি। কিন্তু আজ দিন পাল্টাইয়াছে। মানুষের আগ্রহও পাল্টাইয়াছে। মানুষ জ্ঞানের চাইতে এখন তথ্যের দিকে ঝুঁকিয়াছে, সাহিত্যের চাইতে সংবাদে আগ্রহী হইয়াছে। এমনকি বিনোদনের এত নানান উত্স জুটিয়াছে যে, সাহিত্যের স্থান সেই তালিকায় নাই বলিলেই চলে। অন্যদিকে তথ্য, গবেষণা ও জ্ঞানের সহজ উত্স হিসাবে ইন্টারনেট হাজির হইয়াছে, ফলে গ্রন্থের চাহিদা কমিতেছে। কিন্তু অনুভবের বিষয় এই যে, ইন্টারনেট অনেক তথ্য সহজেই হাজির করিতে পারে, কিন্তু গ্রন্থের মতো করিয়া গভীরভাবে সে জ্ঞানকে উপহার দিতে পারে না। হাতে নিয়া গ্রন্থ পড়িবার প্রক্রিয়ায় জ্ঞানের সহিত পিপাসুর যেই অন্তরঙ্গ যোগাযোগ স্থাপিত হয় তাহা অন্য কোনো উপায়ে অর্জন করা সম্ভব নহে। ফলে পাবলিক লাইব্রেরির গুরুত্ব আজও রহিয়াছে। শত শত বত্সর ধরিয়া গ্রন্থাগারগুলি যেই জ্ঞানভাণ্ডার গড়িয়া তুলিয়াছে তাহার সকল স্বাদ গ্রহণ করিতে হইলে গ্রন্থাগারে যাইবার কোনো বিকল্প নাই। কিন্তু পরম আক্ষেপের বিষয় হইলো জেলা শহরগুলিতে যেই পাবলিক লাইব্রেরিগুলি ছিল তাহারা যেমন ধ্বংসের মুখে, তেমনি সেই লাইব্রেরিগুলিতে জ্ঞান চর্চাও বিলুপ্তির পথে। পাবলিক লাইব্রেরিগুলি হইতে কেবলই সবকিছু হারাইয়া যাইতেছে, যোগ হইতেছে না কিছুই। অথচ মানুষের পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানের বাহিরে বাড়তি জ্ঞানের যোগান দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে পাবলিক লাইব্রেরিগুলিই। আমরা ক্রমশ জ্ঞানবিমুখ জাতিতে পরিণত হইতেছি। অথচ এই লাইব্রেরিগুলি বেহাল দশার মধ্যে পড়িয়াছে সরকারি বরাদ্দ ও পরিকল্পনার অভাব, অবহেলা-অযত্নে এবং হীন স্থানীয় রাজনীতির কারণে। লাইব্রেরিগুলির একটি পরিচালনা পরিষদ থাকে যাহা সার্বিক উন্নয়নের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। পরিচালনা কমিটির সভাপতি হন পদাধিকারবলে জেলা প্রশাসক। বাকি সদস্যরা নির্বাচিত বা নির্ধারিত হইয়া থাকেন। পরিচালনা পরিষদের পদকে ঘিরিয়া স্থানীয় রাজনীতি সক্রিয় হইয়া উঠে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের পরিবর্তে রাজনীতিবিদরা পদগুলি নিয়া বিবাদ শুরু করেন, নির্বাচন ভেস্তে যায় এবং লাইব্রেরির উন্নয়ন কার্যক্রম বন্ধ হইয়া যায়। জেলা প্রশাসক তার হাজার কাজের ভিড়ে গ্রন্থাগারের দিকে নজর দেওয়ার আর সময়-সুযোগ পান না। অন্যদিকে বরাদ্দের নিয়মিত ব্যবস্থা না থাকায় অথবা অচলাবস্থার কারণে হালনাগাদ না করানোয় গ্রন্থাগারিক, সহকারি ও পিয়নদের বেতন-ভাতা আটকাইয়া থাকে অথবা বাতিল হইয়া যায়। ফলে ঐ পদের লোকবলও আর পাওয়া যায় না। এই দুই মূল কারণে গ্রন্থাগারের ফটকে তালা ঝুলিতে থাকে। জ্ঞানের উত্স পরিণত হয় ভাগাড়ে, জ্ঞানসম্ভার কীটের খাদ্যের রূপ পরিগ্রহণ করে। এই অবস্থা চলিতে দেওয়া উচিত নহে। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, ইহা যদি আমরা কেবলই আপ্তবাক্য মনে না করিয়া থাকি, তবে পাবলিক লাইব্রেরিগুলিকে সংস্কার করিয়া বাঁচাইয়া তুলিতে হইবে। পৃথক প্রকল্প করিয়া একটি সংস্কারাভিযান চালাইতে হইবে সরকারকে। বরাদ্দ বাড়াইবার পাশাপাশি গ্রন্থাগারকে ঘিরিয়া নানান কর্মসূচি চালু করিতে হইবে যাহাতে পাঠকদের সংশ্লিষ্টতা বৃদ্ধি পায়। কমিটিগুলি সক্রিয় করিয়া গ্রন্থাগার প্রশাসনে গতিশীলতা আনিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে জ্ঞানচর্চা ছাড়া অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক সমৃদ্ধি আসিবে না।