স্মরণ
প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক এম আলাউদ্দিন
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০১৪, ২১:১৭
আমাদের প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক এম, আলাউদ্দিনের আজ তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ১৯৪৫ সালের ১২ই আগস্ট সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয় স্কুল কলেজের পর তিনি সিলেট মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬৮ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে এমবিবিএস পাস করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পিজি হাসপাতালে কর্মরত থাকাকালীন ১৯৭৩ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেতে যাত্রা করেন। সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি ও লেখাপড়া চালিয়ে যান। ১৯৭৮ সালে তিনি ডিএলও এবং এফআরসিএস ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৭৯ সালে দেশে ফিরে আসেন। কিছুদিন সিলেটে কাজ করার পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং আজীবন এখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি ছিলেন ১ম নাক কান গলা ও হেড-নেক বিভাগের চেয়ারম্যান। ২০০৬ সালে তিনি মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং দীর্ঘ ৫ বছর যুদ্ধ করে ২০১১ সালের ৪ঠা এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। অবসান ঘটে এক বর্ণিল জীবনের।
নাক, কান, গলা ও হেড-নেক ক্যান্সারের এবং প্রসার দুটোই ঘটেছিল এই কৃতী শিক্ষকের হাতে। তিনি ছিলেন ফুলটাইম শিক্ষক। ক্লাসে, রুমে, ওয়ার্ডে ও অপারেশন থিয়েটারে সর্বত্রই তিনি পড়াতেন। অসাধারণ ধীশক্তি ছিল তার। শিখানোর পদ্ধতি ছিল খুবই সহজ। জটিল বিষয়গুলো তিনি সহজ করে দিতেন। অপারেশনের সময় প্রতিটি পর্যায় তিনি বর্ণনা করতেন। এতে জটিল অপারেশন হয়ে উঠত সহজবোধ্য এবং স্পষ্ট। তিনি শেখাতে পছন্দ করতেন। শিক্ষণীয় অনেক মজার মজার গল্প বলতেন। এত চমত্কারভাবে বলতেন সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনতেন। পরীক্ষক হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত সদয়। তিনি পরীক্ষক হবার পরই ইএনটির উচ্চশিক্ষার অচলায়তন ভাঙ্গে। দলমত, ধর্ম নির্বিশেষে সবাই তার আনুকূল্য পেয়েছেন। তিনি সবাইকে ছাত্র হিসেবে দেখতেন সমানভাবে।
মানুষের প্রতি ভালবাসা ছিল অপরিসীম। হাসপাতালে গরীব রোগীদের প্রতি কোন অবহেলা হলে তিনি রাগ করতেন। বিশেষ করে ক্যান্সারের রোগীদের প্রতি ছিল তার বিশেষ মমতা। এসব রোগীর জন্য কিছু করার কথা তিনি ভাবতেন। তারই ফলশ্রুতিতে তার স্বপ্নের ঠিকানা হিসেবে আগারগাঁও-এ গড়ে উঠেছে ইএনটি ও হেড-নেক ক্যান্সার ফাউন্ডেশন হাসপাতাল যেখানে স্বল্পমূল্যে মানুষকে চিকিত্সা দেয়া হয়। মানুষকে আপ্যায়ন করতে ভালবাসতেন। এটা ছিল তার আনন্দ। তিনি ইএনটি সোসাইটির সভাপতি ছিলেন তিনি। আমাদের প্রোগ্রামে তিনি এক অনাবিল আনন্দে মেতে উঠতেন। মনে হত তিনি এক প্রাণোচ্ছল তরুণ। আমি ছিলাম স্যারের সহকারী রেজিস্ট্রার। এই মহান শিক্ষকের অধীনে শুরু হয় আমার ইএনটি প্রশিক্ষণ। স্যারের সহকারী এটা আমার গর্বের পরিচয়। স্যারকে খুব ভয় করতাম আবার শ্রদ্ধাও করতাম। কাজের প্রতি অবহেলা করলে রাগ করতেন। মিথ্যা পছন্দ করতেন না। ১৯৯৩ সালে আমার ট্রেনিং অসমাপ্ত রেখে যখন ঢাকা মেডিক্যাল থেকে অন্যত্র বদলী করা হয় তখন স্যার খুব দুঃখ পেয়েছিলেন। আমাকে একদিন রুমে ডাকলেন। বললেন, দরজা বন্ধ কর। কাছে ডাকলেন। বললেন, আমি তোমাকে অনেক বকাঝকা করেছি, তুমি এগুলি মনে রেখ না। তুমি আমার কাছে কি চাও বল।
আমি বললাম, দোয়া। স্যারের কণ্ঠ কেমন আর্দ্র। চোখ অশ্রুসজল। আমি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তিনি আমাকে দোয়া করেছেন। স্যারের মন ছিল খুবই নরম। বাইরে থেকে সেটা বুঝা যেত না। মনে হত স্যার খুবই রাগী, বকাঝকা করতেন। মানুষকে আঘাত করার জন্য তিনি বকতেন না। এটা ছিল কাজ আদায় করার একটা কৌশল। মিরপুরে এতিমদের জন্য তিনি একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
তিনি দেশকে ভালবাসতেন। বিদেশের ভাল চাকরি ছেড়ে এ দেশে চলে এসেছিলেন। বিদেশে তার বহু বন্ধু-বান্ধব আছে। আমরা যখন বিদেশে যাই এই মহান শিক্ষকের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা দেখাতে দেখি। তিনি চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন সিরেটের পুণ্যভূমিতে। এই মহান শিক্ষককে আমরা কোনদিন ভুলব না। আজ তার আত্মার শান্তি কামনা করি। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান ইএনটি বিভাগ, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল