স্থাপত্য

শিল্প যেভাবে সৃষ্টি হয়

জীবন থেকেই হয়েছে সবকিছুর শুরু। সেই জীবন থেকেই হয় শিল্পের সৃষ্টি। এভাবে মানুষ থেকে মানুষে—এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাওয়া যায় শিল্পের খোঁজ। শিল্প খোঁজার চোখ বলে দেয় শিল্প সৃষ্টির উপায়—হয় অনুপ্রেরণার উত্স। এই একই নিয়মে হয়তো সংবেদনশীল অভিজ্ঞতার ভিত থেকে শিল্পকে আবিষ্কার করেছেন স্থপতি সালাউদ্দিন আহমেদ। তিনি তাদেরই একজন যারা স্থাপত্য বিষয়ক পশ্চিমা উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও শুদ্ধতার বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন মাত্রা থেকে বিচ্যুত হননি। তাই উপলব্ধি থেকেই তিনি আবার জাপান যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মিশ্র সংস্কৃতির দুনিয়ায় নিজের পাটাতনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা সেই দেশটি সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে তা আর নতুন করে বলার দরকার নেই। গত শতকের নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন সালাউদ্দিন তার উচ্চ শিক্ষাক্রমের অংশ হিসেবে জাপান ভ্রমণে যান, ততদিনে দেশটি ফিরে পেয়েছে নিজের চেহারা—ফিরে গিয়েছে নিজের কাছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে দেশটি নিজ গুণে গড়ে ওঠার কারণে খুব সহজেই বলা যায়—অনেককিছুর ভিড়ে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে জানে না। সালাউদ্দিনও জাপানের সেইসব দৃশ্য তার দিনলিপিতে রেখায় রেখায় সংরক্ষণ করেছেন। কেন তিনি রেখা দিয়ে এমন চেষ্টা করলেন? কারণ রেখাই সৃষ্টির রক্ষাকবচ, সৃষ্টির সূত্র এবং সৃজনশীল ইতিহাসের ধারাবাহিতকতার প্রয়াস। একইসঙ্গে তিনি জাপানের কাব্যিক ধ্যান আঁকতে গিয়ে জলের তরঙ্গকে মেপেছেন। একজন স্থপতি হিসেবে তো নয়ই—একজন নৃ-তাত্ত্বিক পরিব্রাজক হিসেবে কোনোকিছুকে তিনি লুকিয়েও রাখতে পারেননি। বরং নিত্য জীবনের কাছে শিল্পকে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। বললে ভুল হবে না, ‘আধুনিক’ জাপান দেখতে দেখতে মনের অজান্তে কখন যেন ‘কেন জাপান’—এমন প্রশ্নের উত্তরও তিনি খুঁজেছেন। তাই সেই সময়ে একজন স্থাপত্যের শিক্ষানবিস হিসেবে তাকে জাপানের ‘আধুনিক’ স্থাপত্য বা ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘কিমোনো’কে রেখার ছন্দে বুঝতে হয়েছে। এভাবেই তিনি জাপানিজ তরুণীদের জুতায় খুঁজে পেয়েছেন ফর্ম হতে পারে কত প্রকার। যেভাবে তিনি তাদের খাবার পরিবেশনের উপকরণ ও ঐতিহ্যবাহী খাবার সৃষ্টির মূল শক্তিকে অস্বীকার করতে পারেননি। আবার তিনি গভীরভাবে বুঝতে চেয়েছেন আধুনিক স্থাপত্যের কাছে গভীর পরিপ্রেক্ষিত কত মূল্যবান। কারণ গভীর পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যেই স্থাপত্য বেঁচে থাকে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই স্থাপত্যে বিচরণ করতে পারে। এই বিচরণের কারণে মনে হয়—সবকিছু অবিনশ্বর— কোনোকিছু হয় না কখনো ধ্বংস। সালাউদ্দিনের সেই সময়ে জাপান ভ্রমণে বুঝেছেন কীভাবে প্রকৃতি ও স্পেসের স্বপ্রণোদিত স্বাভাবিক বিন্যাসে স্থাপত্য বেঁচে থাকে। সময় ও সৃষ্টির তাগিদে ডিজাইনের পরিবর্তন হলেও অন্তর্নিহিত শক্তি কখনো বদলায় না তা তার জাপানের দিনলিপির পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় বিবৃত আছে। তাই ১৮ বছর আগে তার জাপান ভ্রমণ এই সময়ের বিচারেও একইরকম থাকে। তার দিনলিপি বলে দেয়—কীভাবে সৃষ্টি হয়, কীভাবে সৃষ্টি হয় শিল্প এবং কীভাবে জীবনের কাছে শিল্প আজীবন বেঁচে থাকে। হয়তো এ কারণে তিনি এই দিনলিপিকে বই আকারে প্রকাশ করে নাম দিয়েছেন ‘ওয়াটার-ইঙ্ক-পেপার’। বইটিকে ভিত্তি করে বইয়ের শিরোনামে এক প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন। ধানমন্ডিতে ঢাকা আর্ট সেন্টারে শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী ৩ এপ্রিল শেষ হয়। লেখক :প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক ashfak21@gmail.com