ভারতের নতুন গ্রেট!

কেন সব সময় ম্যাচ শেষটা আসে তারই হাত ধরে? কেন ব্যাট তুলে গগণবিদারী উল্লাসটা তাকে করতেই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়? গল্পে তো আরও অনেকেও থাকেন। কিন্তু কেন সবাইকে পার্শ্বনায়ক বানিয়ে সব আলো কেড়ে নেন বিরাট কোহলি? মোক্ষম এক ব্যাখ্যা দিলেন সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক মাইকেল আথারটন, ‘দেখবেন তার মধ্যে একধরনের অহংবোধ কাজ করে। ও সেমিফাইনালটা নিজের জন্য স্মরণীয় করে রাখতে চেয়েছিল বলেই নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে খেলেছে। আমরা গ্রেট একজন খেলোয়াড়ের আবির্ভাব দেখতে পাচ্ছি।’ বেশভূষা দেখলে অবশ্য তাকে ঘিরে আথারটনের ধারণাটা মোটেই সত্যি বলে মনে হয় না। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, উল্কি আঁকা হাত, উদ্ভট এক কেশবিন্যাশ—হঠাত্ দেখলে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের ‘অ্যাংরি হিরো’ বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক। দিল্লির লোকেরা অবশ্য বলে, আসলে ছিলেন ‘বখে যাওয়া’ ছেলে। সে নায়ক, বলুন আর খলনায়ক; বিরাট কোহলির ক্ষেত্রে দুটোই সত্যি। ভারতের হয়ে অজস্র ম্যাচ নায়কের মতো করে জিতে এনেছেন; আর প্রতিপক্ষের কাছে এখন সাক্ষাত্ খলনায়ক এই বিরাট কোহলি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে আবার খলনায়ক হিসেবে হাজির হলেন এই ‘গ্রেট’। আর সেই গ্রেট হওয়ার শেষটা সফল হবে, যদি কি না আজ আবারও ফাইনালে মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জ্বলে উঠতে পারেন। অন্যান্য কোন দলের সামনে তার ভাবমূর্তি যাই হোক না কেন ভারতের জন্য তিনি ‘বিরাট’ এক ম্যাচ উইনার। মাত্র ১৩১টি ওয়ানডে ম্যাচেই তার ঝুলিতে আছে ১৯ টি সেঞ্চুরি। আর এর ১৭টিতেই জিতেছে ভারত। তাই তার ম্যাচ জেতানোর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ নেই। এই কদিন আগে এশিয়া কাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে রান তাড়া করতে নেমে ১৩তম বারের মতো সেঞ্চুরি করলেন কোহলি। এর ১২টিতেই জিতেছে ভারত। ভারতীয়দের মধ্যে এক্ষেত্রে তার থেকে এগিয়ে আছেন কেবল লিটল মাস্টার শচীন টেন্ডুলকার। তিনি করেছিলেন ১৪টি ম্যাচ জেতানো সেঞ্চুরি। ম্যাচ জেতানোতে কোহলির দাপটটা আরও পরিষ্কার হবে পরিসংখ্যান দিয়েই। ম্যাচ জেতানো ৪৭টি ইনিংসে ৮৫.৯৬ গড়ে করেছেন ২৮৩৭ রান। কমপক্ষে ১০০০ রান করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ম্যাচজয়ী ইনিংসে তার থেকে বেশি গড় রয়েছে কেবল মাত্র তিনজন ব্যাটসম্যানের। ১০৩ গড় নিয়ে শীর্ষে আছেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। ম্যাচ জেতানোতে টি-টোয়েন্টিতেও জুড়ি নেই বিরাট কোহলির। এই বিশ্বকাপের কথাই ধরা যাক। চারটি ম্যাচে রান তাড়া করতে নেমে জিতেছে ভারত। এর তিনটিতে আবার শেষ পর্যন্ত অপরাজিত ছিলেন কোহলি। সেই ম্যাচগুলোতে করা ৩৬*, ৫৭* ও ৭২* রান তার গ্রেটনেসেরই পরিচয় বহন করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে যেই ম্যাচটাতে আউট হয়ে গিয়েছিলেন সেটাতেও করেছিলেন ৫৪ রান। ২৪২ রান নিয়ে তিনি এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। কেন আবারও সেই কোহলি? কেন? কেন? কেন? কোহলির কাছে এই প্রশ্নের কোন জবাব নেই, ‘এটা কি আসলেই কোন যৌক্তিক জবাব নেই। আমার মনে হয় প্রত্যেকটি ব্যাটসম্যানেরই এটা করার ক্ষমতা আছে। ক্রিকেটে টেকনিকের চেয়ে আপনার শ্রবণক্ষমতাকে বেশি কাজে লাগাতে হয়। মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হয়। বার বার নিজেকে আশ্বাস দিতে হয়, না তুমি পারবে!’ আকর্ণ বিস্তৃত এক হাসি। ‘কেন বিরাট?’—প্রশ্নের জবাব না পেলে সেই হাসিকে আজ সত্যিই খলনায়কের বিজয়ী হাসি বলে মনে হতে পারে লঙ্কানদের।