নব আনন্দে নব বর্ষে
প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৩৮
তপ্ত হাওয়া ও রোদের মাখামাখি দেখে এখনই আঁচ করা যাচ্ছে বাঙালির মহাপার্বণ বৈশাখী উত্সব আসন্ন। তাই প্রাচুর্যের প্রতীক বৈশাখকে বরণ করতে প্রজন্মের মাঝে চলছে মহাপ্রস্তুতি। বৈশাখের উত্সব হয়ে উঠেছে বাঙালির ঐক্যের উত্সব। পয়লা বৈশাখে যে উত্সবমুখর পরিবেশ, তার বড় অনুষঙ্গ নতুন পোশাক। পুরোনো বছরের ব্যর্থতা, হতাশা, গ্লানি ধুয়ে মুছে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখা প্রজন্মের জন্য দিনটি একটি অনন্য উত্সবে পরিণত হয়। বৈশাখের রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে প্রজন্মের নানা কর্মকাণ্ড ও দিনটির ইতিকথা নিয়ে এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার
সপ্তাহ বাদেই আসছে বৈশাখ। রাঙা বসন্ত এখন শেষের দিকে। ছোট-বড় সব বৃক্ষ নব পত্রপল্লবে সেজেছে নবযৌবনে। আর কোকিলের মিষ্টি ডাক কিছু সময় পর পর মনে করিয়ে দিচ্ছে এখন বসন্ত। আর চারদিকে সবুজের হাতছানি মনে করিয়ে দিচ্ছে কয়টা দিন পরই আসছে বৈশাখ। এবার বসন্তকে বিদায় দেওয়ার পালা। পয়লা বৈশাখ, হালখাতা, নতুন কাপড়—এসব এখন আর কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে নেই। নতুন দিনকে বরণ করার প্রেরণায় ভোরের আলো ফুটতেই লাল-সাদার বর্ণিল আভায় প্রজন্ম ছুটবে গ্রামীণ মেলায় আর নাগরিক ঐতিহ্যে ছায়ানটের বর্ষবরণে কিংবা চারুকলার শোভাযাত্রায়। সবাইকে নিয়ে শুরু হবে নতুন বাংলা বছর ১৪২১ উদযাপন। বাতাসে ধুলোর সঙ্গে যতই মিশে থাকুক রিক্ততা, তবু যেন এই দিনটি প্রজন্মকে দেবে এক লাল সূর্যের প্রতিশ্রুতি। আনন্দ আর উত্সবে প্রজন্ম উদযাপন করে বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ। লাল-সাদাসহ উজ্জ্বল সব রঙের নতুন পোশাক কেমন হবে আর এরসঙ্গে সাজটাই বা কী হওয়া চাই, এ নিয়ে চলে নতুন প্রজন্মের নানা পরিকল্পনা।
শুরুর কথা
বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশসহ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উত্সবের সাথে পালিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও এই উত্সবে অংশ নেয়। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের জন্য একটি সর্বজনীন উত্সব। একটা সময় নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উত্সব তথা ঋতুধর্মী উত্সব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাত্পর্য ছিল কৃষিকাজ। প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়ায় কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হতো। ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হতো। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে তত্কালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।
দিনটি ঘিরে নানান আয়োজন
নতুন বছরের উত্সবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্টীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, নতুন জামাকাপড় পরে এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয় এবং মোটমুটি সুন্দর করে সাজানো হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। কয়েকটি গ্রামের মিলিত এলাকায়, কোনো খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা রকম কুটির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এই দিনের একটি পুরোনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে থাকে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তি। ঢাকা শহরে পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহ্বান। পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহ্বান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃত পক্ষে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ। ঢাকার বৈশাখী উত্সবে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি আবশ্যিক অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখে সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবণ এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সকল শ্রেণী-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রার জন্য বানানো নয় রং-বেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি। ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের উত্সবের একটি অন্যতম আকর্ষণ। ঈশা খাঁর সোনারগাঁয় ব্যতিক্রমী এক মেলা বসে, যার নাম ‘বউমেলা’। জয়রামপুর গ্রামের মানুষের ধারণা, প্রায় ১০০ বছর ধরে পয়লা বৈশাখে শুরু হওয়া এই মেলা পাঁচ দিনব্যাপী চলে। প্রাচীন একটি বটবৃক্ষের নিচে এই মেলা বসে, যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুজো হিসেবে এখানে সমবেত হয়। বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা পর্যন্ত তাঁদের মনস্কামনা পূরণের আশায় এই মেলায় এসে পূজা-অর্চনা করেন। সন্দেশ-মিষ্টি-ধান-দূর্বার সঙ্গে মৌসুমি ফলমূল নিবেদন করে ভক্তরা। এ ছাড়া সোনারগাঁ থানার পেরাব গ্রামের পাশে আরেকটি মেলার আয়োজন করা হয়। এটির নাম ঘোড়ামেলা। লোকমুখে প্রচলিত জামিনী সাধক নামের এক ব্যক্তি ঘোড়ায় করে এসে নববর্ষের এই দিনে সবাইকে প্রসাদ দিতেন এবং তিনি মারা যাওয়ার পর ওই স্থানেই তার স্মৃতিস্তম্ভ বানানো হয়। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে স্মৃতিস্তম্ভে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে এবং এখানে মেলার আয়োজন করা হয়। এ কারণে লোকমুখে প্রচলিত মেলাটির নাম ঘোড়ামেলা। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নৌকায় খিচুড়ি রান্না করে রাখা হয় এবং আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবাই কলাপাতায় আনন্দের সঙ্গে তা ভোজন করে। সকাল থেকেই এ স্থানে লোকজনের আগমন ঘটতে থাকে।
বৈশাখের রং
বৈশাখ মানে লাল-সাদার মিশেল। বৈশাখ শুধু লালকে ধারণ করে না; বরং পুরো বিশ্বের কাছে আমাদের রঙিন হওয়ার ঐশ্বর্যকে প্রথম মাত্রা দেয়। তাই বহুকাল ধরেই লাল-সাদার ধারাবাহিকতায় এই বৈশাখেও প্রজন্মের দিনটি হোক লালের সম্ভাবনায় উজ্জ্বল, লালের ঐশ্বর্যে সুখময় আর লালের দীপ্তিতে রঙিন। বৈশাখের প্রথম দিনে ঘরে বসে তো আর থাকা যায় না। ভোরের আলো ফুটতেই সাজসজ্জা শুরু হয়। আর বৈশাখ এলেই গায়ে ওঠে পাটভাঙা তাঁতের শাড়ি। লাল ও সাদা তো থাকবেই, সঙ্গে থাকতে হবে অন্যান্য রং। কিংবা অন্য কোনো রঙের শাড়িতে সেজে কপালের টিপ আর হাতের চুড়িটা সবাই লাল পরবেন। অথবা শাড়িতে চাই কোনো বাঙালি মোটিফ। বৈশাখকে ঘিরে তরুণ প্রজন্মের চাহিদার মধ্যে রয়েছে পাঞ্জাবি, ফতুয়া, বৈশাখী শার্ট, গামছাসহ কিছু নতুন ও ব্যতিক্রমী প্রসাধনী সামগ্রী। ফতুয়ায় বাঙালির ঐতিহ্যবাহী ঢোল, একতারার ডিজাইনগুলো এবার কিছুটা ব্যতিক্রম ও নজরকাড়া। আর সেদিকেই ঝুঁকছেন অধিকাংশ ফ্যাশন সচেতন প্রজন্ম। শুধু এই দিনটিতে নয়; বরং প্রাণের টানে আর নিজের ঐতিহ্যের গর্বে নিজস্ব চেতনায় আপনি বাঙালিয়ানাকে ছড়িয়ে দিতে পারেন আপন ঐশ্বর্যে।