চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমানের প্রশ্ন
প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০১৪, ২১:০৭
নদীমাতৃক বাংলাদেশের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে চর এলাকা। এর মধ্যে কোনো কোনো চর মূলভূমির সাথে সংযুক্ত। আবার অসংখ্য দুর্গম চর রয়েছে মূলভূমির সাথে যেগুলো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বাংলাদেশের মোট ভূমির বড় এক অংশ চরভূমি। দেশের প্রায় ৩২টি জেলার শতাধিক উপজেলার অংশবিশেষ চরাঞ্চল। প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষ চরে জীবনব্যাপী বহুবিধ ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করে। চরবাসীর জীবন মানেই অসংখ্য সমস্যায় নিমজ্জিত সংকটময় এক দুরূহ জীবন। ভৌগোলিক বিচার-বিশ্লেষণে দ্বীপচর বাংলাদেশের উচ্চমাত্রার দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। দ্বীপচরগুলো প্রচণ্ডরকম নদী ভাঙ্গনের শিকার। ফলে নিরন্তর দুঃখ-কষ্টের এক বঞ্চনাময় জীবন অতিবাহিত করতে হয় তাদের। অবশ্য এই বঞ্চনা একদিনের নয়, দীর্ঘদিনের। ফসল উত্পাদনের সুযোগ কম থাকা, দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, সরকারি সকল ধরনের মৌলিক সেবার অপর্যাপ্ততা, কর্মসংস্থানের স্বল্পতা, পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড না থাকা, খাদ্যাভাব এবং বহুমুখী দুর্যোগপ্রবণ হওয়ার কারণেই দ্বীপচরে বসবাসরত মানুষকে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়। এ সংগ্রাম জন্মাবধি বললে ভুল হবে না। উত্পাদনমুখী কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় বছরের একটা বড় সময় ধরে কর্মহীনতা দ্বীপচরবাসীর খেয়েপড়ে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে বড় এক অন্তরায়। চরাঞ্চল বাংলাদেশের দরিদ্রতম এলাকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে নানামুখী ঝুঁকির পাশাপাশি সকল প্রকার সরকারি-বেসরকারি সুযোগ-সুবিধার অভাব অপ্রতুলতা কোনো প্রকার অনুসন্ধান ছাড়াই দেখতে পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনধারণে সহযোগিতা করতে নানা ধরনের নিরাপত্তামূলক এবং জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মসূচি পালন করে থাকে। এর প্রতিফলন দেখা যায় জাতীয় বাজেটেও। দুটি অর্থ বছরে (২০০৯-১০ এবং ২০১০-১১) চরের মানুষের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে বরাদ্দ ছিল। চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার সার্বিক মানোন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য ও বিভিন্ন ধরনের দারিদ্র্য বিমোচনমূলক প্রকল্পে ২০০৯-১০ অর্থ বছরে এই বরাদ্দের প্রস্তাবিত পরিমাণ ছিল ১৮১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং ২০১০-১১ অর্থ বছরে প্রস্তাবিত পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৫৪৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। চরাঞ্চলের দারিদ্র্যতা নিরসনে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে ছিল দুর্যোগ মোকাবিলা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে খাদ্য নিরাপত্তামূলক কার্যক্রমের আওতায় বন্যাপ্রবণ ও নদী ভাঙ্গন এলাকায় বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ। এছাড়া চরে বসবাসরতদের জীবন-যাত্রার মান উন্নয়নে ও সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচির মধ্যে চরজীবিকায়ন, আশ্রয়ণ, ন্যাশনাল নিউট্রিশন, ইকোনমিক ইমপাওয়ারমেন্ট, উত্তরাঞ্চলে হতদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান, স্কুল ফিডিং—এসব প্রকল্প উল্লেখ ছিল। এদিকে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাজেট কলেবর বৃদ্ধি পেলেও বণ্টন প্রক্রিয়া সু-সমন্বিত না হওয়ায় তার সুফল দুর্গম চরের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠী পাচ্ছে না। দারিদ্র্যের মাত্রা বা হার অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রদত্ত বরাদ্দ বণ্টন না হওয়ার কারণে মূলভূমির অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি সুবিধার আওতায় আসলেও চরাঞ্চলের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ২০-২৫ শতাংশের বেশি মানুষ এই সুবিধাসমূহ পাচ্ছে না। অথচ মূলভূমির তুলনায় চরাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার বা তীব্রতা অনেক অনেক বেশি। চর এলাকায় মানুষ বসবাস করে নানামুখী সমস্যার মোকাবিলা করে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রথম শিকারও হয় চরের মানুষ। বন্যা, নদীভাঙ্গন, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, প্রচণ্ড শীতসহ সকল প্রকার দুর্যোগে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দুর্ভোগের শিকার হয় এই মানুষগুলো। খাদ্য নিরাপত্তার অভাব অনেক সময় ভয়াবহ রূপে দেখা যায় এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে। দুর্যোগকালীন সময়ে এই দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে। এছাড়াও দুর্গম অঞ্চল হওয়ায় চরের মানুষের কাছে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছায় না। হতদরিদ্র ও অসুস্থ চরের মানুষের পক্ষে প্রায় গড়ে ১৮ কিলোমিটার দূরে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নেয়া সম্ভব হয় না। গর্ভবতী নারী ও নবজাতক শিশুদের প্রয়োজনীয় সেবার ন্যূনতম পরিমাণ তাদের কাছে পৌঁছায় না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপযুক্ত কাঠামোর অভাব, শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, মৌসুমভিত্তিক কার্যক্রমে শিশুদের জড়িত থাকাসহ বিভিন্ন কারণে চর এলাকার সর্বত্র শিক্ষার নাজুক অবস্থা বিদ্যমান। আবার স্কুলের অবস্থান দূরে হওয়ার কারণে চরে প্রচুর শিশু রয়েছে যারা কখনই স্কুলে যেতে পারে না।
এদিকে চর এলাকা সমন্বিত কৃষি উত্পাদনের জন্য খুবই উপযোগী। কিন্তু যে মানুষগুলো এই জমিতে ফসল উত্পাদন করে তাদের কেউই সেই জমির মালিক নয়। জমির মালিক চরে অনুপস্থিত। তারা ক্ষমতাধর কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যারা চর এলাকায় বসবাস না করেও সুবিধাটুকু ভোগ করে। চরের ক্ষুদ্র বর্গাচাষীরা তাদের কাছ থেকে বছরে বিঘা প্রতি তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে বন্দোবস্ত নিয়ে জমি চাষবাস করে। বেশিরভাগ চরের কৃষক এই খরচ বহন করতে না পারায় হয়ে পড়ে বেকার অথবা অভিবাসী শ্রমিক। তারা বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে শহরে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়। চরে নানাবিধ সমস্যার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা (যেমন-পলিযুক্ত কৃষিভূমি, বিস্তীর্ণ গো-চারণভূমি, প্রয়োজনীয় জনশক্তি) রয়েছে যার উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। এরকম আরো শত সম্ভাবনা রয়েছে চরের মানুষ ঘিরে। কিন্তু সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সবার আগে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা।
দ্বীপচরসহ দেশের সমগ্র চরাঞ্চলের উন্নয়নে আলাদা কর্মসূচি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। কেননা দারিদ্র্যপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে চরের মানুষকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় এনে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে চরাঞ্চলের মানুষের জন্য বরাদ্দ সুনির্দিষ্ট সমস্যার আলোকে ও সেই সমস্যার সমাধানে নির্দিষ্ট হতে হবে। আরেকটি জাতীয় বাজেট ঘোষণার সময় আসন্ন। চরের অতিদরিদ্র, অভাবী মানুষরা তাকিয়ে আছে তাদের উন্নয়নে সরকার কি ভূমিকা নেয় তার দিকে। গত অর্থ বছরের বাজেট ঘোষণার আগে মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বেশ কয়েকটি সভায় ঘোষণা করেছিলেন যে, চরের মানুষের উন্নয়নে বাজেটে আলাদা বরাদ্দ প্রদান করবেন। বিশেষ করে মুন্সীগঞ্জে চ্যানেল আই-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত কৃষি ও কৃষকের বাজেট অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী সরাসরি ঘোষণা দিয়েছিলেন চরের মানুষের উন্নয়নে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করা হবে। একইভাবে গত বছরের ১৩ মে চ্যানেল আই-এর “হূদয়ে মাটি ও মানুষ” অনুষ্ঠানের পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীর কাছে কৃষি ও কৃষকের জন্য সুপারিশমালা উপস্থাপনকালেও তিনি একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জাতীয় বাজেটে কোনো ধরনের বরাদ্দ দেয়া হয়নি।
জাতীয় বাজেটে চরের মানুষের জন্য বিশেষ বরাদ্দ না থাকার কারণে দেশের দুর্গম চরাঞ্চলে সেই অর্থে উন্নয়ন হচ্ছে না। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সর্বক্ষেত্রেই চরবাসী পিছিয়ে আছে। তবে কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইডসহ কিছু দাতা সংস্থা চরের অতিদরিদ্রদের উন্নয়নে কাজ করছে। সরকারের পক্ষ থেকে সিএলপি নামেও একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। তবে চরবাসীর সামগ্রিক উন্নয়নে চরে আরো রিসোর্স বাড়ানো প্রয়োজন। এ কথা সর্বাংশে সত্য যে, চরের মানুষকে অবহেলা, অবজ্ঞা করে দেশের উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। উপেক্ষা আর বৈষম্য নয়, চরের মানুষের দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকাতে হবে। চরের অতিদরিদ্র মানুষগুলোকে অবশ্যই মূলধারায় আনতে হবে। জাতীয় বাজেটে চরের মানুষের উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ এখন সময়ের দাবি। আমরা প্রত্যাশা করি আসন্ন জাতীয় বাজেটে চরের মানুষের উন্নয়নের জন্য আলাদা বরাদ্দ প্রদান করা হবে।
লেখক: সদস্য, ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্স ও চেয়ারম্যান,
ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি
kirondebate@gmail.com