মহাসমারোহে এগিয়ে চলেছে নগরীর বর্ষবরণ প্রস্তুতি

আজ ২৪ চৈত্র, নববর্ষের আর মাত্র ছয়দিন বাকি। এরই মধ্যে নগরবাসীর শুরু করা বর্ষবরণ প্রস্তুতি বেশ গতি পেয়েছে। কেনাকাটা, হালখাতা, মেলা আর মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি চলছে মহাসমারোহে। নগরীর বিপণী বিতান আর ফুটপাতের দোকানীরা পসরা সাজিয়ে বসেছেন বৈশাখ সামগ্রীর, চারুকলায় দিনরাত চলছে মঙ্গল শোভাযাত্রার স্ট্রাকচার তৈরি। পুরান ঢাকার দোকানিরা তৈরি হচ্ছেন হালখাতার জন্য। ১লা বৈশাখ সর্বজনীন উত্সব হওয়ায় বাঙালির এই উত্সবের প্রতি প্রীতিও একটু বেশি থাকে। সবাই বলছেন, এ বছর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বর্ষবরণ প্রস্তুতি যেমন ভাল, তেমন এবার কেনাকাটাও জমেছে। তাই নগরের বর্ষবরণ এবার বেশ জমজমাট হবে বলেই ধারণা সকলের। কেনাকাটার ধূম :নগরীর পাইকারী বাজার ইসলামপুরে এক মাস আগে থেকেই বৈশাখের কেনাকাটা শুরু হয় বলে জানান মেসার্স বাগদাদ ট্রেডিং-এর ব্যবস্থাপক আহমেদ খোকন। তিনি বলেন, পাইকারি বাজার হওয়ায় আমরা আগে বেচা-কেনা শুরু করি, যাতে খুচরা বিক্রেতারা কিনে নিয়ে সময়মতো বিক্রি করতে পারে। রোজার পরে এ সময়টায় তাদের বেশ ভাল বিক্রি হয়। প্রতিদিন এক একটি দোকানে সর্বনিম্ন দুই লাখ থেকে পাঁচ-সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। পাইকারি বাজার হলেও অনেকে এখানে খুচরা বিক্রি করে। খুচরা বিক্রির জন্য এই এলাকার টঙ্গ আকারের ফুটের দোকানগুলো বেশি জনপ্রিয়। পয়লা বৈশাখে মেয়েরা সাধারণত শাড়ি পরে থাকে। তাই শাড়ির ব্লাউজ কিংবা যারা সালোয়ার কামিজ তৈরি করে পরতে চান, তারা এরই মধ্যে তা টেইলারে দিয়ে দিয়েছেন বলে জানান গাউসিয়া নূরানি মার্কেটের সোহরাব টেইলার্স-এর সোহরাব মাস্টার। তিনি বলেন, ঘের আলা কামিজ, নরমাল সালোয়ার কামিজ বেশি অর্ডার পড়েছে। গতকাল নিউ মার্কেট-গাউছিয়া এলাকায় শাড়ির দোকানে বেশ ভিড় দেখা যায়। জেসিমুন থেকে শাড়ি কিনলেন মগবাজারের তাহমিনা আক্তার। তিনি বলেন, উত্সব এলে স্বাভাবিকভাবে শাড়ি- কাপড়ের দাম একটু বেড়েই যায়। তারপরেও উত্সবে কেনাকাটায় আনন্দ আলাদা। বুটিক শপে ভিড় : উত্তরার লতিফ এম্পোরিয়ালে স্বদেশির টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের ব্যবস্থাপক মোঃ বায়জিত্ সরকার বলেন, কয়েকদিন ধরেই তাদের বেচাকেনা জমে উঠেছে। এখন গড়ে প্রতিদিন তারা ৫০/৬০টি শাড়ি বিক্রি করেন। বায়জিত্ জানান, গত বছর তিনি গুলশান শাখায় ছিলেন, গুলশানে বিক্রি এরচেয়ে আরও ভাল। তিনি আরও বলেন, বৈশাখে তাদের তাঁতের শাড়িরই বেশি চাহিদা। এই শাড়ির দাম দেড় হাজার থেকে শুরু হয়। বসুন্ধরা দেশীদশের রঙের ব্যবস্থাপক মোঃ জাহাঙ্গীর আলম হীরা বলেন, গত দুই বছরের চেয়ে এই বছর তাদের ক্রেতা বেশি। তারা শাড়ি, সালোয়ার কামিজ, পাঞ্জাবি বেশি বিক্রি করছেন। কেমন ডিজাইন চলছে : ফ্যাশন ডিজাইনার এমদাদ হক বলেন, বৈশাখে আমরা রঙে ও কাপড়ের বুননের উপর বেশি গুরুত্ব দেই। এই সময়টায় গরম থাকে আবার নতুন বছরের উত্সব বলে কথা। এসব বিবেচনা করে বৈশাখের রঙ লাল-সাদার পাশাপাশি, কমলা, মেরুন, গোলাপি, আকাশি, পেস্ট, জাফরান, রাণী গোলাপী, সবুজ, হলুদ প্রভৃতি রঙ প্রাধান্য পায়। সুতির পাশাপাশি এন্ডি সিল্ক, বলাকা সিল্ক, মসলিন, তসর, গরদ, খদ্দর প্রভৃতি কাপড়ে তৈরি হয় পোশাকগুলো। ডিজাইনের ক্ষেত্রে এম্ব্রয়ডারি, এপ্লিক, টাইডাই, ব্লক, স্কিনপ্রিন্ট, কারচুপির কাজসহ নানারকম কাজ করা হয়েছে। এমদাদ হক বলেন, জামদানির চাহিদা বরাবরই ভাল, তাছাড়া মসলিন ও সুতি শাড়ির চাহিদা বেশি। এ বছর ঘেরওয়ালা কামিজের বেশি চাহিদা বলেও তিনি মন্তব্য করেন। চুড়ি-গয়না : বৈশাখের সাজে কাঁচের চুড়ির একটি বিশেষ গুরুত্ব আছে। চারুকলার সামনে বেশ বড় লাইন করে চুড়ি বিক্রি করছেন চুড়িওয়ালিরা। তাদের সংগ্রহে আছে নানা রকম পুঁতি ও মুক্তার মালা। এই সময় সাধারণত মাটি ও ধাতব গয়না মেয়েরা বেশি পরে বলে জানান রঙের ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম । চারুকলায় ব্যস্ততা : চারুকলার শিক্ষার্থীরা ‘জাগ্রত করো, উদ্যোত করো, নির্ভয় করো হে’-কে স্লোগান করে সকলপ্রকার অপশক্তিকে রুদ্ধ করতে দ্রুত প্রস্তুতি নিচ্ছেন বর্ষ বরণের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউটের ডিন অধ্যাপক আবুল বারাক আলবি বলেন, প্রতি বছরই আমরা সমাজের অপশক্তিকে প্রতিহত করতে একটি প্রতিপাদ্য নিয়ে শোভাযাত্রা করি। এ বছর সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে জাগ্রত হয়ে মাথা, হাত উঁচু করে নির্ভয় হওয়ার আহ্বান জানানো হবে মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে। সম্মিলিতভাবে কাজ চলছে চারুকলা ক্যাম্পাসে। কাজের তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত কোহিনূর আক্তার বিথি বলেন, প্রতিদিন আমাদের বিশ/বাইশ হাজার টাকার সরা, পাখি, মুখোশ বিক্রি হচ্ছে। এই ফান্ড দিয়েই আমরা শোভাযাত্রা পরিচালনা করি। তিনি বলেন, সকল শ্রেণি-বিভাগের শিক্ষার্থীরা ভাগে ভাগে কাজ করছেন। এ বছর বারটি স্ট্রাকচার বের করার আশা রাখেন বলে বিথি জানান। মঙ্গল শোভাযাত্রায় তুহিন পাখির উদ্ভাবক তুহিন রায় বলেন, শোভাযাত্রায় নতুন কিছু যুক্ত করার অভিপ্রায় থেকে তিনি পাখি তৈরি করেন। যার নাম হয় তুহিন পাখি। তুহিন পাখির মূল্য ৩০ টাকা থেকে ধরন ও আকারভেদে দুই/আড়াই হাজার টাকা। প্যাঁচা, বাঘসহ নানা রকমের মুখোশ তৈরি করেছেন একদল শিক্ষার্থী। মেলা হচ্ছে : বৈশাখকে কেন্দ্র করে নগরীর অভিজাত এলাকায় চলছে বৈশাখী মেলা। ধানমন্ডির ডাব্লিউভিএ মিলনায়তন, বেলি রোড, মিরপুর নানা জায়গায় চলছে পোশাক, জুয়েলারী ও ব্যবহার্য সামগ্রীর মেলা। কথা হয় ডাব্লিউভিএ মিলনায়তন মেলায় অংশ নেয়া রিতাস ফ্যাশনের রিতার সাথে। রিতা বলেন, মেলা উপলক্ষে তারা পণ্য সামগ্রীর দাম তুলনামূলকভাবে কম রাখেন। মেলায় বিক্রিও ভাল হয়। সালুর ওনার তামান্না ইসলাম জানান, বিভিন্ন উত্সবে তারা মেলা করলেও বৈশাখের মেলায় বেচাকেনা ভাল। হালখাতার প্রস্তুতি : ধোয়া, মোছা, নতুন ব্যবহার্য সামগ্রী কেনা, পুরনো পাওনা-দেনা মিটিয়ে নতুন বছর শুরু করতে হালখাতার প্রস্তুতি শুরু করেছেন তাঁতি বাজার, শাঁখারি বাজার এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ীরা। ঢাকা স্বর্ণ শিল্পী ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক দ্বীনেশ চন্দ্র পাল জানান, তারা পঞ্জিকা অনুযায়ী বর্ষবরণ উত্সব করেন। তাই তাদের পয়লা বৈশাখ একদিন পরে হয়। তারা এই দিনে শিব ও চরক পূজা করেন। শিবের নাচন এই এলাকার বৈশাখের বিশেষ আকর্ষণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।