কবজি-জাদুর পুনর্জন্ম
প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৩৬
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও অস্ট্রেলিয়ার পেস দানবদের ভয়ে পৃথিবী জুড়ে ব্যাটসম্যানদের তখন থরহরি কম্প অবস্থা। এই পেস ব্যাটারির দাপটে বাকি দলগুলোও তখন ভাবতে শুরু করেছে, ক্রিকেট খেলাতে গতিই শেষ কথা। স্পিনের আর বুঝি এখানে কোনো স্থান নেই; লেগস্পিনের তো প্রশ্নই আসে না। ক্রিকেট রোমান্টিকদের জন্য সে এক মহা দুঃসময়। বিল ও’রলি, ক্লারি গ্রিমেটদের সেই তিরিশের দশকের জাদু তখন শুধুই অতীত। সুভাষ গুপ্তে ষাটের দশক পর্যন্ত মশালটা ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু সত্তরের দশকের শেষদিকে চন্দ্রশেখরের সাথে সাথে সেই লেগ স্পিন আসলেই যেন বিদায় নিতে বসলো। লেগস্পিনারদের ফুরিয়ে যাওয়া এবং পেসারদের অসামান্য উত্থান দেখে এই সময় অনেকেই রায় দিয়ে ফেলেছিলেন—আর কখনোই ক্রিকেট মাঠে দেখা যাবে না লেগ স্পিনারের কবজির জাদু। কিন্তু সব কল্পনাকে মিথ্যে করে দিয়ে সত্তর-আশির দশকের শেষদিকেই, পেসারদের দুনিয়াতেই লেগ স্পিনের পুনর্জন্ম ঘটিয়েছিলেন আবদুল কাদির। আবার মাঠে ফিরিয়ে এনেছিলেন সেই জাদু—ফ্লিপার, স্লাইডার, টপস্পিন আর গুগলি!
কাদিরের হাত ধরে যে মরা লেগস্পিন জেগে উঠেছিল, পরের দু’দশকে সেটা শিল্প থেকে ত্রাসে পরিণত করেছিলেন মুশতাক আহমেদ ও শেনওয়ার্ন; তর্কসাপেক্ষে অনিল কুম্বলেও। কিন্তু এই টি-টোয়েন্টির জামানায় এসে আরও একবার মরতে বসেছিল সেই লেগস্পিন।
লেগস্পিনারদের যেহেতু একটু খরুচে হওয়ার অভ্যেস থাকে, একটু বেশি বৈচিত্র্য ছাড়া তারা টিকতে পারেন না; তাই ব্যাটিংয়ের এই রমরমা যুগে দানিশ কানেরিয়ারা আর পারছিলেন না মশালটা ধরে রাখতে। একে তো রান দিয়ে উইকেট কিনে নেয়ার ‘দুর্নাম’ লেগস্পিনারদের, তারপর আবার সে উইকেট পেতে চাই বেশি ক্লোজ-ইন ফিল্ডিং; যেটা আবার এই ছোট দৈর্ঘ্যের ম্যাচে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে ওয়ানডে ক্রিকেটই দিনকে দিন আরও ব্যাটসম্যানদের খেলা হয়ে উঠছে। সেখানে সারাবছর ধরে চলতে থাকা আইপিএল, সিপিএল, বিগ ব্যাশ থেকে বিপিএলের দাপটে টি-টোয়েন্টিতে আর লেগস্পিন টিকে থাকে কি করে!
তাহলে কী এবার সত্যিই হারিয়ে যাবে ক্রিকেটের এই সবচেয়ে শৈল্পিক অস্ত্রটি? আর কী তাহলে মাঠে দেখা মিলবে না কাদির-ওয়ার্নদের!
নাহ। আরও একবার লেগস্পিন ফিরে এলো; প্রবল প্রতাপেই ফিরে এলো।
আরেকজন কাদির, আরেকজন ওয়ার্ন আমরা আবার পাবো কি না, সেটা জানতে তো অপেক্ষা করতেই হবে। তবে এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অন্তত তিনজন লেগস্পিনারের সাফল্য বুঝিয়ে দিলো, এই নিরেট ব্যাটসম্যানদের ফরম্যাটেও করার কিছু আছে তাদের। ‘ব্যাটসম্যানদের খেলা’ বলে স্লোগান তোলাদের বুঝিয়ে দিলেন, লেগস্পিন ফুরিয়ে যায়নি; ফুরায় না।
এবারের টুর্নামেন্টে লেগস্পিনারদের উত্থান বিশ্বজুড়ে ক্রিকেট রোমান্টিকদের মুগ্ধ করে ফেলেছে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ক্রিকেট বিশ্লেষকরা, সাবেক ক্রিকেটাররা নিজেদের মুগ্ধতার কথা বলছেন। ক্রিকইনফোতে সাবেক নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক মার্টিন ক্রো লিখেছেন, ‘এবারের বিশ্বকাপ শুধু নয়, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেরই সেরা উপহার হল, লেগস্পিনারদের এই পুনর্জন্ম।’
এই উত্থানের নায়ক বলা হচ্ছে আসলে তিনজন স্পিনারকে—দক্ষিণ আফ্রিকার ইমরান তাহির, ভারতের অমিত মিশ্র ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্যামুয়েল বদ্রী।
একটু কচকচে পরিসংখ্যান ঘুটে নেয়া যাক। এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে গতকালকের ফাইনালের আগ পর্যন্ত ৬ জন বোলার ১০ বা তার বেশি উইকেট পেয়েছেন; এর তিনজনই হলেন এই তিন লেগস্পিনার। তিনজন মিলে গতকালকের আগ পর্যন্ত ৫৮ ওভার বল করে নিয়েছেন ৩৩ উইকেট; ইমরান ১২টি, বদ্রী ১১টি ও মিশ্র ১০টি। তিন বোলারের মধ্যে ইমরান ও মিশ্র ওভারপ্রতি ৬-এর সামান্য ওপরে করে রান দিয়েছেন। আর বদ্রী দিয়েছেন ওভারপ্রতি ৫.৬৫ রান!
শুধু এই তিনজনই যে ছিলেন, ব্যাপারটা কিন্তু তা নয়। খুবই কাকতালীয়ভাবে হোক, আর অন্য কোনোভাবে; এই টুর্নামেন্টে অনেকগুলো দলই লেগস্পিনার দিয়ে ভাগ্য বদলানোর চেষ্টা করেছে। পরিষ্কার করে বললে, ১৬টি দলের মধ্যে ৮টি দলই কমপক্ষে একজন করে লেগস্পিনার মাঠে নামিয়েছে।
পাকিস্তানের শহীদ আফ্রিদি, অস্ট্রেলিয়ার জেমস মুইরহেড খুব বড় সাফল্য না পেলেও দলগুলো তাদের ওপর ভরসা করেছে। জিম্বাবুয়ের কামুঙ্গোজি, মুশাঙওয়ে বা আফগানিস্তানের সামিউল্লাহ শেনওয়ারি ছিলেন এই তালিকায়। এমনকি হংকংয়ের নিজাত খান বা বাংলাদেশের সাব্বির রহমান রুম্মনও এই লেগস্পিন দিয়ে কিছু করার চেষ্টা করেছেন।
একটা সরল ব্যাপার সবাই বোঝেন যে, বাংলাদেশের চিরায়ত ধীরগতির, নিচু বাউন্সের উইকেট এবং উপমহাদেশের স্পিনসহায়ক কন্ডিশন মিলিয়ে দলগুলোকে এই লেগস্পিনারদের ওপর বাজিটা ধরতে সাহস জুগিয়েছে। তবে শুধু কন্ডিশনের কথা বলে এই উত্থানকে ব্যাখ্যা করতে গেলে সেটা ভুল হবে। এই প্রসঙ্গেই মার্টিন ক্রোকে আরেকবার স্মরণ করা যায়, ‘কন্ডিশন তো একটা ব্যাপার বটেই। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, এই ফরম্যাটে এই লেগস্পিনারদের বল করতে পারার সাহস ও দক্ষতা। সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হল অধিনায়কদের; যারা বিশ্বাস রেখেছে।’
হ্যা, এই বিশ্বাসটাই হল প্রাপ্তি।
এমন নয় যে এই টুর্নামেন্ট দিয়েই আমরা শৈল্পিকমানের কিছু লেগস্পিনার পেয়ে গেছি বা পাবো। বদ্রী, মিশ্র, ইমরানরা নিজেরাই আছেন ক্যারিয়ারের শেষদিকে; ফলে খুব নতুন কিছু পৃথিবীকে দিতে পারবেন, এমন আশা করা কঠিন। আবার এদের কাউকেই মানের দিক থেকে কাদির বা ওয়ার্নের সঙ্গে তুলনা করলে অন্যায় হবে।
তাহলে কী পেলাম আমরা?
এটুকু অন্তত পাওয়া গেল যে, লেগস্পিন করা যায়! এই কথাটা অন্তত তরুণ বোলারদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব এই একটা টুর্নামেন্ট দেখিয়ে। বলা সম্ভব, এই ব্যাটিং যুগ মানেই লেগস্পিন শেষ এটা সত্যি নয়। তাই মার্টিন ক্রোসহ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিশ্বাসটাই হল লেগস্পিনের জন্য এই টুর্নামেন্ট থেকে সবচেয়ে বড় পাওয়া; উইকেটগুলো নয়।
আর আমরা বলতে পারি, এই টুর্নামেন্টের সেরা পাওয়া হল এই ক্রিকেট শিল্পের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাটাই!
খেলোয়াড়দের সম্পর্কে বলা হয়—ফর্ম ইস টেম্পোরারি, ক্লাস ইস পারমানেন্ট। এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দিয়ে লেগস্পিনাররা যেন ঘোষণা করে দিলেন—রেজাল্ট ইস টেম্পোরারি, আর্ট ইস পারমানেন্ট।