আফগান নির্বাচন :শান্তির বাতাবরণের অপূর্ব সুযোগ

গত সাড়ে তিন দশক ধরিয়া রক্তপাত বিধ্বস্ত আফগানিস্তানে শান্তির বাতাবরণ তৈয়ারী হইবার এক ঐতিহাসিক সুযোগ আসিয়াছে। শনিবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ধর্মীয় উগ্রবাদীদিগের যাবতীয় হুমকি উপেক্ষা করিয়া বিপুল সংখ্যায় ভোট দিয়াছে আফগানরা। প্রাথমিক এক হিসাব মতে ১২ মিলিয়ন ভোটারের মধ্যে সাত মিলিয়ন ভোটার এই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করিয়াছেন। আফগানিস্তানে নির্বাচন আদৌ হইতে পারিবে কিনা তাহা লইয়া আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সংশয় ছিল। উগ্রবাদী হুমকির মুখে আফগানরা নির্বাচনের দিন ঘরের বাহির হইবে কিনা তাহা লইয়াই ছিল চিন্তা। কিন্তু নির্বাচনের দিন দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। অচিন্তনীয় মাত্রাতে নির্বাচনে অংশ লইয়া সাধারণ আফগানরা তাহাদের গণতন্ত্র প্রীতির পূর্ণ প্রকাশ ঘটাইল এবং স্বভাবতই আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের প্রশংসা কুড়াইয়া লইল। যুক্তরাষ্ট্র এই নির্বাচনকে “ঐতিহাসিক” আখ্যা দিয়াছে, চীন দেখিতেছে “নূতন এক সূচনা” হিসাবে। ভারত শনিবারের নির্বাচনকে “সালাম” জানাইয়াছে। আর প্রধান প্রতিবেশী পাকিস্তান এই নির্বাচনকে “গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গ্রহণে আফগান জনগণের দৃঢ় প্রতিজ্ঞার প্রমাণ” হিসাবে দেখিতেছে। ভবিষ্যতে অনেক “যদি” অনেক “কিন্তু” এর দেখা মিলিবে; তথাপি এই মুহূর্তটি সংঘাতবিধ্বস্ত আফগানদের উদযাপন করিবার সময়, অভিনন্দিত হইবার সময় বৈকি। নূতন শাসকের জন্য দেশ পরিচালনা করা যে ভয়ংকর এক চ্যালেঞ্জের কাজ হইবে তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। চলতি বত্সরের জুন নাগাদ বহুজাতিক বাহিনী চলিয়া যাইবার পরে উগ্রবাদী প্রতিরোধ কেমন করিয়া করা হইবে তাহা হইবে অন্যতম চিন্তার বিষয়। আবার যুক্তরাষ্ট্র যদি শেষ পর্যন্ত সেনা মওজুদ অব্যাহত রাখিয়া দেয় তাহা হইলে বিরূপ জনমত সামাল দেয়া হইবে আরেক মাথাব্যথার বিষয়। প্রতিবেশী পাকিস্তানের সহিত উগ্রবাদী মদতদান ও সীমান্ত সুরক্ষা বিষয়কে কেন্দ্র করিয়া সৃষ্ট মতবিরোধও নূতন প্রেসিডেন্টকে ভোগাইবে। হামিদ কারজাইয়ের আমলের শেষের দিকে বিশেষত ড্রোন হামলাকে কেন্দ্র করিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সহিত সৃষ্ট শীতল সম্পর্কের ব্যাপারটিও তাঁহাকে মাথায় রাখিতে হইবে। এই সব হিসাব-নিকাশ ছাড়াইয়া সব কিছুর উপরে চলিয়া আসিবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। বর্তমানে আফগানিস্তান বলিতে গেলে কোন একপ্রকারে টিকিয়া আছে পাশ্চাত্য সাহায্যের উপরে। কিন্তু এমন দিন চিরদিন থাকিবে না। জাতীয় আত্মমর্যাদার কথা ভাবিলে এমন দিন চিরদিন টিকিয়া থাকা সঙ্গত নহে। নূতন প্রেসিডেন্টকে আফগানদের বাঁচিয়া থাকিবার পথ বাহির করিতে হইবে। রূঢ় বাস্তবতা এই যে আফগানিস্তান এখন অবধি নিতান্ত কৃষি নির্ভর একটি দেশ অথচ ইহার চাষযোগ্য ভূমির পরিমাণ মাত্র ১২ ভাগ। আর বর্তমানে চাষবাস হয় মাত্র ছয় ভাগ ভূমিতে। এমন এক বাস্তবতাতে, অভ্যন্তরীণ অথবা বহিঃস্থ বিকল্প ব্যতিরেকে প্রায় তিন কোটি মানুষের জন্য আর সব কিছু বাদ দিয়া কেবলমাত্র মুখের খাবারের ব্যবস্থা করা চাট্টিখানি কথা নহে। রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, দেশি-বিদেশি সমীকরণ থাকিবেই। কিন্তু সকল সমীকরণের ঊর্ধ্বের সমীকরণ হইতে হইবে সাধারণ আফগানদের জীবনের নিশ্চয়তা বিধান। ইহা করিতে পারিলে বাকীগুলি সময়ের পরিক্রমাতে একটি সুরাহার দিকে আগাইয়া যাইবে এমন আশাবাদে ঝুঁকি কম। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচন করিতে না পারা হামিদ কারজাইয়ের স্থলে এইবার একজন নূতন মুখের দেখা মিলিবে। প্রথমেই আশা করা যাক যে তাঁহার হাতে আফগান জনগণ কর্তৃক প্রদত্ত ভোট নামক আমানতের খেয়ানত হইবে না। আরও আশা করা যাক যে, তিনি সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদের হাত হইতে মুক্ত করিয়া আফগানদের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ আফগানিস্তান উপহার দিতে সদা সচেষ্ট থাকিবেন।