পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করুন
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০১৪, ২০:৫৫
ভ্যাপসা গরমে এমনিতেই রাজধানীবাসীর প্রাণ ওষ্ঠাগত, যত্রতত্র ফেলিয়া রাখা পচনশীল বর্জ্যের ভয়ানক দুর্গন্ধ সামগ্রিক পরিবেশকে আরও বিষময় করিয়া তুলিয়াছে। শুধু যে ব্যস্ত সড়কে ময়লার স্তূপ জমিয়া আছে তাহাই নহে, রাস্তার উপরেই এলোমেলোভাবে রাখা হইয়াছে মুখখোলা ডাস্টবিনের সারি। তাহাতে পরিবেশই শুধু দূষিত হইতেছে না, সেই সাথে সৃষ্টি হইতেছে যানজটেরও। পথচারীদের পদে পদে বিড়ম্বনার সম্মুখীন হইতে হইতেছে। রাজধানীর প্রায় সর্বত্রই একই দৃশ্য। আর এই অবস্থা যে হঠাত্ করিয়া সৃষ্টি হয় নাই—তাহাও ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। ইতিমধ্যে ডিসিসি বা ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে দুইভাগে বিভক্ত করা হইয়াছে। নিযুক্ত করা হইয়াছে দুইজন প্রশাসক। কিন্তু পরিস্থিতি পূর্ববত্ই রহিয়া গিয়াছে। ক্ষেত্রবিশেষে বিশৃঙ্খলার মাত্রা কিছুটা বাড়িয়াছে বলিয়াও কেহ কেহ মনে করেন। ইহা সুবিদিত যে গ্রীষ্মের দাবদাহে রোগব্যাধির প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। রাজধানী জুড়িয়া জমিয়া থাকা আবর্জনার স্তূপ যে ইহাতে ঘৃতাহুতি করিবে তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। আসন্ন বর্ষা মৌসুমেও এই অবস্থা অব্যাহত থাকিলে এই বর্জ্য পচিয়া-গলিয়া চারিপাশের পানিতে মিশিয়া তাহা যে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকির সৃষ্টি করিবে তাহাতে সন্দেহ নাই।
প্রায় সোয়া কোটি জনসংখ্যা-অধ্যুষিত এই মহানগরীর বিশাল বর্জ্যভাণ্ডারের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা মোটেও সহজ কাজ নহে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গৃহস্থালি ও শিল্পবর্জ্য মিলাইয়া ইহার পরিমাণ দৈনিক প্রায় ৫ হইতে ৬ হাজার মেট্রিক টন। ইহার বাহিরেও আছে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলির সহস্রাধিক মেট্রিক টন অতিশয় বিপজ্জনক বর্জ্য। এই বর্জ্যের একটি অংশ সরাসরি নিক্ষিপ্ত হয় রাজধানীর নদী ও জলাধারগুলিতে। ডিসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের আওতায় সৃষ্ট বর্জ্যের বৃহদংশ অপসারিত হইলেও যাহা থাকিয়া যায়—তাহার পরিমাণও কম নহে। গত দুই দশকে রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যে যথেষ্ট উন্নতি হইয়াছে তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আগে যেইখানে গৃহস্থালি বর্জ্য বিশৃঙ্খলভাবে বাড়ির সম্মুখেই ফেলিয়া রাখা হইত, এখন বাড়ি বাড়ি গিয়া তাহা সংগ্রহ করিয়া এক স্থানে জড়ো করা হয়। বিদেশ হইতে সংগৃহীত বিশেষ ধরনের ময়লাবাহী গাড়িতে করিয়া সেই বর্জ্য ফেলা হয় নির্দিষ্ট স্থানে। কঠিন, তরল বা পচনশীল ও প্লাস্টিকজাত বর্জ্য আলাদা করিয়া তাহা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের কিছু উদ্যোগও নেওয়া হইয়াছে ইতিমধ্যে। কিন্তু দ্রুত সমপ্রসারণশীল ঢাকা মহানগরীর সৃষ্ট বর্জ্যের বিশালতার তুলনায় তাহা যে খুবই অপ্রতুল বিদ্যমান বিশৃঙ্খলাই তাহার সর্বাপেক্ষা বড়ো প্রমাণ। তবে ইহাই যে বিশৃঙ্খলার একমাত্র কারণ নহে—তাহাও বলিবার অপেক্ষা রাখে না।
সমস্যা অনেক। জনবলের সমস্যা আছে, আছে ময়লাবাহী পরিবেশসম্মত যানবাহন ও বহনযোগ্য ডাস্টবিনের অভাব। পাশাপাশি ইহাও লক্ষণীয় যে বর্তমানে যেইভাবে বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই, বোঝাই ও পরিবহন করা হয় তাহা কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ শুধু নহে, সংশ্লিষ্ট পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণও বটে। তবে সর্বাপেক্ষা বড়ো সমস্যাটি নিঃসন্দেহে দায়িত্বহীনতার। কথাটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি নগরবাসীদের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। নিজের শহরটিকে, নিজের পরিপার্শ্বকে পরিচ্ছন্ন রাখা প্রতিটি নাগরিকেরই অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। কিন্তু এই ক্ষেত্রে আমাদের উদাসীনতা প্রকটভাবে দৃশ্যমান। বিগত দশকগুলিতে পরিবেশসম্মত উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অভাবনীয় অগ্রগতি সাধিত হইয়াছে বিশ্বের বহু দেশে। বর্জ্য পরিণত হইয়াছে সম্পদে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি যে আশাব্যঞ্জক নহে—তাহা অনস্বীকার্য। এমনকী ইহার জন্য যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও কর্মোদ্যোগ প্রয়োজন তাহাও খুব একটা দৃশ্যমান নহে। ফলে ইতিমধ্যে আমাদের প্রিয় এই মহানগরটির কপালে অনেক দুর্নাম জুটিয়াছে। ঢাকা যেইভাবে সমপ্রসারিত হইতেছে এবং ইহার জনসংখ্যা যেইভাবে বাড়িতেছে তাহাতে পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এখনই উদ্যোগী না হইলে বিপর্যয় সামাল দেওয়া যে কঠিন হইয়া পড়িবে তাহা না বলিলেও চলে।