পহেলা বৈশাখের মূল বার্তা আমরা ভুলতে বসেছি

এখন কারো খোঁজ নেওয়ার জন্য বা কে কী করছে তার টাটকা খবর পেতে আমরা ফেসবুকে ঢুঁ মেরে নেই! এমনই একটু নজর দিতেই দিন কয়েক আগে দেখি, আমার এক বন্ধু তাঁর বৈশাখের পোশাক আমার ওয়ালে ট্যাগ করেছেন। ছবিতে একজন মডেল লাল-সাদার প্রাধান্য পাওয়া একটা জামা পরে আছে। ছবির ওপরে আমার বন্ধু লিখেছেন, ‘আমার বৈশাখী ড্রেস। চাইলে আপনিও পেতে পারেন।’ খানিকটা হাসি এলো বৈকি! হ্যাঁ পাঠক, হাসি এলো কারণ আমার বন্ধুটি একইসঙ্গে তাঁর পোশাকটির বিপণনও করতে ইচ্ছুক, দেখে! এই ফেসবুকীয় সংস্কৃতিতে আমাদের একটাই পরিচয়—আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের ‘ফ্রেন্ড’! এখানে আর দ্বিতীয় কোনো পরিচয় নেই। আর এই পুরো সমাজটাই একটা বাজার! এই বাজারে আমরা সবাই বিক্রেতা, সবাই ক্রেতা! মাউসের একটা ক্লিকেই আমরা পণ্য ক্রয় করছি, মোবাইলে তার অর্থ পরিশোধ করছি! দোকানের রহিম মামা কিংবা রতন কাকা বলে আমরা কাউকে আর চিনি না। ‘ফ্রেন্ড’ ছাড়া এখন আর কেউ নেই আমাদের! খুব বেশি নয়, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছেই হালখাতা আর মেলা কিংবা হাটকে রূপকথার রূপক বলে মনে হবে! কিন্তু এই পরিবেশ কি আমরাই তৈরি করছি? নিজেদের বর্ণিল সংস্কৃতিকে বিশ্বায়নের ছত্রছায়ায় খাটো করে ফেলছি? নিজেকে অধিকমাত্রায় কর্পোরেটীয় জাল দিয়ে বন্দি করছি? ক্রেতা-বিক্রেতার আর্থিক লেনদেনও যে একটা উত্সব হতে পারে, তা সম্ভবত শুধু এই বাঙালি সংস্কৃতিতেই দেখা মেলে। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সঠিকভাবে খাজনা আদায়ের জন্য মোঘল সম্রাট আকবর ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বাংলা সন গণনা চালু করেছিলেন। নির্দিষ্ট দিনে পুরনো খাজনা মিটিয়ে হিসাব রাখার জন্য খোলা হতো নতুন খাতা। বাকির খাতা শূন্য হওয়ার সুবাদে রাজ দরবার থেকে প্রজাসাধারণকে নানাভাবে আপ্যায়ন করা হতো। মোঘলদের কাছ থেকে এই প্রথা আসে বাঙালির কাছে। লালসালু মোড়া জবেদা খাতায় ক্রেতা-বিক্রেতার আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি লিপিবদ্ধ করা হতো। পাশাপাশি ক্রেতাকে বিনীতভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হতো বকেয়া পরিশোধ করার কথা। ক্রেতা বকেয়া পরিশোধ করতে এলে বিক্রেতা বকেয়া গ্রহণের পাশাপাশি ক্রেতাকে আপ্যায়ন করেন মিষ্টি, ঠান্ডা পানীয় বা পায়েস দিয়ে। দোকানকে উত্সবমুখর করে সাজিয়ে হালখাতার দিন সকালে দোকানে দোকানে আগর বাতি প্রজ্বলন এবং মিলাদ মাহফিল কিংবা পূজার আয়োজন করা হতো। যেন নতুন করে হূদয়ের যোগাযোগ পুনর্স্থাপিত হওয়া। এ যেন ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে ব্যবসাকে ছাপিয়ে গড়ে তুলতো হূদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। অর্থনীতির সঙ্গে যোগাযোগ বা সম্পর্ক কতটা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ছিল তার আরো একটা উদাহরণ মেলা। পুরো বছরের প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করা হতো নতুন বছরের মেলা থেকে। তাই এ মেলাও ছিল বেশ দীর্ঘস্থায়ী। দৈনন্দিন জীবনের রসদ, ঘর-গেরস্থালির যাবতীয় জিনিসপত্রের জন্য এ মেলার ওপর নির্ভরশীল হতে হতো। মেলাকে কেন্দ্র করে গ্রামের ঘরে ঘরে সাড়া জাগতো উত্পাদনের। কৃষিজ দ্রব্য, কুটিরশিল্প, তাঁত শিল্প, বাঁশ-বেত-পাট শিল্প, মৃিশল্প, চারু ও কারু শিল্পের এক বিশাল সমাবেশ ঘটতো মেলায়। পারস্পরিক ভাব বিনিময়, সমপ্রীতি ও ক্রয়-বিক্রয়ের উত্স হিসেবেই উত্পত্তি মেলার। আর আজ আমরা অনেক ব্যস্ত! সারাদিন আমরা হিসাব-নিকাশ করি আমাদের লাভ-ক্ষতির। আমরা ঘটা করে তারিখ নির্ধারণ করে আমাদের ‘বন্ধ’ুর সঙ্গে দেখা করতে হোটেলে যাই। ঘটা করে, কারণ যখন সেই ‘বন্ধ’ুর সঙ্গে আমার লাভ-ক্ষতির অংকে লাভের পরিমাণ বেশি হয়! চিকেন-কফি খেয়ে পরবর্তী মিটিংয়ের তারিখ নির্ধারণ করি। আমরা চুক্তি করি। বাণিজ্যিক চুক্তি। এটাই বিশ্বায়নের কর্পোরেট সংস্কৃতি। আর এটাই আমাদের ফেসবুক-প্রজন্ম। প্রযুক্তি কেড়ে নিচ্ছে সব সম্পর্ক; মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক। অথচ আমাদের অতীতে আয়-ব্যয়, উত্পাদন, জীবিকা সবই প্রকৃতি, সম্পর্ক আর উত্সবকেন্দ্রিক। ‘বৈশাখ’ আমাদের উত্পাদনব্যবস্থায় প্রকৃতি, সম্পর্ক এবং উত্সবের যৌথতার বার্তা দেয়। আমরা ভুলতে বসেছি পহেলা বৈশাখের মূল বার্তাকে। ১৪ এপ্রিল লাল-সাদা পোশাক পরে আমরা পহেলা বৈশাখ পালন করবো। বাঙালি বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে ‘বন্ধু’-র দেওয়া দোকান থেকে উচ্চ দামে পান্তা-ইলিশ কিনে খাবো। এসবই ‘বৈশাখ-বৈশিষ্ট্য’ নিয়ে আমাদের ব্যবসা। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ, চারুকলা ইন্সটিটিউট প্রাঙ্গণ থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা কিংবা এলাকায় এলাকায় ছোট ছোট বৈশাখীমেলাও হবে। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের কারণে শস্য উত্পাদনের বিশেষ এই সময় আমাদের বাঙালি জীবন-জীবিকার জন্য যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, যোগাযোগের বার্তা দিয়ে গেছে তা কি আমরা আমাদের বাস্তবিক দৈনন্দিন জীবনে চর্চা করছি? বিশ্বায়ন মানে নিজেকে বা নিজের সংস্কৃতিকে বিকিয়ে দেওয়া নয়। ঢাকা