মেইনফ্রেম কম্পিউটারের ৫০ বছর

১৯৬৪ সালের ৭ এপ্রিল যাত্রা শুরু করে আইবিএম-এর মেইনফ্রেম কম্পিউটার সিস্টেম ৩৬০। বিশ্বব্যাপী কম্পিউটিংয়ের ধারণাকে পাল্টে দিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সময়ের সাথে সাথে এই মেইনফ্রেম কম্পিউটারের পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হয়েছে গত পরশু। প্রযুক্তি বিশ্বের এখনকার এই অগ্রযাত্রার অন্যতম পথিকৃত্ এই মেইনফ্রেম কম্পিউটারের বিভিন্ন তথ্য নিয়ে লিখেছেন তরিকুর রহমান সজীব কম্পিউটার নামক যন্ত্রটির সাথে আজকের দিনে আর কাউকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। তবে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে বিষয়টি এমন ছিল না। আজ থেকে চার দশক আগে মানুষের হাতে এসে পৌঁছেছে পার্সোনাল কম্পিউটার। এর মাধ্যমে একদম সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের নানা কাজে কম্পিউটার ব্যবহারের পথ প্রশস্ত হয়। তার আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহূত হয়ে আসছিল কম্পিউটার। বিশালাকৃতির সেসব কম্পিউটারকে বলা হতো মেইনফ্রেম কম্পিউটার। পঞ্চাশের দশক থেকেই মেইনফ্রেমের যাত্রা শুরু হলেও ১৯৬৪ সালের ৭ এপ্রিল আইবিএম তাদের ‘সিস্টেমস ৩৬০’ নামের যে মেইনফ্রেম কম্পিউটারটি অবমুক্ত করে, সেটিকেই বলা হয়ে থাকে মূল ধারার প্রথম মেইনফ্রেম কম্পিউটার। ফলে ‘সিস্টেমস ৩৬০’-এর ৫০ বছর পূর্তিকেই মেইনফ্রেমের পাঁচ দশকের পূর্তির সমার্থক হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। সিস্টেম ৩৬০ মেইনফ্রেমের যাত্রা ১৯৫২ সালে আইবিএম প্রথম বাজারে নিয়ে আসে আইবিএম ৭০০/৭০০০ সিরিজের বিশালাকৃতির কম্পিউটার। এর মধ্যে আইবিএম ৭০০ সিরিজের কম্পিউটারগুলোতে ব্যবহার করা হতো ভ্যাকুয়াম টিউব। পরের প্রজন্ম ৭০০০ সিরিজেই প্রথম ব্যবহার করা হয় ট্রানজিস্টর। এর মাধ্যমেই মূলত ইলেক্ট্রনিক ডাটা প্রসেসিংয়ে আইবিএম-এর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পায়। এসব কম্পিউটারের মধ্যে কিছু মডেলকে আলাদা করে তৈরি করা হতো বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য এবং কিছু মডেলকে বাণিজ্যিক কাজের জন্য। উভয় ধরনের কম্পিউটারে একইরকম পেরিফেরাল ব্যবহার করা হলেও এদের ইনস্ট্রাকশন সেট আলাদা ছিল এবং সেই অনুযায়ী এক ধরনের কম্পিউটারের পেরিফেরাল অন্যটিতে ব্যবহার করা যেত না। এসব কম্পিউটারের জন্য পোগ্রাম সফটওয়্যারও তৈরি করত না আইবিএম। মূলত কম্পিউটারের ক্রেতাদেরই সেগুলো তৈরি করে নিতে হতো। এগুলোর ব্যবস্থাপনার পেছনেও আইবিএমকে প্রচুর টাকা ও শ্রম ব্যয় করতে হতো। এসব সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে উঠেই আইবিএম তৈরি করে ‘সিস্টেম ৩৬০’। এটিই প্রথম কম্পিউটার যাকে একইসাথে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা যেত। ছোট-বড় সব ধরনের প্রোগ্রাম অ্যাপ্লিকেশন সমর্থন করত এই সিস্টেমস ৩৬০। ফলে বিভিন্ন কর্মক্ষমতার ভিন্ন ভিন্ন দামের বেশকিছু মডেল বাজারে আনতে সমর্থন হয় আইবিএম। নামকরণ পঞ্চাশের দশক থেকেই আইবিএম কম্পিউটার তৈরি শুরু করলেও ষাটের দশকের শুরুতে তারা এগুলোর মেইনটেন্যান্স নিয়ে ঝামেলায় পড়ে যায়। এ সময় একদম নতুন ধরনের কম্পিউটার সিস্টেম উদ্ভাবনের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে তারা। ১৯৬১ সালে আইবিএম-এর শীর্ষ প্রকৌশলীরা এক গোপন বৈঠকে মিলিত হয়ে এই কম্পিউটারের পরিকল্পনা শুরু করেন। দ্য নিউ ইংল্যান্ডের মোটর হোটেলের এই বৈঠক থেকেই মূলত সিস্টেম ৩৬০ মেইনফ্রেমের ধারণার জন্ম হয়। এরপর থেকেই এটি নিয়ে কাজ শুরু করেন আইবিএম প্রকৌশলীরা। এটি তৈরির পর সব ধরনের কাজেই এর পারদর্শিতা থাকায় একে বলা হতো ‘অল-রাউন্ডার’। এই প্রতীকী রূপ হিসেবে ‘৩৬০ ডিগ্রি’ থেকে ‘৩৬০’ অংশটি নিয়ে যুক্ত করা হয় এর নামের সাথে। আর এভাবেই এই মেইনফ্রেমের নাম হয় ‘সিস্টেম ৩৬০’। সিস্টেম ৩৬০-এর বিভিন্ন মডেল শুরুতে ৬টি সিস্টেম ৩৬০ মেইনফ্রেমের ঘোষণা দেয় আইবিএম। পরে অবশ্য এর ১৪টি মডেল বাজারে আনে তারা। ভিন্ন ভিন্ন কনফিগারেশন নিয়ে এগুলো তৈরি করে আইবিএম। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কমদামী মডেলটি ছিল সিস্টেম ৩৬০ মডেল ২০। এতে ছিল ৪ কিলোবাইট কোর মেমোরি এবং ৮টি ১৬-বিট রেজিস্ট্রার। এর বাইরে মডেল ৪৪ ছিল একটি বিশেষায়িত মডেল যা ডিজাইন করা হয়েছিল বিশেষভাবে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য। এটি রিয়েল টাইম কম্পিউটিং ও প্রসেস কন্ট্রোলে পারদর্শী ছিল। এতে বাড়িত কিছু ইন্সট্রাকশন সেটও ছিল। মিড রেঞ্জের মডেলগুলোর মধ্যে ছিল ৩০, ৪০, ৫০। অন্যদিকে হাই-এন্ড মডেলগুলো ছিল ৬০, ৬২, ৬৭, ৮৫ প্রভৃতি। সিস্টেম ৩৬০-এর আরেকটি বিষেয়ায়িত মডেল নাসার জন্যও তৈরি করা হয়। নাসার প্রথম চাঁদে অভিযানের অ্যাপোলো প্রজেক্টে ব্যবহার করা হয় এই মেইনফ্রেম কম্পিউটার। সিস্টেম ৩৬০-এর ফিচার সিস্টেম ৩৬০’র মাধ্যমে কম্পিউটিংয়ের জগতে কিছু স্ট্যান্ডার্ড গড়ে তুলতে সমর্থ হয় আইবিএম। বিভিন্ন আকারের বিট অ্যাড্রেস নিদের্শের জন্য এর মাধ্যমেই প্রথম ৮-বিট ধারণার বাস্তবায়ন ঘটে। বিট বা ওয়ার্ড দিয়ে মেমোরিকে অ্যাড্রেস করার বদলে এতেই প্রথম ব্যবহার করা হয় বাইট অ্যাড্রেসবল মেমোরি। ৩২-বিট ওয়ার্ডের ধারণাও সফল হয় এর মাধ্যমে। মাইক্রোকোডেড সিপিইউয়ের বাণিজ্যিক ব্যবহার, আইবিএম ফ্লোটিং পয়েন্ট আর্কিটেকচার, নয় ট্র্যাকের ম্যাগনেটিক টেপ প্রভৃতি স্ট্যান্ডার্ডগুলো মূলত সিস্টেম ৩৬০তেই চালু হয়। এর অনেকগুলো এখনও ব্যবহূত হয়ে যাচ্ছে। এর আর্টিটেকচারের মূলে ছিল প্রসেসর, যাতে ছিল ১৬টি ৩২-বিট জেনারেল পারপাস রেজিস্ট্রার ও একটি ৬৪ বিট প্রোগ্রাম স্ট্যাটাস ওয়ার্ড। আরও ছিল মাস্কেবল ও আন মাস্কেবল ইন্টারাপশন, ইন্সট্রাকশন গেট। এর মেমোরি সাবসিস্টেমে ছিল প্রতি বাইটে ৮-বিট, ২৪-বিট অ্যাড্রেসিং। বুটস্ট্র্যাপ প্রসেস, সিস্টেম রিসেট, মৌলিক ডিবাগিং, ইনপুট-আউটপুট অপারেশন প্রভৃতি ফিচারও এটি সমর্থন করত। অপশনাল ফিচারের মধ্যে ছিল বাইনারি কোডের ডেসিমেল ইন্সট্রাকশন, ফ্লোটিং পয়েন্ট ইন্ট্রাকশন, টাইমিং ফ্যাসিলিটি, কি-কন্ট্রোলড মেমোরি প্রটেকশন প্রভৃতি। মডেলভেদে সিস্টেম ৩৬০’র অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে ছিল বেসিক অপারেটিং সিস্টেম/৩৬০, টেপ অপারেটিং সিস্টেম এবং ডিস্ক অপারেটিং সিস্টেম। এর পেরিফেরালের মধ্যে ছিল চেইন প্রিন্টার, অপটিক্যাল ক্যারেক্টর রিডার, ডিরেক্ট অ্যাকসেস স্টোরেজ ডিভাইজ, টেপ ড্রাইভ, পাঞ্চ কার্ড, লাইন প্রিন্টার, পেপার টেপ রিডার, ম্যাগনেটিক ইংক কারেক্টর রিকগনিশন প্রভৃতি। ৫০০ কোটি ডলারের ঝুঁকি ১৯৬২ সালে আইবিএম প্রতিষ্ঠিত কম্পিউটার কোম্পানি হলেও তখন তার রাজস্ব আয় ছিল ২.৫ বিলিয়ন ডলার বা ২৫০ কোটি ডলার। সেখানে সিস্টেম ৩৬০ প্রকল্পের জন্য ৫ বিলিয়ন বা ৫০০ কোটি ডলার বাজেট ধরা হয়। কোম্পানির আয়ের দ্বিগুণ পরিমাণ বিনিয়োগে তখন পিছপা হয়নি আইবিএম প্রেসিডেন্ট থমাস ওয়াটসন জুনিয়র। সেই বাজির ঘোড়া শেষ পর্যন্ত ঠিকই বাজার মাত করে। আর তারপর থেকে পেছনে তাকাতে হয়নি আইবিএমকে। তাদের পরে আরও অনেকেই মেইনফ্রেম তৈরি করলেও সিস্টেমস ৩৬০ তত্কালীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বাজার দখল করে নেয়। সিস্টেমম ৩৬০’-এর অবমুক্তি ১৯৬৪ সালের ৭ এপ্রিল জমকালো এক আয়োজনে সিস্টেম ৩৬০’র সাথে বিশ্ববাসীকে পরিচয় করিয়ে দেন আইবিএম-এর তত্কালীন প্রেসিডেন্ট থমাস ওয়াটসন জুনিয়র। তখন আইবিএম ডাটা প্রসেসিং বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই ডিভাইসকে ‘আইবিএম ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ১৬৫ শহরের লক্ষাধিক ব্যবসায়ী ও গবেষকের উপস্থিতিতে ওয়াটসন জুনিয়র বলেন, ‘কম্পিউটার ডিজাইন ও তৈরিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে সিস্টেম ৩৬০। এক দশকের মধ্যে এই প্রথম আইবিএম কম্পিউটারের মৌলিক আর্কিটেকচারে পরিবর্তন এনেছে। ফলে এটি কম খরচে বেশি উত্পাদনশীলতা বয়ে আনবে। এটি এক নতুন যুগের যাত্রা শুরু করবে। কেবল কম্পিউটারে নয়—বাণিজ্য, বিজ্ঞান, সরকার পরিচালনা—সবক্ষেত্রেই এই যুগের সূচনা হচ্ছে এর মাধ্যমে।’ আধুনিক কম্পিউটিংয়ের সূচনাকারী এই মেইনফ্রেম কম্পিউটার এখনও রক্ষিত রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার কম্পিউটার হিস্টোরি মিউজিয়ামে। আগ্রহীরা চাইলে ঢুঁ মেরে দেখে আসতে পারেন।