মহাকাশের ডাক্তার নাসার ‘রোবোনট’

মহাকাশে মানুষের যাত্রার চার দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে সেই অগ্রযাত্রা এখনও অব্যাহত রয়েছে এবং প্রতিনিয়তই মহাকাশ ভ্রমণে ব্যস্ত রয়েছেন মাহাকাশচারীরা। তবে মহাকাশে এসব মহাকাশচারীর শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি সবসময়ই ভাবিয়ে এসেছে মানুষকে। বিভিন্ন সময়ে তাই মহাকাশ যানে করে ডাক্তারদের পাঠানোও রয়েছে। কিন্তু মহাকাশের অচেনা পরিবেশে ডাক্তাররাও খানিকটা নার্ভাসনেসে ভুগে থাকেন। এবারে সেই সমস্যা থেকে মুক্ত হওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। নাসার টেক্সাসের হউস্টনে অবস্থিত জনসন স্পেস সেন্টারে এমন একটি রোবট তৈরি করা হয়েছে, যেটি মহাকাশে গিয়ে কাজ করবে পুরোদস্তুর একটি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মতো। সাধারণ মানুষের মহাকাশে গেলে যত ধরনের সমস্যা হয়, তার সবগুলো থেকেই স্বাভাবিকভাবেই মুক্ত ‘রোবোনট’ নামের এই ডাক্তার রোবট। মহাকাশেও স্বচ্ছন্দ রোবোনট ২ নাসার তৈরি হিউম্যানয়েড এই রোবটের অন্যতম প্রধান সুবিধা হলো এটি মহাকাশের ‘জিরো গ্র্যাভিটি’তেও সমান দক্ষতায় চলতে এবং অন্যান্য কাজ করতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সব কাজই শেখানো হয়েছে একে। শুধু তাই নয়, নাসা জানিয়েছে রোবোনট ২ মহাকাশে প্রয়োজন হলে জরুরি অপারেশনও করতে সক্ষম। এই রোবট তৈরি করতে নাসার সাথে কাজ করেছে হউস্টন মেথডিস্ট হাসপাতালের একদল ডাক্তারও। তাদেরই একজন ডাক্তার জল্ট গ্যারামি রোবোনটকে অভিহিত করেছেন ‘একইসাথে ডাক্তার এবং নার্স’ হিসেবে। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা ছিল রোবোনটকে একটি দক্ষ টেলিমেডিসিন ডাক্তার হিসেবে তৈরি করা, যাকে প্রয়োজনের সময় যেকোনো স্থান থেকেই ব্যবহার করা যাবে।’ একাধিক রোবোনট মহাকাশে পাঠানোর জন্য একটিমাত্র রোবট তৈরি করেনি নাসা। মূলত রোবোনট সিরিজের আওতায় প্রাথমিকভাবে ৪টি রোবট তৈরি করেছে তারা। এবং এদের একেকটিকে একেক ধরনের কাজে বিশেষভাবে দক্ষ করে গড়ে তোলা হচ্ছে। আর সাধারণ দক্ষতাগুলো থাকছে সব রোবটের মধ্যেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি রোবটকে বিশেষভাবে দক্ষ করে তোলা হচ্ছে মানুষের শরীরে ইঞ্জেকশন পুশ করার জন্য। আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহার করে এটি ডামির ঘাড়ের সঠিক ধমনীটি খুঁজে বের করতে সক্ষম। ডামিতে একদম সঠিক স্থানটিতে ইঞ্জেকশন দিতে শেখার পর এটি মানুষের শরীরেও এমনভাবেই একদম সঠিক স্থানটিতে ইঞ্জেকশন দিতে সক্ষম হবে। বর্তমানে পৃথিবীতেও কিছু কিছু হাসপাতালে পরীক্ষামূলকভাবে সার্জারির কাছে ব্যবহার করা হচ্ছে রোবট। তাই মহাকাশে এদের ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকরী হবে বলেই আশাবাদ এর নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের। বিশেষ করে তাদের নিরাবেগ অবস্থা তাদের অনেক বেশি বিশ্বস্ত করে তুলবে বলেই জানিয়েছে নাসা। আরও কাজে ব্যস্ত রোবোনট নাসা জানিয়েছে শুরুতেই রোবোনটকে মহাকাশে ডাক্তারির কাজে ব্যবহার করছে না তারা। শুরুতে রোবোনট ২কে পাঠানো হয়েছে স্পেস স্টেশনের নিয়মিত কিছু বিষয় মনিটর করার জন্য। নাসার রোবোনট প্রকল্পের প্রধান রন ডিফটলার জানান, এখন মহাকাশ স্টেশনে বাতাসের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা, অপ্রয়োজনীয় ময়লা পরিস্কার করা প্রভৃতি কাজ করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে রোবোনট ২। এ কারণেই আপাতত পুরো গঠনের রোবোনটকে পাঠানো হয়নি। মূল শরীর, হাত আর মাথাসহ পাঠানো হয়েছে রোবোনট ২কে। আর কিছুদিন পরে তার পা পাঠানো হবে। তখন এটি চলাফেরায় সক্ষম হয়ে উঠবে পুরোদমে। সেক্ষেত্রে মহাকাশ স্টেশনের বাইরে গিয়েও নানা ধরনের মেইনটেন্যান্সের কাজ করবে রোবোনট ২। নাসা জানিয়েছে, পৃথিবীতে বসেই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে রোবোনটকে। ল্যাপটপের কিবোর্ড কমান্ড দিয়েই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে একে। সফলভাবে রোবোনট ২-এর যাত্রা মহাকাশে মানুষের যাত্রাকে আরও বেশি সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলবে, তাতে সন্দেহ নেই।