[ ব্য ব সা ]
সামাজিক ব্যবসা কী
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০১৪, ২১:২০
সামাজিক ব্যবসা হচ্ছে এমন ধরনের ব্যবসা যেখানে উদ্যোক্তা বা বিনিয়োগকারী একটি সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যক্তিগত লাভের আশা ছাড়াই বিনিয়োগ করেন। সামাজিক ব্যবসাকে নিজের আয়েই নিজের যাবতীয় ব্যয় মিটাতে হবে। এ ব্যবসাকে সম্প্রসারণ করার জন্য ব্যবসায়ের মুনাফাও পুনঃবিনিয়োগ করা হয়। সামাজিক ব্যবসা লোকসানহীন এমন প্রতিষ্ঠান যা লাভ বণ্টন না করে একটি সামাজিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে উত্সর্গীকৃত।
ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন না করে স্বার্থহীন লক্ষ্যস্থির করে কেউ কি সামাজিক ব্যবসা চালু করতে আগ্রহী হবেন? সামাজিক ব্যবসায়ে বিনিয়োগের টাকাই বা কোত্থেকে আসবে? বিনিয়োগের টাকা সকল স্তরের মানুষের কাছ থেকেই আসবে যেহেতু তারা স্বার্থহীন সামাজিক ব্যবসা চালু করে মানসিক সন্তুষ্টি অর্জন করবেন। অনুদান নির্ভর কর্মসূচির একটি সমস্যা হচ্ছে, এটা সবসময় অন্য কারো সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। এ জাতীয় প্রতিষ্ঠান নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না। কল্যাণমূলক কাজ করতে গিয়ে অনুদান বাবদ যে টাকা খরচ হয়ে যায়, সে টাকা আর ফিরে আসে না। কারণ, টাকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে দাতব্য কর্ম হচ্ছে একমুখী রাস্তা। কিন্তু দাতব্য কর্মসূচিকে যদি সামাজিক ব্যবসায়ে রূপান্তরিত করা যায়, তাহলে তা সামাজিক সমস্যা সমাধানের একটি শক্তিশালী কাঠামোতে পরিণত হয়। কারণ, এখানে বিনিয়োগের টাকা বার বার ব্যবহার করা যায়। অথচ অনুদানের টাকা শেষ হয়ে যায় এক দফায়।
সামাজিক ব্যবসায়ের টাকা অমর। এটাই সামাজিক ব্যবসায়ের শক্তি। সমাজের সদস্যদের জীবনধারায় পরিবর্তন এনে দেয়ার আনন্দ উপভোগ করতে শুধু অনুদান খাতের টাকাই নয় বরং অনেকেই সামাজিক ব্যবসায়ে বিনিয়োগও করবেন। সামাজিক ব্যবসায়ে বিনিয়োগকারীরা শুধু টাকাই বিনিয়োগ করেন না, তাদের সৃষ্টিশীলতা, যোগাযোগের দক্ষতা, প্রযুক্তিগত মেধা, জীবনের অভিজ্ঞতাসহ অনেককিছুই বিনিয়োগ করে পৃথিবীটাকে পাল্টে দিতে।
আমাদের অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলো যদি একবার মানব প্রকৃতির বহুমুখী বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা একদিন পড়বে ব্যবসা দু’ ধরনের হয়: এক. ব্যক্তিগত মুনাফামুখী সনাতন ব্যবসা ও দুই. সমাজকল্যাণমুখী ব্যক্তিগত মুনাফাবিহীন সামাজিক ব্যবসা। বড় হওয়ার পর তারা সিদ্ধান্ত নেবে, কোন্ ধরনের ব্যবসায় তারা বিনিয়োগ করবে। কোন্ ধরনের ব্যবসায় তারা চাকরি করবে। কেউ ব্যক্তিগত মুনাফামুখী ব্যবসায় যাবে, কেউ অধিকতর সুন্দর পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে সামাজিক ব্যবসায়ে জড়াবে। যারা এখনও বিদ্যালয়ের গণ্ডিতে রয়েছে, তারাও সামাজিক ব্যবসায়ের ডিজাইন নিয়ে চিন্তা শুরু করতে পারে। শুধু তাই নয়, সামাজিক ব্যবসা তারা নিজেরাই শুরু করতে পারে।
সামাজিক ব্যবসার ৭টি মূলনীতি :
দারিদ্র্য বিমোচনসহ এক বা একাধিক বিষয় যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও পরিবেশগত খাতে বিরাজমান সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগত মুনাফাহীন কল্যাণকর ব্যবসা এটি।
সকলের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করাই এ ব্যবসার লক্ষ্য।
সামাজিক ব্যবসায় বিনিয়োগকারীরা শুধু তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থই ফেরত পাবে, এর বাইরে কোনো প্রকার লভ্যাংশ নিতে পারবে না।
বিনিয়োগকারী তার বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত নেয়ার পর বিনিয়োগকৃত অর্থের মুনাফা কোম্পানির সম্প্রসারণ কাজে ব্যবহূত হবে।
এ ব্যবসা হবে পরিবেশবান্ধব।
এখানে যারা কাজ করবেন তারা ভালো কাজের পরিবেশ ও চলমান বাজার অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাবেন।
সামাজিক ব্যবসা হবে আনন্দের সাথে ব্যবসা।
সামাজিক ব্যবসায় কী এবং কী নয় :
পুঁজিবাদের তাত্ত্বিক কাঠামোকে সম্পূর্ণতা দিতে হলে আমাদের আরেক ধরনের ব্যবসা এই কাঠামোতে যোগ করতে হবে। ব্যবসার মধ্যে মানুষের বহুমাত্রিক প্রকৃতিকে স্বীকৃতি দিতে হবে। আমরা যদি আমাদের বর্তমান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে “সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান” বলে আখ্যায়িত করি তাহলে আমাদের আলোচ্য নতুন ধরনের ব্যবসাকে আমরা বলতে পারি “সামাজিক ব্যবসা”। উদ্যোক্তারা সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করবেন নিজের ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, সুনির্দিষ্ট কিছু সামাজিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য।
পুঁজিবাদের কট্টর প্রবক্তাদের কাছে এটা রীতিমতো অবমাননাকর মনে হতে পারে। মুনাফা ছাড়া ব্যবসা! এ ধারণাটা পুঁজিবাদের ধর্মতত্ত্বে নেই। তবে এই সত্যটা তারা মেনে নেবেন যে, সকল ব্যবসা কোম্পানি যদি সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনকারী ব্যবসা না-ও হয় তাতে নিশ্চয়ই মুক্তবাজার অর্থনীতির মহাভারত কিছু অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। পুঁজিবাদকে তো উন্নততর করাই যায়। বর্তমানে আমরা যে পথে এগোচ্ছি সে পথে আমরা সামাজিক সমস্যার সমাধান পাচ্ছি না। সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান হতে হবে—এ বিষয়ে জেদ ধরে আর সেটাকেই কোনো এক ধরনের সিদ্ধ সত্য হিসেবে বিচার করে আমরা এমন এক ভুবন গড়েছি যা বহুমাত্রিক চরিত্রের মানবসত্তাকে অগ্রাহ্য করে। সে কারণেই সনাতন ব্যবসা আমাদের সবচেয়ে জরুরি সামাজিক সমস্যাগুলোর প্রতিকারে অক্ষম থেকে যায়।
মানবমনের সত্যিকারের বহুমুখিতাকে আমাদের উপলব্ধি করা দরকার। এটা করতে হলে আমাদের প্রয়োজন নতুন ধরনের এক ব্যবসা যা ব্যক্তিগত লাভের গোলক ধাঁধা ছেড়ে অন্য লক্ষ্যে মনোনিবেশ করে। এ হবে এমন এক ব্যবসা যা সর্বাত্মকভাবে সমাজ ও পরিবেশের সমস্যার সমাধানে নিয়োজিত থাকে।
গড়নের দিক থেকে নতুন এই ব্যবসা প্রচলিত মুনাফামুখী ব্যবসারই অনুরূপ কিন্তু উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। অন্য সব ব্যবসার মতোই এই সামাজিক ব্যবসাতেও লোক নিয়োগ করা হয়, পণ্য/সেবা তৈরি হয়, আর এসব পণ্য বা সেবা প্রদান করা হয় উদ্দেশ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটা মূল্যে। কিন্তু এর নেপথ্যে থাকে এর লক্ষ্য, আর বিচার্য কিছু বিষয়, যার নিরিখে সাফল্যের মূল্যায়ন করা হয়। এর লক্ষ্য হলো: এ পণ্য বা সেবা যাদের জীবনকে স্পর্শ করছে তাদের জন্য বিশেষ একটা কল্যাণ নিশ্চিত করা। এই সামাজিক ব্যবসা অবশ্যই মুনাফা করতে পারে, কিন্তু যারা এতে পুঁজি বিনিয়োগ করেন ও একে সহায়তা দেন তারা এ ব্যবসা থেকে কোনো ব্যক্তিগত মুনাফা নেন না। শুধু তারা নির্দিষ্ট সময় পরে বিনিয়োগকৃত পুঁজির সমপরিমাণ টাকা তুলে নিতে পারেন। সামাজিক ব্যবসা তাই এমন একটা কোম্পানি যা মুনাফাতাড়িত নয়, বরং মানব কল্যাণ তাড়িত, আর তার পেছনে থাকে দুনিয়া বদলানোর কাজে ভূমিকা পালনের একটা অদম্য স্পৃহা।
সামাজিক ব্যবসায় কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়। এটা সকল দিক থেকেই ব্যবসা। সামাজিক উদ্দেশ্য হাসিল করার সাথে সাথে এ ব্যবসাকে তার সকল খরচ তুলে নিতে হয়। এক্ষেত্রে সনাতন ব্যবসার সঙ্গে মিল থাকলেও এই ব্যবসা সনাতন ব্যবসা থেকে ভিন্ন চিন্তায় চলে, কাজও চলে ভিন্নভাবে। এর সাথে দাতব্য প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যের দিক থেকে মিল আছে, কিন্তু কাজের প্রকৃতিতে মিল নেই। আর এ তফাত্গুলোই সামাজিক ব্যবসাকে অন্য ব্যবসা থেকে এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে একেবারেই আলাদা করে তোলে।
আজকের দুনিয়ার বহু সংগঠন সামাজিক সুবিধা সৃষ্টিতে নিয়োজিত। তাদের বেশিরভাগই তাদের কর্মসূচি থেকে কোনো আয় করে না। মুনাফাবিহীন এবং আয়বিহীন প্রতিষ্ঠান ও এনজিওগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যক্তিগত বা দাতা সংস্থার দান, ফাউন্ডেশনের মঞ্জুরি, সরকারি সহায়তা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু তাদের নিজস্ব কোনো বিশেষ আয় থাকে না বলে তারা বাধ্য হয় তাদের সময় ও উদ্যমের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ অনুদানের অর্থ সংগ্রহে ব্যয় করতে।
সামাজিক ব্যবসা এরকম নয়। এ ব্যবসা পরিচালিত ও সম্পাদিত হয় ঠিক মুনাফা অর্জনকারী সনাতন ব্যবসারই মতো, যেমন এর লক্ষ্য থাকে পুরো খরচটাই উঠিয়ে আনা; তবে তাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত থাকে এমন সব পণ্য বা সেবা সামগ্রী তৈরিতে যেগুলো মানুষের জন্য সামাজিক উপকার নিয়ে আসে। এ ব্যবসা যেসব পণ্য বা সেবাপণ্য তৈরি করে তা এমন মূল্যে বাজারজাত করে যাতে করে এর উত্পাদন ও বাজারজাতকরণের সকল ব্যয় পুষিয়ে নিতে পারে অথচ সেগুলো কোনো না কোনো সামাজিক সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করে।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, একটা সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিক্রি করার পণ্য বা সেবাপণ্য কেমন করে সামাজিক সুবিধা দেয়?
এর অসংখ্য উপায় আছে। যেমন ধরুন :
একটা সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত উঁচু গুণমান সম্পন্ন পুষ্টিকর খাদ্যপণ্য খুব কম দামে গরিব ও অভুক্ত শিশুদের জন্য পূর্বনির্ধারিত বাজারে বিক্রি করতে পারে। এ প্রতিষ্ঠানের পণ্য সস্তায় বিক্রি করা যায়। যেহেতু ব্যবসাকে বিলাসবাহুল্যের পণ্যবাজারে অন্য পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় আসতে হয় না তাই এই পণ্যের জন্য নজরকাড়া দামি মোড়কের দরকার হয় না। ব্যয়বহুল বিজ্ঞাপনেরও দরকার হয় না। আর এই প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ মুনাফা করার বাধ্যবাধকতায়ও থাকে না।
একটা সামাজিক কোম্পানি স্বাস্থ্যবীমা বাজারজাত করে তার মাধ্যমে গরিবের সাধ্যের মধ্যে চিকিত্সা সেবা প্রদান করতে পারে।
একটা সামাজিক ব্যবসা নবায়নযোগ্য সৌরবিদ্যুত্ যুক্তিসঙ্গত দামে পল্লী জনপদের গ্রাহক, যাদের অন্য কোনোভাবে বিদ্যুত্ পাওয়ার উপায় নেই, তাদের কাছে বিক্রি করতে পারে।
একটা সামাজিক ব্যবসা কোম্পানি আবর্জনা, পয়ঃবর্জ্য ও অন্যান্য ফেলনা দ্রব্যকে (যা অন্যথায় দরিদ্র এলাকায় কিংবা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন মহল্লায় দূষণ করে) পুনঃচক্রায়িত করার কাজে লাগাতে পারে।
উল্লিখিত প্রতিটি ক্ষেত্রে বা আরও অনেক ধরনের সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব যার পণ্য বা সেবা বিক্রি করে মুনাফা হবে আর একইসাথে গরিব ও বৃহত্তর জনসমাজও উপকৃত হবে।
তবে যদি সামাজিক উদ্দেশ্যতাড়িত কোনো কোনো প্রকল্প তার পণ্য বা সেবার জন্য এমন একটা দাম বা ফি ধার্য করে যার মাধ্যমে পুরো উত্পাদন খরচ উঠিয়ে আনা কখনো সম্ভব হবে না, তাহলে সেটা আর যা-ই হোক সামাজিক ব্যবসা হবে না। এ রকম প্রকল্প বা ব্যবসা তার লোকসান পোষানোর জন্য ভর্তুকি বা দানের ওপর চিরনির্ভরশীল থাকবে। ফলে তাকে দাতব্য প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিতে ফেলতে হবে। কিন্তু একবার যদি এরকম প্রকল্প, স্থায়ীভাবে তার ব্যয় পুরোপুরি ওঠাতে সক্ষম হয় তাহলে ওটা সমাজিক ব্যবসার শ্রেণিতে উন্নীত হবে।
কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগের পুরো খরচ উঠে যাওয়ার ঘটনাটা অর্থাত্ ব্রেক-ইভেনে পৌঁছা, এমন এক আনন্দদায়ক মুহূর্ত যা নিয়ে রীতিমতো উত্সব করা যায়। সামাজিক লক্ষ্য তাড়িত কোনো প্রকল্প একবার পরনির্ভরতার নিম্নাভিমুখী মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টান কাটিয়ে উঠতে পারলে সেটা মহাশূন্য পাড়ি দেয়ার জন্য তৈরি হয়ে যায়। এ ধরনের প্রকল্প স্বনির্ভর, প্রবৃদ্ধি ও প্রসারের সম্ভাবনায় হয়ে উঠে সমুজ্জ্বল। সামাজিক ব্যবসার সংখ্যা ও পরিধির বৃদ্ধি মানে সামাজিক কল্যাণ ও সমৃদ্ধির বৃদ্ধি।
আগেও উল্লেখ করেছি যে, সামাজিক ব্যবসার পরিকল্পনা ও পরিচালনায় সনাতন ব্যবসার সঙ্গে অনেক মিল পাওয়া যাবে। এতে পণ্য, সেবা, গ্রাহক, বাজার, খরচ ও রাজস্ব সবই আছে—নেই সর্বাধিক মুনাফা করার নীতি, যার স্থলাভিষিক্ত হয় সমাজ কল্যাণের নীতি।
কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান, এনজিও বা কোনো মুনাফাবিহীন এবং আয়বিহীন প্রতিষ্ঠানের সাথে সামাজিক ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে আরও একটি সনাতন ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মতোই। সামাজিক ব্যবসার মালিকরা তাদের বিনিয়োগের টাকা তুলে নিতে পারে এবং মালিক হিসেবে বহাল থাকতে পারে। সামাজিক ব্যবসার এক বা একাধিক মালিক থাকতে পারে। সামাজিক ব্যবসা সরকারি, বেসরকারি বা দাতব্য কিংবা সকল রকমের মিশ্র মালিকানাতেও চলতে পারে।
সনাতন ব্যবসার মতোই সামাজিক ব্যবসা অনির্দিষ্টকালের জন্য লোকসান গুনতে পারে না। তবে এ ব্যবসায় কোনো মুনাফা হলে সেটা এ ব্যবসায় পুঁজি বিনিয়োগকারীদের হাতে ফিরে যায় না। পুঁজি বিনিয়োগকারী শুধু যে পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন সেটা ফেরত নিতে পারেন। এর বেশি কোনো টাকা লভ্যাংশ হিসেবে নিতে পারবেন না। সামাজিক ব্যবসায়ে যে মুনাফা হয় সেটা বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে না দিয়ে ব্যবসায়ে পুনঃনিয়োগ করা হয়। পরিশেষে এই মুনাফা আসলে যায় উদ্দিষ্ট উপকারভোগীদের হাতে সুলভ পণ্য, উন্নততর সেবা ও আরও সহজপ্রাপ্যতার আকারে।
সামাজিক ব্যবসায়ে মুনাফা করাটা গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কোনোভাবে ক্ষুণ্ন না করেও দুটি কারণে সামাজিক ব্যবসাকে মুনাফা করতে হবে। কারণ দুটি হলো: প্রথমত, বিনিয়োগকারীদের পুুঁজি ফিরিয়ে দিতে আর দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে নিয়োজিত থাকার জন্য।
একটা সনাতনী সর্বোচ্চ মুনাফামুখী ব্যবসার মতোই সামাজিক ব্যবসার জন্যও একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থাকা দরকার। সামাজিক লক্ষ্য অর্জনের প্রেরণায় এবং খরচ পুষিয়ে নেবার প্রেরণায় সামাজিক ব্যবসা তার কর্মতত্পরতার দিগন্ত নানাভাবে প্রসারিত করতে পারে। এটা করা যেতে পারে নতুন ভৌগোলিক এলাকায় ব্যবসা সমপ্রসারিত করে, উত্পাদিত পণ্যসামগ্রী বা প্রদত্ত সেবার পরিসর বাড়িয়ে বা মান উন্নত করে, গবেষণা ও উন্নয়ন প্রয়াস বাড়িয়ে দিয়ে, উত্পাদন দক্ষতা বৃদ্ধি করে, নতুন নতুন প্রযুক্তি প্রবর্তন করে এবং বিপণন বা সেবা প্রদানের বেলায় উদ্ভাবনী পদ্ধতি ব্যবহার করে। এভাবে সুলভ মূল্যে পণ্য ও সেবা নিয়ে দরিদ্রতর ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোও সহজ হয়।
অবশ্য সামাজিক ব্যবসার মূলকথা হলো, কোনোরকম লোকসান না দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা ও একইসাথে জনসাধারণ ও গোটা পৃথিবীর সেবা করা, বিশেষ করে যারা সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত তাদের সর্বোত্তম উপায়ে সেবা করা।
সামাজিক ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগের টাকা ফিরে পেতে কতো সময় লাগবে-এমন প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, সামাজিক ব্যবসায়ের বিনিয়োগ প্রস্তাবপত্রে কী মেয়াদে বিনিয়োগ ফিরিয়ে দেয়া হবে তার সুনির্দিষ্ট উল্লেখ থাকতে পারে। এটা পাঁচ, দশ বা বিশ বছরও হতে পারে।
সামাজিক ব্যবসায়ে বিনিয়োগের তহবিল একবার হাতে ফেরত আসার পর বিনিয়োগকারীরা ঠিক করতে পারেন এই তহবিলটা নিয়ে তারা কী করবেন। এ মূলধন হয় তারা একই সামাজিক ব্যবসায়ে আবার বিনিয়োগ করতে পারেন, নয় আরেক সামাজিক ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করতে পারেন, এমনকি হয়তো মুনাফামুখী ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে পারেন, কিংবা ঐ অর্থ তাদের ব্যক্তিগত কাজে ও উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারেন। এটা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ব্যাপার।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, কেন বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থ সামাজিক ব্যবসায়ে নিয়োজিত করবে? মোটামুটি বলতে গেলে বিষয়টা এরকম: মানুষ যে সন্তুষ্টির জন্য অর্থ বা সম্পদ দান করে সে ধরনের ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি সামাজিক ব্যবসা থেকেও পেতে পারে। আর বলাবাহুল্য এ সন্তুষ্টি আরও অনেক বেশিই হতে পারে; কেননা যে কোনো দাতব্য কর্মে প্রদত্ত দানের টাকার মতো একবার কাজ করে এর কার্যক্ষমতা থেমে যাবে না বরং সমাজের আরও বেশি লোকের উপকারের জন্য একটা কাজ করেই চলবে। গোটা বিশ্ব জুড়ে মানুষ ফি বছর শত শত কোটি ডলার দান করে দাতব্য উদ্দেশ্যে। তারা আরও মানুষের উপকারের জন্য এমনিভাবেই অর্থ দিতে উদ্গ্রীব। তবে সামাজিক ব্যবসায়ে বিনিয়োগের সাথে এর বিশাল পার্থক্য রয়েছে।
প্রথমত, সামাজিক ব্যবসায়ে কেউ একজন যে ব্যবসা গড়ে তা স্বনির্ভর। প্রতি বছর ঐ ব্যবসায়ে নতুন করে টাকা ঢালার দরকার নেই। সামাজিক ব্যবসা স্বচালিত, সে নিজেকে টিকিয়ে রাখে, নিজেই সমপ্রসারিত হয়। এ ব্যবসার পত্তন একবার হওয়ার পর নিজেই বাড়ে, আর নিয়ে আসে আরও বেশি সামাজিক উপকার।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক ব্যবসায়ে যারা বিনিয়োগ করেন তারা তাদের টাকা ফেরত পান। তারা ফেরত পাওয়া অর্থ একই অথবা ভিন্ন সামাজিক ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করতে পারেন। আর এভাবে একই মূলধনের অর্থ সমাজের জন্য আরও উপকার আনতে পারে।
সামাজিক ব্যবসা এমন একটা ব্যবসা যেখানে উদ্যোক্তা তার দক্ষতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে পারেন। এ ব্যবসায়ে বিনিয়োগকারীরা তাদের মূলধন ফিরে পাবার পরও তিনি এর মালিক থেকে যান ও এর ভবিষ্যত্ কর্মপন্থাও নির্ধারণ করেন। এ কারণে নিজ স্বকীয়তা ও সৃষ্টিশীলতা বিকাশের সুযোগ সামাজিক ব্যবসাকে আরো রোমাঞ্চকর করে তোলে।
(আগামীকাল শনিবার সমাপ্য)