বাজেটে সামাজিক খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হইবে
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৪, ২১:২৬
২০১৪-১৫ অর্থবত্সরের বাজেট প্রণয়নের কাজ দ্রুত গতিতে চলিতেছে। অর্থমন্ত্রী অর্থনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সহিত এই বিষয়ে মতবিনিময় শুরু করিয়া দিয়াছেন। সম্প্রতি এই প্রসঙ্গে তিনি বলিয়াছেন যে, বর্তমান সরকারের মেয়াদে বাজেটের আকার বৃদ্ধি পাইয়া তাহা বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলের বাজেটের পরিধির তিন গুণ হইবে। যাহা ২০০৯-১৪ মহাজোট সরকারের আমলে দ্বিগুণ হইয়াছিল। বাজেটের আকার যে দ্রুত বাড়িতেছে তাহা নিয়া কোন সন্দেহের অবকাশ নাই। কর ফাঁকির হাজার হাজার ঘটনার পরেও দ্রুত প্রবৃদ্ধি হইতেছে কর আয়ের। আর এই কারণেই বাজেটের দ্রুত আকার বৃদ্ধি সম্ভব হইতেছে। প্রশ্ন হইতেছে এই ক্রমবর্ধিষ্ণু বাজেটের সুবিধা কতটা পাইতেছে জনসাধারণ। সাধারণ জনগণ সরকারের বাজেট ব্যয় হইতে নানাবিধ উপায়ে সুবিধা পাইয়া থাকে। তবে খাত-ওয়ারী হিসাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর কৃষির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সর্বাধিক সুবিধা পাইয়া থাকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে। অনাকাঙ্ক্ষিত হইলেও এই কথা সত্য যে, বাজেটের আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে এই সকল খাতে আনুপাতিক হারে বরাদ্দ না বাড়িয়া বরং কমিয়া যাইতেছে। সর্বসাকুল্যে বরাদ্দ বাড়িতেছে বলিয়া এই সকল খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বুলি আওড়াইয়া যাইতেছে সরকার। ২০১২-১৩ অর্থ বত্সরে স্বাস্থ্য খাতের ৪.৮২ শতাংশ বরাদ্দ ২০১৩-১৪ সালে ৪.২৬ শতাংশে নামিয়া আসে। ২০১৩-১৪ অর্থ বত্সরে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় বরাদ্দ রহিয়াছে বাজেটের ১১.২৮ শতাংশ যাহা ২০১০-১১ অর্থবত্সরে ছিল ১৪.৩৩ শতাংশ। সরকার মানব সম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করিলেও বাজেটের বরাদ্দ বিবেচনায় নিলে তাহার আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তেমনি অবস্থা দেখা যায় কৃষিতে বরাদ্দের ক্ষেত্রেও।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়া বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা ও পূর্বাভাস সংস্থার যে সব আশাবাদ শুনা যাইতেছে তাহার বেশিরভাগই আমাদের ক্রমবর্ধিষ্ণু শ্রমশক্তির সদ্ব্যবহারের উপর নির্ভর করিতেছে। আমাদের এই শ্রমশক্তিকে দক্ষ ও কর্মক্ষম হিসাবে গড়িয়া তুলিতে হইবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মত গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কোন বিকল্প আমাদের হাতে নাই। একজন শিশুকে যথাযথভাবে মাতৃগর্ভ হইতে পরিচর্যার মাধ্যমে ভূমিষ্ঠ গ্রহণের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করিতে হইবে এবং তাহার পর হইতে তাহার বাড়িয়া উঠিবার কালে তাহার জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে হইবে। পাশাপাশি তাহাকে সঠিক কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে বিশ্ববাজারের জন্য তৈরি করিতে হইবে। তবেই নূতন শ্রমশক্তির সঠিক ও সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হইবে। তবেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত উন্নততর জাতীয় আয় সম্পন্ন জাতি গঠিত হইবে। সেই কারণেই বিশ্বব্যাংক হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো সামাজিক খাতগুলির উপর ক্রমবর্ধমান জোর দিয়া যাইতেছে। এই কথা সত্য যে, সরকারি বরাদ্দের একটা অংশ দুর্নীতির কারণে অপচয় হইয়া যায়। কিন্তু বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে এই ধরনের অপচয় রোধ করা তাত্ক্ষণিকভাবে সম্ভব না হইলেও এই অপচয় মাথায় রাখিয়াই এই সকল খাতে বরাদ্দ বাড়াইতে হইবে। দীর্ঘমেয়াদে এই কাঠামোগত দুর্নীতি দূর করিবার চেষ্টাও করিতে হইবে। তবে বাজেটের আকার বাড়িবার সাথে সাথে সেই বর্ধিত আকারের বাজেটের সুফল আপামর জনসাধারণ পাইতেছে কি না তাহার প্রতিও সরকারের দৃষ্টি রাখিতে হইবে।
ক্রমবর্ধিষ্ণু তরুণ জনশক্তির অনেকেরই প্রথম কর্মসংস্থান হয় কৃষিখাতে। এই কৃষিখাতকে সচল ও গতিশীল রাখিতে হইলে এই কৃষিতে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। কিন্তু কৃষিখাতের বরাদ্দ আনুপাতিক হারে না বাড়িলে তাহা আমাদের তরুণ শ্রমশক্তির নূতন কর্মসংস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করিবে বৈকি!