জঙ্গিবাদ মুক্ত অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়

নতুন বছরে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক হায়াত্ মামুদ বলেছেন, স্বাধীনতাবিরোধী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর শক্তির উত্স নির্মূল করে দেশকে একটি অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সোমবার বাংলা নববর্ষ বরণ উপলক্ষে বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে একক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। তবে বাংলা একাডেমিতে সকাল সাড়ে ৭টায় বর্ষবরণ সঙ্গীত— ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো...’ গানের মধ্যদিয়ে নববর্ষের অনুষ্ঠান শুরু হয়। একাডেমির নজরুল মঞ্চে অনুষ্ঠিত একক বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি এমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। স্বাগত ভাষণে শামসুজ্জামান খান বলেন, বাঙালি তার নববর্ষ উত্সবকে শত শত বছর ধরে নানা বৈশিষ্ট্যে ও বৈচিত্র্যে পালন করে আসছে। এ উত্সব আমাদের বাঙালিত্ব ও জাতিসত্ত্বার চেতনাকে পুষ্ট করে চলেছে। বাঙালির সৌন্দর্যবোধ, স্বকীয়তা ও সংগ্রামের উপাদানে সমৃদ্ধ বাংলা নববর্ষ উত্সব বাঙালিত্বের বিকাশকে অব্যাহত রেখেছে। অধ্যাপক হায়াত্ মামুদ বলেন, সকল ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ও ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে আজও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে প্রায়ই নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এমনকি আজও স্বাধীন বাংলার মাটিতে এমন মানুষের অস্তিত্ব রয়েছে যারা পাকিস্তানের পরাজয়কে মেনে নিতে পারেনি এবং সেই পরাজয়কে স্মরণ করে তারা অশ্রু বিসর্জন দেয়। আর পাকিস্তান আমলে আমাদের মনে যে ভারতবিরোধিতার বীজ বুনে দেয়া হয়েছিলো তা আজও লালন করে চলেছি। যে কারণে স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের অবদানকে স্বীকার করে নিতে আমরা কুণ্ঠিত হই। অথচ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভাষাগত দিক থেকে আমরা ভারতীয় সংস্কৃতি ও ভাষার অত্যন্ত কাছাকাছি। তিনি ভাষার ব্যবহারে প্রমিত বাংলার অপরিহার্যতা তুলে ধরে বলেন, জাতীয় জীবনে মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই শুরু হয়েছিল ৫২-র ভাষা আন্দোলন যার ফলে নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছিলেন তা আমরা আজও পূরণ করতে পারিনি বলেই স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিগুলো আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, বাংলা ভাষাকে বর্তমানে যেভাবে তার ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ব্যবহার করার প্রয়াস চলছে এটি উদ্বেগের বিষয়। ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সকলকে সচেতন হয়ে শুদ্ধ ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলা ভাষার ঐতিহ্য ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন লায়লা আফরোজ ও এসএম মাহিদুল ইসলাম। সুজিত মোস্তফার পরিচালনায় ‘নজরুল সঙ্গীত শিল্পী পরিষদ’ ও মুনমুন আহমেদের পরিচালনায় ‘রেওয়াজ পারফরমারস স্কুল’ গান ও নৃত্য পরিবেশন করে। এছাড়া সঙ্গীত পরিবেশন করেন মহিউজ্জামান চৌধুরী, আবুবকর সিদ্দিক, রোকাইয়া হাসিনা, আবদুল হালিম খান এবং শহীদ কবীর পলাশ। কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর রমনা বটমূলে যখন সুরের মূর্ছনার লায়ের মধ্যদিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নিচ্ছিলেন ছায়ানটের শিল্পীরা, তখন কেন্দ্রীয় খেলাঘরের ক্ষুদে শিল্পীরাও রঙিন পোশাকে জড়ো হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায়। উদ্দেশ্য বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানানো। ‘শিশুদের বৈশাখ বরণ’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে ক্ষুদে শিল্পীরা কবিতা আবৃত্তি, গান আর নাচের মূর্ছনায় করেন উপস্থিত দর্শকদের। অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় খেলাঘরের সভাপতি অধ্যাপক মাহফুজা খানম। তিনি জানান, দেশব্যাপী খেলাঘরের বন্ধুরা দেয়ালিকা অঁঙ্কন করে এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। সকল বন্ধুর জন্য শুভেচ্ছা উপহার থাকলেও দেয়ালিকার বিষয়বস্তু ও নান্দনিক দিক বিবেচনা করে ক্রমানুসারে তিনজনকে পুরস্কৃত করা হয়। এবছর প্রথম হয়েছে ‘ভাষা’ মেঘ রোদ্দুর খেলাঘর আসর, দ্বিতীয় হয়েছে ‘কল্পক’ সহযাত্রী খেলাঘর আসর, তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে ‘শব্দগুচ্ছ’ বন্ধন খেলাঘর আসর। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন, শিশুদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা জাগ্রত করতে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ আজকের শিশুই আগামীদিন রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। অসাম্প্রদায়িক হতে পারলেই তারা পৃথিবীকে হিংসা মুক্ত, বিদ্বেষ মুক্ত আর সম্প্রীতিতে ভরিয়ে তুলবে।