ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস
প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৪৮
আজ ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে আজি হইতে ৪৩ বত্সর আগে, ১৯৭১ সালের এইদিনে, বর্তমান মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলায় যেই প্রবাসী সরকার গঠিত হইয়াছিল তাহাই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী মুক্তিকামী বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, আওয়ামী লীগের দুই প্রবীণ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি (পরে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি) এবং তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী করিয়া এই সরকার গঠিত হইয়াছিল। চরম অনিশ্চিত ও সংকটাকীর্ণ সেই সময়ে এই সরকার শুধু যে দিশাহারা জাতিকে সর্বতোভাবে সাহস ও ভরসা জোগাইয়াছে তাহাই নহে, নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সফলভাবে নেতৃত্বও দিয়াছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের। দীর্ঘ নয় মাসের সেই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ক্যানভাস শুধু যে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের ভিতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না— তাহা না বলিলেও চলে। দৃশ্য-অদৃশ্য সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করিয়া এই সরকারের নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দেশ হানাদারমুক্ত হইয়াছে। বিশ্বের মানচিত্রে সগৌরবে স্থান করিয়া লইয়াছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই জনপদের অধিবাসীদের জীবনে এমন মাহেন্দ্রক্ষণ যে ইতঃপূর্বে আর আসে নাই তাহা কে না জানে। আর এই ঐতিহাসিক অর্জনের দীর্ঘ রক্তাক্ত পথযাত্রায় এই দিনটি যে অনন্য এক মাইলফলক হইয়া থাকিবে তাহাতে সন্দেহ নাই।
ইহা বলিতেই হইবে যে, এই মাহেন্দ্রক্ষণটি একদিনে সৃষ্টি হয় নাই। ইহার পিছনে দীর্ঘ ইতিহাস আছে। আছে বীরোচিত সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের অজস্র উদাহরণ। মোটা দাগে বলা যায়, বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়া আশাহত বাঙালির যেই আত্মজাগরণ ও নবযাত্রার শুভ সূচনা হইয়াছিল, চুয়ান্নোর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছেষট্টির ছয়দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও সত্তরের নির্বাচনের মতো নানা চড়াই-উত্রাই অতিক্রম করিয়া তাহাই স্বাধীনতার মহাসমুদ্রে আসিয়া আছড়াইয়া পড়িয়াছিল। একাত্তরের সাতই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বিশ্ববাসী তাহার প্রতিধ্বনি শুনিয়াছে। পঁচিশে মার্চের পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতম গণহত্যাও স্বাধীনতার মন্ত্রে জাগিয়া উঠা জনসমুদ্রের সেই গর্জনকে স্তব্ধ করিতে পারে নাই। বলা বাহুল্য যে, মুজিবনগর সরকার ছিল ইহারই ধারাবাহিকতা বা অনিবার্য পরিণতি মাত্র। এই ধারাবাহিকতারই অংশ হিসাবে ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল মুজিবনগরে ঘোষিত ও জারিকৃত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে’ সেই সরকারের যৌক্তিকতা ও রূপরেখা তুলিয়া ধরা হইয়াছিল সুস্পষ্টভাবে। যেই কথাটি না বলিলেই নয় তাহা হইল, স্বাধীনতার প্রায় অসম্ভব স্বপ্নকে সফল করার লক্ষ্যে জাতির এই যে অপ্রতিরোধ্য যাত্রা ও জাগরণ— হাজার বত্সরের ইতিহাসে যাহার তুলনা বিরল— তাহা সম্ভব হইয়াছে বঙ্গবন্ধুর জাদুকরী নেতৃত্বের কারণে। এমনকী তিনি যখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন— তখনও তাঁহার নামেই পরিচালিত হইয়াছে মুক্তিযুদ্ধ। তিনিই ছিলেন সমগ্র জাতির সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা, সাহস ও প্রেরণার উত্স। এই কারণেই বৈদ্যনাথতলা রূপান্তরিত হইয়াছে মুজিবনগরে। সর্বোপরি, বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি সূর্যের মতো এতোটাই দীপ্যমান যে, এই সত্য অনুধাবন করিবার জন্য কোনো দলিল-দস্তাবেজের প্রয়োজন পড়ে না।