[ অ র্থ নী তি ]

নিজেদের দায়িত্ব পালনে বিদেশিদের চাপ লাগে কেন?

বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলো পশ্চিমা দেশগুলোর প্রধান প্রধান ব্র্যান্ডের পোশাক সরবরাহ করে। যেমন- মার্কস এন্ড স্পেন্সার, টেসকো, গ্যাপ, ওয়ালমার্ট ইত্যাদি প্রথমসারির পোশাক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন মজুরির এই দেশ থেকেই পোশাক ক্রয় করতে আগ্রহী। ওয়ালমার্ট ও ফ্রান্সভিত্তিক কেরফোর বিশ্বব্যাপী তাদের পণ্যের দাম ও মজুরি কম রাখতে লিয়াজোঁকারী নিয়োগ করে। এই দুই প্রতিষ্ঠানই শ্রমিক অসন্তোষের সময় সরবরাহ ঠিক রাখতে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ সরকারের দারস্থ হয়েছে। এদের বিভিন্ন তত্পরতা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়, বাংলাদেশের শ্রমিকদের কম মজুরির পেছনে কেবল দেশীয় মালিকরাই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৃহত্ একচেটিয়া ক্রেতারা যেমন ওয়ালমার্ট (বিশ্বের সবচেয়ে বড় খুচরা ব্যবসায়ী)ও ভূমিকা পালন করে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গার্মেন্টস রফতানির ৩০ শতাংশই যায় ওয়ালমার্টে। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের কারখানাগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়ানোর জন্য রফতানি দাম কিছু বৃদ্ধির প্রস্তাব উঠেছিল। ওয়ালমার্টই তাতে প্রবল বাধা দিয়েছিল। এই ওয়ালমার্টের অর্ডার পূরণ করতে গিয়েই তাজরীন ফ্যাশনসের শ্রমিকরা ভয়ংকর আগুনের শিকার হন। ওয়ালমার্ট এখন যার কোন দায় নিতে রাজি হচ্ছে না। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক থেকে বিদেশি বায়িং হাউজসহ পশ্চিমা কোম্পানীগুলো যে বিশাল মুনাফা করছে তা বোঝা যাবে এর বিভিন্ন পর্ব খেয়াল করলে। সুইডেনের গার্মেন্টস মার্কেট থেকে একটি চিত্র পাওয়া যায়। প্রতিটি উলের সুয়েটারের দাম সুইডিশ ৩০০ ক্রাউন (এসইকে)। টাকার অংকে যার দাম পড়ে ২ হাজার ৭০০ টাকা। ক্রিসমাসের সময় এ দাম সবচেয়ে বেশি হয়। অধিকাংশ মানুষকে ক্রিসমাসের পরে এটা কিনতে দেখা যায়, কারণ তখন দাম কমে যায়। সে সময় একটি সোয়েটার যখন ১৫০ ক্রাউনে বিক্রি হয় তখন সরকার এ থেকে ২৫ শতাংশ ভ্যাট নেয়। একই পণ্য বাংলাদেশি বিক্রেতারা শুরুতে বিক্রি করে ৩৫ ক্রাউনে। বাংলাদেশি দরিদ্র গার্মেন্টস শ্রমিকদের বঞ্চনার ওপর দাঁড়িয়ে ঐসব দেশের সরকার বিরাট অংকের আয় করে। একই ধরনের চিত্র দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ক্ষেত্রেও। এক হিসাব মতে, পশ্চিমা বাজারে যে পোশাক ১০০ ডলারে বিক্রি হয় তা থেকে ঐসব দেশের সরকার আয় করে ২৫ ডলারের বেশি, বিদেশি ব্রান্ড ও বায়িং হাউজ লাভ করে ৫০ ডলার আর বাকি ২৪ ডলার যায় উত্পাদন খরচ, ব্যবস্থাপনা ও গার্মেন্টস মালিকদের মুনাফায়। শ্রমিকদের জন্য এটা ১ ডলারের নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপ করা আছে, শতকরা ১৫ থেকে পণ্য বিশেষে আরও বেশি। বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের ওপর শুল্ক ও বিভিন্ন ভ্যাট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার যা আয় করে তা ঐ দেশ থেকে তথাকথিত বিদেশি সাহায্য (ঋণ ও অনুদান) নামে বাংলাদেশ যা পায় তার দশগুণেরও বেশি। অন্যভাবে বলতে গেলে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে যে পরিমাণ অর্থ সহায়তা করে বলে প্রচার করে, পেছন দিয়ে তার দশগুণ অর্থ তারা এক তৈরি পোশাকের মাধ্যমেই নিয়ে থাকে। তার মানে আপাতদৃষ্টিতে উল্টোটা দেখালেও কার্যত বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরাই যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক বেশি অর্থের জোগান দিয়ে থাকে। এরমধ্যে গার্মেন্টস খাতকে শায়েস্তা করার ঘোষণা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা বাংলাদেশের জন্য কথিত ‘জিএসপি সুবিধা’ স্থগিত করেছেন। এটা এক অদ্ভুত ঘোষণা! কারণ বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো জিএসপি বা শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা কখনো তো পায়ইনি বরং অন্য অনেক দেশের তুলনায় ৫ থেকে ১৫ গুণ বেশি শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করে। এরকম বৈষম্যমূলক ও সংরক্ষণবাদী শুল্কনীতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার বা বিজিএমইএকে কখনও কথা বলতে শুনিনি। যা বাংলাদেশ পায় না, তা স্থগিত করবার অর্থ কী? সঙ্গত কারণেই গার্মেন্টসকে শায়েস্তা করার কথা বলে জিএসপি স্থগিত করায় গার্মেন্টসের রফতানি কমারও সম্ভাবনা নেই। গার্মেন্টস শিল্পের মুনাফার বড় ভাগীদার ব্র্যান্ড ও বায়িং হাউজ। তারাও নিজেদের স্বার্থেই রফতানি নিশ্চিত করবে। কিন্তু ক্ষতির মুখে পড়ছে বাংলাদেশের রফতানিকৃত পণ্যের মধ্যে অন্যগুলো যেগুলো জিএসপি সুবিধা পেতো। যেমন- প্লাস্টিক, সিরামিক, খাদ্য, মানুষের চুল, পাখির পালক, খেলনা ইত্যাদি। এগুলো মোট রফতানির শতকরা ১ ভাগেরও কম। এগুলো উদীয়মান শিল্প, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অভিযোগ এদের বিরুদ্ধে শোনা যায়নি। অথচ তারাই শাস্তিপ্রাপ্ত। রফতানি কমার সম্ভাবনা না থাকলেও, মার্কিন এই ঘোষণার কারণে, গার্মেন্টস খাতে এখন ব্র্যান্ড ও বায়ারদের বিভিন্ন স্তর থেকে চাপ সৃষ্টির সুযোগ বাড়ছে। তারা মার্কিন এই শাস্তির সূত্র ধরে আরও দাম কমানোর চাপ দিতে পারে। দাম কমানোর পর নিজের মুনাফা ধরে রাখতে মালিকেরা প্রয়োজনীয় কাজে খরচ আরও কমানোর পথে যেতে পারে। জিএসপির ভয় দেখিয়ে মালিকদেরও শ্রমিকদের সাথে দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হলো। প্রকৃত মজুরি কমাতেও নানা কায়দা-কানুন দেখা যাবে। সবার মুনাফা রক্ষা করতে গিয়ে শ্রমিকের ওপর সব চাপ ফেলার এই ধারা বরাবর চলছে, সেটাই আরও জোরদার করার অবস্থা তৈরি করলো ওবামা সরকার। অর্থাত্ শ্রমিক স্বার্থের কথা বলে জিএসপি স্থগিত করলেও শ্রমিকদের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করলো তারা। অন্যদিকে একই অজুহাত তুলে টিকফা চুক্তি স্বাক্ষর করা হলো গত ২৫ নভেম্বর, যা বাংলাদেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী জালকে আরও শক্ত করলো। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প যখন সীমাহীন লোভ, অদূরদর্শিতা ও অব্যবস্থাপনার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে তখন ভারত প্রস্তুতি নিচ্ছে অনেক সংগঠিতভাবে। বাংলাদেশের গার্মেন্টসের সঙ্গে যুক্ত একজন ভারতীয় ব্যবসায়ী সেখানকার এক পত্রিকায় প্রকাশিত সাক্ষাত্কারে জানিয়েছেন, বর্তমানে এই শিল্পে ভারত ও শ্রীলংকার বায়িং হাউজ ও কর্মকর্তাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে। যৌথ বিনিয়োগ আছে। প্রায় ৪০০টি ভারতীয় বায়িং হাউজ কাজ করছে এখানে। সাব-কন্ট্রাক্টও দিচ্ছে তারা বাংলাদেশে। পাশাপাশি ভারত তার দেশে গার্মেন্টস শিল্পকে একটি শক্তপোক্ত জায়গায় দাঁড় করাতে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পাটশিল্পের মতোই এই পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন ভারতকে গার্মেন্টসের ক্ষেত্রেও শক্তিশালী জায়গায় প্রতিষ্ঠা করবে। রানা প্লাজার ভয়াবহতার পর এটাই প্রত্যাশিত ছিলো যে, সরকার ও গার্মেন্টস মালিক উভয়ের বোধশক্তি জাগ্রত হবে। গার্মেন্টসকে শিল্প হিসেবে বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ তারা নিজে থেকেই গ্রহণ করবেন। ঘটনার পর প্রায় একবছর হতে চললো এখনও তাদের কাজের ধরন দেখে বোঝা যায় কোন শিক্ষা তারা গ্রহণ করেননি। এখন এ্যাকর্ড ও এ্যালায়েন্স নামে দুটো জোট হয়েছে যথাক্রমে ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকার ব্র্যান্ড ক্রেতা এনজিও শ্রমিক সংগঠনের উদ্যোগে। তাদের দেয়া শর্ত পূরণ করতে গিয়ে সরকার ফ্যাক্টরী ইন্সপেক্টরদের নিয়োগের কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। মালিকরা ভবনের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এসব কাজ তো তাদের অনেক আগেই করবার কথা। আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া কেন সরকার বা মালিকদের ঘুম ভাঙে না? কেন গত বাজেটে কারখানা পরিদর্শকদের নিয়োগ এবং উদ্ধার তত্পরতার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বাজেট দেয়া হয়নি? ক্ষতিপূরণের কোন নীতিমালা কেন এখনও ঘোষিত হয়নি? কেন রানা প্লাজার নিহত শ্রমিকদের পরিবার এখনও ক্ষতিপূরণের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছে? কেন আহত শ্রমিকসহ বেকার শ্রমিকদের কাজ দেবার প্রতিশ্রুতি এখনও পূরণ হয়নি? নিজেদের দায়িত্বে চরম অবহেলা আর দুর্বৃত্তদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে গিয়ে সরকার ও বিজিএমইএ শুধু শ্রমিকদের জীবন নাজুক করছে না, শিল্পবিকাশের পথেও হুমকি তৈরি করছে, সর্বোপরি বিশ্বে বাংলাদেশকে নাজুক অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে। লেখক :অর্থনীতিবিদ