স্মরণ

খানবাহাদুর হাশেম আলী খান

কৃষক নেতা, রাজনীতিবিদ ও পার্লামেন্টারিয়ান হাশেম আলী খান ১৮৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার স্বরূপকাঠি থানার সেহাঙ্গল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষ ফালাহ আলী খান লোদী ছিলেন ইতিহাসখ্যাত ইব্রাহিম লোদীর বংশধর। হাশেম আলী খান ১৮৯৮ সালে বৃত্তি নিয়ে নিম্ন প্রাইমারি এবং ১৯০০ সালে মেধাবৃত্তিসহ পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ হয়ে বরিশাল জেলা স্কুলে ভর্তি হন। ১৯০৬ সালে তিনি মাসিক দশ টাকা বৃত্তিসহ বরিশাল জেলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাস করেন। পারিবারিক সিদ্ধান্ত মোতাবেক হাশেম আলী খান কলকাতা মাদ্রাসায় এফ এ ক্লাসে ভর্তি হন। এ মাদ্রাসা থেকে ১৯০৮ সালে তিনি এফ এ এবং ১৯১০ সালে কৃতিত্বের সাথে বি এ পাস করেন। হাশেম আলী খান ছিলেন বরিশাল জেলার চতুর্থ মুসলিম গ্র্যাজুয়েট। কলকাতাস্থ মাদ্রাসায় তাঁর কৃতিত্ব এমন ছিল যে, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাঁকে উক্ত মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল নিযুক্ত করেন। মাদ্রাসায় চাকরিকালে তিনি কলকাতার বেকার হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট নিযুক্ত হন। হাশেম আলী প্রথম দিকে সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকেছিলেন এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে পুলিশ বিভাগে ডিএসপি হিসাবে নিয়োগ পান। কিন্তু পুলিশের চাকরি তার পিতার পছন্দ ছিল না এবং হাশেম আলী খানকে তিনি ওকালতি পেশায় আত্মনিয়োগের আহবান জানান। অতঃপর ১৯১৩ সালে তিনি কলকাতার রিপন কলেজ হতে বিএল পাস করেন। ফজলুল হক ঢাকা বিভাগীয় কেন্দ্রের শূন্য আসনে প্রার্থী হলে হাশেম আলী খান ফজলুল হকের পক্ষে প্রচারাভিযান চালান। বরিশালের জননেতা অশ্বিনী কুমার দত্ত ও ফজলুল হকের পরামর্শে হাশেম আলী খান ১৯১৪ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কোর্টের আইন ব্যবসা পরিত্যাগ করে বরিশাল বারে যোগ দেন। বরিশালে আইনজীবী হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গভঙ্গ সময়কালে হাশেম আলী খানের রাজনৈতিক মানস ভবিষ্যতে রাজনীতির জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছিল। ১৯০৬ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন বরিশালে বঙ্গীয় কংগ্রেসের বার্ষিক প্রাদেশিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পুলিশী অত্যাচারের মুখে সম্মেলন পণ্ড হয়ে যায় এবং অনেকের সাথে হাশেম আলী খানও গ্রেফতার হন। কংগ্রেস গঠিত হলেও বরিশালে তখনও পূর্ণাঙ্গ কংগ্রেস কমিটি গঠিত না হওয়ায় ‘বরিশাল জনসভা’ এবং ‘বরিশাল স্বদেশ বান্ধব সমিতি’র ব্যানারে কংগ্রেস কর্মীরা কাজ করতেন। বরিশালের জননেতা অশ্বিনী কুমার দত্তের প্রভাবে প্রথমে তিনি কংগ্রেসের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। হাশেম আলী খান ইতোমধ্যে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের দুর্বলতা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই এ কে ফজলুল হকের পরামর্শে ১৯১৫ সালে বরিশালে তিনি কৃষক প্রজা সমিতি গঠন করেন। তিনি ছিলেন বরিশাল জেলা কৃষক প্রজা সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনকালে তিনি বিদেশি দ্রব্য বর্জন এবং বরিশালস্থ উকিল মোক্তারদের আইন ব্যবসা বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯২২ সালে মহাত্মা গান্ধী ও মওলানা মোহাম্মদ আলী বরিশালে আসেন। অশ্বিনী কুমার দত্ত তখন অসুস্থ এবং অন্য নেতৃবৃন্দ তখন জেলে থাকায় হাশেম খান বরিশালে তাদের অভ্যর্থনা জানান এবং সভাস্থলে গান্ধীর হিন্দী ও মোহাম্মদ আলীর উর্দু বক্তৃতা বাংলা করে শোনান। তাঁর নেতৃত্বে ১৯২১ সালে বরগুনার গৌরিচন্না এবং ১৯৩০ সালে আগৈলঝড়ায় ঐতিহাসিক কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৩৪ সালে তিনি বরিশালের প্রতাপশালী জমিদার চৌধুরী ইসমাইল খানকে পরাজিত করে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে বরিশালে তিনি প্রজাপার্টির প্রার্থী হিসেবে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা উলিনিয়ার জমিদার আরিফ চৌধুরীকে পরাজিত করেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে বরিশালের সবক’টি আসন প্রজাপার্টি লাভ করে। তাঁর জনসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৩৫ সালে তিনি ‘খানবাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৩৯ সালে বাংলার কৃষকদের প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ এবং জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের লক্ষ্যে যে বিখ্যাত ‘ফ্লাউড কমিশন’ গঠিত হয়, হাশেম আলী খান ছিলেন তার অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য। তিনি ১৯৪১ সালে ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় সমবায় ও কৃষিখাতক বিভাগের মন্ত্রী হন। তিনি আইনসভার ভেতরে ও বাইরে থেকে ১৯৩৮ সালের ভূমি সংস্কার আইন, ১৯৪০ সালের মহাজনী আইন, ১৯৩৯ সালের কৃষি খাতক আইনের প্রথম সংশোধনী এবং ১৯৪২ সালের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। হাশেম আলী খান ছিলেন সামরিক শাসনের বিরোধী। ১৯৬২ সালে আইউব বিরোধী দলগুলোর সমর্থনে প্রার্থী হন। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারকালে ১৯৬২ সালের ১৭ এপ্রিল ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকাডুবিতে তার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। রাজনীতি ছাড়াও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। সাহিত্য ও সাংবাদিকতায়ও তার ঝোঁক ছিল। তিনি ছিলেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘নবযুগ’ পত্রিকার প্রধান পরিচালক। কাজী নজরুল ইসলাম ও আবুল মনসুর আহমদ এ পত্রিকার সম্পাদনার সাথে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া সুসাহিত্যিক এস ওয়াজেদ আলীর সহযোগিতায় ১৯৪২ সালে কলকাতা থেকে ‘গুলিস্তাঁ’ নামক একটি উন্নতমানের সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯৫০ সালে তিনি বরিশাল থেকে ‘খাদেম’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯৬১ সালে বরিশাল সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে বরিশালে যে সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে হাশেম আলী খান ও তাঁর পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক