আকাশ গুহা
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৪, ২০:০০
ঘুম থেকে উঠে কেউ বারান্দায় গিয়ে যদি দেখে চারপাশে শুধু মেঘ, আর নিচে মাটি হাজার মাইল দূরে, তবে তার অনুভূতিটা হবে অন্যরকম। পৃথিবীতে এমন জায়গাও আছে। কিন্তু তা মানুষের তৈরি ইট কাঠের না, প্রকৃতির খেয়ালে সৃষ্টি এই গুহাগুলোর ভেতর জায়গা করে নিয়েছে মানুষ। লিখেছেন প্রাঞ্জল সেলিম
উত্তর-মধ্য নেপালের তিব্বত এবং চায়না সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় একসময় মুসট্যাংগ নামক একটি রাজ্য ছিল যা পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম এবং প্রাচীন স্থানগুলোর একটি। হিমালয় পর্বত এবং গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মতো গভীর, পাহাড়ি গিরিখাতের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা ভয়ঙ্কর স্রোতের কালী গান্দাকি নদী এই স্থানটিকে এক প্রকার প্রাকৃতিকভাবেই পৃথিবী থেকে আড়াল করে রেখেছে। এখানে যেকোনো মুহূর্তে কোনো পূর্বাভাস না দিয়েই শুরু হয় প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস এবং ধূলি-ঝড়, যা ওই অঞ্চলে ভ্রমণের অন্যতম বড় বাধাও বটে।
ইতিহাস :উনিশ শতকের মাঝামাঝি কিছু বিজ্ঞানী এবং প্রত্নতত্ত্ববিদ এই ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক পাহাড়ি ঢালে প্রায় হাজার দশেক মানব-সৃষ্ট গুহার সন্ধান পান। যার ভেতরে অনেক প্রাচীন বৌদ্ধ সাধুদের মৃতদেহ, নারী-শিশুদের মমি, মূল্যবান তৈজসপত্র, পশুর কঙ্কাল এবং প্রাচীন পাণ্ডুলিপির সন্ধান পাওয়া যায়। তবে কারা এই গুহা খনন করেছে, বা ঠিক কী উদ্দেশ্যে খুঁড়েছে তার ব্যাপারে কোনো সঠিক তথ্য জানা যায়নি। এমনকি এই গুহাগুলোতে প্রবেশের ব্যাপারে পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কিছু কিছু গুহা পাহাড়ের এমন সব স্থানে তৈরি করা হয়েছে, আপাত দৃষ্টিতে দেখে মনে হবে সেখানে উঠতে হলে পাখি হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। ফলে একটা সময়ে এই রহস্যময় পাহাড়ি গুহাগুলোর নাম হয়ে যায় আকাশের গুহা। বর্তমানে যা প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে রহস্যময় স্কাই কেভ হিসেবেই পরিচিত। এই স্কাইকেভগুলোকে পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রত্নতাত্ত্বিক রহস্যের অন্যতম সেরা কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৌদ্ধ ধর্ম শিক্ষা এবং তার দর্শন, চিত্রকলা প্রভৃতি নিয়ে প্রায় সাত শ বছর আগে মুসট্যাংগ ছিল একটি ব্যস্ত জনপদ। সেই সময়ে লবণ ছিল পৃথিবীর অন্যতম দামী পণ্য। চার্লস র্যাম্বল নামের ফ্রান্সের জনৈক নৃ-তাত্ত্বিকের মতে, এই অঞ্চলটি ছিল তিব্বতের লবণ খনিগুলোর সাথে ভারতীয় উপমহাদেশের যাতায়াতের অন্যতম সহজ পথ। ধারণা করা হয়, এই বিপজ্জনক পাহাড়ি অঞ্চল দিয়েই লবণ এবং অন্যান্য দামী পণ্য নিয়ে ব্যবসায়ীরা যাতায়াত করত। তিনি আরও বলেন, সতের শ শতকের গোড়ার দিকে পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলো মুসট্যাংগের এই একচেটিয়া উত্থানকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নানারকম কর্কটপরিকল্পনা শুরু করে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা মুসট্যাংয়ের উপর বিভিন্ন রকম বিধিনিষেধ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে এই পথ দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, চলাচল বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে ভারতে লবণের বাজার বেশ সহজলভ্য হয়ে উঠে। ফলে ব্যবসায়ীরা মুসট্যাংগের বদলে ভারতকেই বেছে নেয়। মানুষের চলাচল কমে যায়, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শিকার হয়ে মুসট্যাংগের বিখ্যাত ধর্মীয় মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং মান্ডালার মতো বিখ্যাত কিছু পণ্যের বাজারে খুব দ্রুত ধস নামে। অনেক মানুষের হাহাকারকে সঙ্গী করে গতানুগতিক ধারার অনেক আগেই এই বিখ্যাত জনপদটি একসময় হারিয়ে যায় চির রহস্যময় সুউচ্চ হিমালয় পর্বতের আড়ালে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি জার্মানের টহরাবত্ এবং নেপালের একদল প্রত্নতত্ত্ববিদ সেই হারিয়ে যাওয়া মুসট্যাংগ জনপদে অভিযান চালায়। সেই অভিযানে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বের বেশ উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক কিছু কঙ্কাল এবং প্রাকৃতিকভাবে মমি হয়ে যাওয়া কিছু লাশের সন্ধান পান। এই মমিগুলোর প্রায় সবগুলোই সুন্দর তামার গয়না আচ্ছাদিত কাঠের বাক্সে রাখা। গুহায় এমন সব তৈজসপত্র, গহনা এবং কাচের পণ্য পাওয়া গিয়েছে, যা তত্কালীন সময়ে মুসট্যাংগে প্রাপ্ত পণ্যের মধ্যে পড়ে না। দুষ্প্রাপ্য এবং মূল্যবান এই সব গয়না ও অন্যান্য পণ্যের প্রাচুর্য দেখে বুঝা যায় একটা সময় কতটা সমৃদ্ধশালী ছিল এই নগরী।
প্যাট এথান্স :নামের একজন পর্বতারোহী যিনি কিনা সাতবার এভারেস্টের চূড়ায় পা রেখেছিলেন তিনি যখন মুসট্যাংগ অভিযানে যান, ফিরে এসে বলেছিলেন, এটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয়, কঠিন এবং দুর্দান্ত একটি অভিজ্ঞতা। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, গুহাগুলোতে উঠার সহজ পথ কী হতে পারে। তিনি বলেছিলেন, আপনি পাখি হয়ে যান, পাখি হওয়া ছাড়া সবগুলো গুহায় যাওয়া আপনার আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এই অভিযান চলাকালীন সময়ে এথেন্স এবং তার দল মুসট্যাংগের আরও গভীরে অন্য কিছু গুহার সন্ধান পান। কিন্তু গুহাগুলো এত দুর্গমস্থানে ছিল যে সেখানে পৌঁছানো তাদের জন্য প্রায় অসাধ্য ছিল। একে তো বিপজ্জনক পাহাড়ি খাড়া ঢাল তার উপর সেটার নিচ দিয়ে বয়ে চলছে তীব্র স্রোতের কালী গান্দাকি নদী। অনেক কষ্টে এবং ঝুঁকি নিয়ে সেই গুহাগুলোয় প্রবেশ করে তাদের চোখছানা বড়া হয়ে যায়। সারি সারি অনেকগুলো গুহার মাঝে একটি গুহায় তারা খুঁজে পান প্রায় ২৬ ফুট লম্বা একটি প্রাচীন মুর্যাল, ৪২টি দুর্লভ বৌদ্ধ সাধুদের ছবি এবং প্রায় ৮০০০টি ক্যালিগ্রাফিক পাণ্ডুলিপি।