আসিফ
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৪, ২০:০৬
ভীষণ আত্মঅভিমানী একটি ছেলে। নিজের কাজ নিজে করতে পছন্দ করেন। চিন্তা করতে ভালোলাগে তার। বই পড়েন আর সংগ্রহ করেন। নিজস্ব একটি লাইব্রেরিও করে ফেলেছেন। বাড়িতে সময় পেলে ফটোগ্রাফি করেন। ফিল্ম দেখেন। পড়ছেন ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের লাভলি প্রফেশনাল ইউনিভার্সিটিতে ফার্মেসি নিয়ে। এসব তথ্য শুনে কখনই মনে হবে না এটি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার গল্প। কিন্তু না, এ গল্প একজন নবীন নির্মাতার, যার নির্মিত ‘দ্য পোস্টার’ এ বছর দাদাসাহেব ফালকে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শনের জন্য মনোনীত হয়েছে। তরুণ নির্মাতা আসিফ খানের গল্প জানাচ্ছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
স্কুলে থাকাকালীন মঞ্চ নাটকে অভিনয় ছাড়াও গল্প-কবিতা লিখেছেন। আঁকিবুঁকিতেও কম যান না তিনি। যৌথভাবে তার পেইন্টিংসের এক্সিবিশন হয়েছে রাজশাহীতে। তবে তাকে নির্মাতা বানিয়েছে মোরশেদুল ইসলামের চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটি। ৩য় আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র ফেস্টিভ্যালে প্রথম কাজ ‘সন্ধিক্ষণ’, ২০১০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ৪৫ মিনিটের ছবি। তার নিজস্বতা তৈরি হয়েছিল সেই কাজের মাধ্যমেই। ‘সন্ধিক্ষণ’-এ কাজ শুরু করেছিলেন ২০০৯-এর শুরুতে। শেষ করতে প্রায় বছরখানেক লেগেছিল। এরপর কলকাতা ভ্রমণ করতে গিয়ে বানিয়ে ফেলেন প্রামাণ্যচিত্র ‘আমার দেখা কলকাতা’; ১২ মিনিটের ছবি। তার তৃতীয় কাজটি অনেকেই বেশ পছন্দ করেছেন, তার শৈশবের সঙ্গী পদ্মা নদী নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি ‘জলেরও জলছবি’। ছবিটি ভারতের ইয়ুথভাইব ন্যাশনাল ওপেন ফেস্টিভ্যাল ২০১৩-তে সেরা ছবির পুরস্কার জিতে নেয়। এছাড়া পাঞ্জাব ইন্টার ইউনিভার্সিটি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০১৩-তেও পুরস্কার জিতে ছবিটি। চিলড্রেন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ব্যানারে ঢাকা, রাজশাহী রংপুরে ‘জলেরও জলছবি’ বেশ প্রশংসিত হয়। ইয়ুথভাইবে ডকুমেন্টারি ছাড়াও আর্কিটেকচারাল ফটোগ্রাফিতে তার তোলা ছবি পুরস্কৃত হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ওয়ার্ল্ড ফার্মাসিস্ট ডে উপলক্ষে তার বানানো পোস্টার ১ম পুরস্কার লাভ করে। এত গুণ তার! বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তিনি। সম্প্রতি তৈরি করেছেন নতুন একটি চলচ্চিত্র। নাম ‘পোস্টার’। এটি তার অনেক স্বপ্নের একটি ছবি। ২০০৯ সালে জহির রায়হানের ‘পোস্টার’ গল্পটি পড়ে সেটিকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের কথা মাথায় আসে। ‘পোস্টার’ খুব বড় ক্যানভাসের ছবি বলে জানালেন তিনি। ২০১৩ সালের জুন মাসে সামার ভ্যাকেশনে দেশে গিয়ে শুটিং করেন ‘পোস্টার’-এর। মোট ৫ দিন ঢাকার মিরপুর-৬, হাতিরপুল, মতিঝিল কলোনি, ফার্মগেট, টিএসসিসহ বিভিন্ন জায়গায় শুটিং হয় চলচ্চিত্রটির। ছবিতে কিছু শটের জন্য বেশ বড়সড় আয়োজন করেন তিনি। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য মাছবাজার ও ছবির শেষে মশাল মিছিলের দৃশ্য। ছবির স্ক্রিপ্ট লিখেছেন মাহদি হাসান। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর এবং সম্পাদনার কাজ করেছেন পাঞ্জাবের রাজেশ কাপুর। আসিফ জানালেন, ছবিটি তৈরির ক্ষেত্রে প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল জহির রায়হান। তার গল্প নিয়ে কাজ করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এছাড়া ভয় তো ছিলই, আর সকলের সহায়তা ছাড়া ‘পোস্টার’ সম্ভব ছিল না। এর যাবতীয় তথ্য পাওয়া যাবে www.theposterfilm.com এই ওয়েবে গেলেই।
আসিফের শৈশব-কৈশোর কেটেছে রাজশাহী পাঠানপাড়ায়। বাবা আযম খান পেশায় ফার্মাসিস্ট। মা শাহানা খান পেশায় গৃহিণী। তাদের অতি প্রিয় সন্তান তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি আসিফ নানা ধরনের সৃজনশীল কাজ করতে পছন্দ করেন। সময় পেলেই সিনেমার প্ল্যান করেন। মা-বাবার এতে কোনো আপত্তি নেই। আসিফ কথা বললেন এদেশের তরুণদের নিয়ে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের তরুণরা পৃথিবীর অন্য দেশের তরুণদের চেয়ে অনেক প্রতিভাবান বলে আমি বিশ্বাস করি। আবার আজকের অনেক তরুণ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বলি হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।’ ভবিষ্যত্ নিয়ে খুব বেশি কিছু ভাবেন না আসিফ। ‘পোস্টার’ ছবিটা কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পাঠিয়েছেন। হয়তো সিলেক্ট হবে না কিন্তু বিচারক অন্তত একবার বলে উঠবে ‘ওহ, অ্যা ফিল্ম ফ্রম বাংলাদেশ!’ এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার নেই তার। তিনি ভালো ভালো কিছু কাজ করতে চান। বাংলাদেশি ছবির একটা আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি হোক এটাই তার আশা। বাংলা ভাষা তার সবচেয়ে বেশি গর্বের জিনিস। তাই তিনি চান বাংলা ভাষা ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে।